মত-বিশ্লেষণ

জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত হবে এক-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশি

দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমেই উন্নতি করছে। শিক্ষার সুযোগ ক্রমেই বাড়ছে, বিশেষ করে নারীশিক্ষার। এছাড়া উন্নয়নসংশ্লিষ্ট অন্যান্য লক্ষ্যও বাংলাদেশ খুব দ্রুত পূরণ করছে। তুলনামূলকভাবে তরুণ জনশক্তির কারণে আগামী কয়েক দশক ধরে এ সাফল্য ধরে রাখার মতো ভালো অবস্থান রয়েছে বাংলাদেশের। উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অর্থনৈতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে। ওই তালিকায় যে বিষয়গুলো রয়েছে, তার শীর্ষের চ্যালেঞ্জগুলো অধিকাংশই জলবায়ু পরিবর্তনকেন্দ্রিক।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে রয়েছে যে দেশগুলো, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কিছু সূচক অনুযায়ী, যে ১০ দেশ চরম আবহাওয়াজনিত কারণে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তথ্য পর্যালোচনা করে এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির কারণে বছরে জিডিপির অন্তত এক দশমিক আট শতাংশ ক্ষতি হয়েছে।
ক্রমেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ ভূমি নিমজ্জিত হবে। এছাড়া ২০৫০ সাল নাগাদ ৩০ শতাংশ ভূমি খাদ্য উৎপাদন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইন্টারগভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের বিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছেন।
বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবদান দশমিক ৩৫ শতাংশেরও কম। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এজন্য একটি রাজস্ব কাঠামো চালু করা হয়েছে, যাতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে আরও বিনিয়োগ পাওয়া যায়। একই সময়ে নতুন পরিবেশগত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গ্রিন ব্যাংকিংয়ে উৎসাহিত করা এবং এ জন্য একটি ফান্ড গঠন করার মতো ব্যাপার রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার লক্ষ্যেও বাংলাদেশ বেশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, বিশেষ করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এশিয়ার অন্যান্য উদীয়মান দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বেশ কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি করার জায়গা আছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের আরও উন্নতি করতে হবে।
সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হতে পারে জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়ার পদক্ষেপটি ধীরে ধীরে সংস্কার করা। এছাড়া আর্থিক ও অন্যান্য সম্পদ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় মুক্ত করে দেওয়া যেতে পারে। নি¤œ ট্যাক্স রাজস্ব ও জিডিপির অনুপাতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ, যা ১০ শতাংশেরও নিচে অবস্থান করছে।
পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তার মধ্যে সম্ভাব্য পন্থাগুলো হলোÑব্যাপক খরচের জ্বালানি ভর্তুকি কমিয়ে ফেলা এবং ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়া। যখন নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের মাধ্যমে সবচেয়ে দরিদ্র অংশের প্রভাব প্রশমনের সক্ষমতা তৈরি হবে, তখন এটি করা যায়।
কিছু নির্দিষ্ট তেলজাতীয় পণ্যে কার্বন ট্যাক্স আরোপের পদক্ষেপের ব্যাপারটি ভেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষত যেসব পণ্য ধনীদের বাসাবাড়িতে ব্যাপক ব্যবহার করা হয় সেগুলো, যেমন পাম্পে ব্যবহার করা পেট্রল ও ডিজেল। এতে রাজস্ব আয় বাড়বে ও দূষণ কমে আসবে। এছাড়া আরও পরিষ্কার ও কার্বন নির্গমনরোধী প্রযুক্তি ব্যবহারেও আগ্রহ বাড়বে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলায় আর্থিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। কোনো আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বাজেটের অংশ ঠিক করতে হবে, যা ইন্স্যুরেন্স ম্যাকানিজমের মাধ্যমে করা যেতে পারে। বিশেষত বিপর্যয়কালীন বন্ড, যা ব্যাপক কাভারেজ দিতে সক্ষম হবে।
পরিবেশবান্ধক বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এছাড়া দূষণ করলে ট্যাক্স আরোপ করা এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যে ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে। যেসব বিদেশি বিনিয়োগকারী পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে রয়েছে, তাদের আকর্ষণ করতে ব্যবসার পরিবেশে উন্নতি করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আইএমএফের প্রতিবেদনের আলোকে

তৌহিদুর রহমান

সর্বশেষ..