প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তা

রিয়াজুল হক

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্ভাব্য সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। যদিও অনেকে একে প্রাকৃতিক ঘটনা বলে আখ্যায়িত করে থাকেন; তাছাড়া মানব সম্প্রদায়ের ভোগবাদী সমাজব্যবস্থা যে এ পরিবর্তনকে গতি দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী সময় থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে সভ্যতার বিস্তারের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে শহর এবং যাতায়াতব্যবস্থা সুগম করতে বেড়েছে জৈব-জ্বালানিনির্ভর মোটরযান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পৃথিবীর ধানের ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেবে বলেই বিশিষ্টজনের আশঙ্কা। স্বল্প আয়তনে বেশি জনসংখ্যার এ দেশে দিন দিন পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে। প্রায়ই বন্যা, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া ঋতু পরিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে বৈচিত্র্য দেখা দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে ‘টার্ন ডাউন দ্য হিট: ক্লাইমেট রিজিওনাল ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড কেস ফর রেজিলিয়ান্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেছে ক. তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বন্যায় ডুবে যাবে। তাপমাত্রা আড়াই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বন্যায় প্লাবিত এলাকার পরিমাণ ২৯ শতাংশ বাড়বে। ফসলের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি পানির নিচে চলে যাবে। খ. ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বাংলাদেশের ৩ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন মানুষের ঘরবাড়ি ডুবে যায়। ওই ঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ২০৫০ সালের মধ্যে এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় আরও শক্তিশালী হয়ে তিন মিটার উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস নিয়ে উপকূলে আঘাত হানবে। এতে ৯০ লাখ মানুষের বাড়িঘর ডুবে যেতে পারে। গ. ২০৮০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬৫ সেন্টিমিটার বাড়লে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৪০ শতাংশ ফসলি জমি হারিয়ে যাবে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে ৮০ হাজার টন ধান উৎপাদন কম হয়েছিল। এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। এছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা বর্তমান হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে দেশের নিম্ন উপকূলীয় অঞ্চল সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে, ১০ শতাংশ ধানিজমি ও গমের ৩০ শতাংশ জমি বিনষ্ট হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের বৃক্ষসহ বিভিন্ন প্রজাতির কিছু প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন হবে। পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ নদী ও সামুদ্রিক মাছের জন্য এক বৈরী পরিবেশ সৃষ্টি হবে। ইতোমধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে।

বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যার খাদ্য চাহিদার ৯৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে জোগানো হয়। বর্তমানে দেশের শস্য প্রবণতা ১৮০ শতাংশ। মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ১৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন হেক্টর, যা মোট ভূমির ৬২ শতাংশ। আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ভাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সে কথা অস্বীকারের উপায় নেই। জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ দৈনিক চাহিদার ৭৬ শতাংশ ক্যালরি ও ৬৬ শতাংশ প্রোটিন চাল থেকে পেয়ে থাকে। নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও খরার ফলে প্রতিবছরই আমরা আবাদযোগ্য জমি হারাচ্ছি, তবে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমাদের প্রযুক্তিগত উন্নতির প্রকাশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ২ দশমিক ৯৪ টন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে এটি ছিল ২ দশমিক ৯৬ টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক শূন্য দুই টন। ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১৮৯ দশমিক ৮৫ মিলিয়নে। এ জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন বাড়িয়ে ৩৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন হেক্টরে নিতে হবে। এজন্য উৎপাদনশীলতা উন্নীত করা আমাদের লক্ষ্য বলে বিবেচ্য হওয়া উচিত। সম্প্রতি উদ্ভাবিত ব্রি ধান ৫৮-এর গড় ফলন সাড়ে সাত টন/হেক্টর, শীষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেক কম হয়। ব্রি ধান ৫৯-এর গড় ফলন সাত দশমিক এক টন/হেক্টর, গাছ হেলে পড়ে না এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেক কম হয়। ব্রি ধান ৬১ এর ফলন ৩.৮-৭.৪ টন/হেক্টর, লবণাক্ততা সহনশীল, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেক কম হয়।

মধ্য আগস্টের পর আমনের বীজতলা তৈরি করা হলে তা বন্যার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। তাই আমনের বীজতলা সময়ের আগে তৈরি করার ফলে আউশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে বোরোর গড় উৎপাদনশীলতা ভালো হলেও এর উৎপাদন প্রক্রিয়া অন্যান্য জাতের তুলনায় কিছুটা ব্যয়বহুল। এটি শুষ্ক মৌসুমে উৎপাদন করা হয়ে থাকে। তাই সেচ, সার ও কীটনাশক বাবদ খরচ বেশি পড়ে। এর আরেকটি বিরূপ দিক হচ্ছে, এটি জলাধারের মাছের প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করে। শুষ্ক মৌসুমে জলাধারগুলোয় পানির ঘনত্ব কম থাকে, ফলে সেচের সঙ্গে ধুয়ে আসা বিভিন্ন রাসায়নিক সারের উপাদান পানিতে সুষমভাবে দ্রবীভূত হয় না। বলা চলে, তা বাস্তুতন্ত্রে ও জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে। আমরা বোরোর উৎপাদন অব্যাহত রেখেছি শুধু এর আকর্ষণীয় উৎপাদনশীলতার কারণে। এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে বোরোর ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যে এবং আমনের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কাউন্সিলের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বি আর-৫১ ও বি আর-৫২ নামের উন্নত জাতের দুই ধরনের ধান আবিষ্কার করেছে। দুটি জাতই সাবমার্জ প্রজাতির, যা পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় দুই সপ্তাহ বাঁচতে পারে। উৎপাদনশীলতা হেক্টরপ্রতি পাঁচ টন। পাঁচ দিন পর্যন্ত ডুবানো অবস্থায় থাকলে উৎপাদনশীলতায় কোনো পরিবর্তন হয় না। ১১-১৫ দিন পর্যন্ত ডুবানো অবস্থায় থাকলে উৎপাদনশীলতা কমে চার টন/হেক্টরে দাঁড়ায়। দেশজ পদ্ধতিতে উৎপাদিত অন্যান্য জাতের ধানের তুলনায় দুটি প্রজাতি যে ভালো, তাতে সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লিঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলার উদ্দেশ্যে কৃষকের সুবিধার জন্য ব্যাংকগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এলাকাভেদে প্রয়োজনে ঋণ বিতরণ ও আদায়ের সময়সীমায় পরিবর্তন হতে পারে। লবণাক্ত এলাকায় লবণাক্ততা-সহনশীল ফসল চাষ; জলাবদ্ধ ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় পানি সহনশীল ফসল চাষ; খরাপ্রবণ এলাকায় খরা-সহনশীল ফসল চাষ; বিপুল ফলন হ্রাস ও ফসলহানি এড়াতে খরার সময় সম্পূরক সেচ প্রদান; সেচকাজের জন্য ভূ-নি¤œস্থ পানির পরিবর্তে ভূ-উপরিস্থিত পানির ব্যবহার উৎসাহিতকরণ; রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবর্তে জৈবসার ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বালাই/কীট নাশকরণ; বৃক্ষ নিধন করে বা পাহাড় কেটে প্রস্তুত করা জমিতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলো রক্ষণশীল ভূমিকা রাখবে। এছাড়া স্বাভাবিকভাবে বন্যামুক্ত বছরে বাড়ির ভিটায় ফলমূল, শাকসবজি চাষ, সামাজিক বনায়ন, পশুপালন এবং বসতবাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন ও বাগান উন্নয়ন কার্যক্রমে ঋণ সহায়তা অব্যাহত রাখবে; জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবিলায় বিকল্প এবং কৌশলগত চাষাবাদের বিভিন্ন পদ্ধতি (যেমনÑলবণাক্ত এলাকায় ধানের পর মুগ ডালের চাষ, পাহাড়ের পাদদেশে সরিষার পর খরিপ-১ মৌসুমে বারিমুগ-৫ চাষ, রোপা আমন ধানের সঙ্গে মসুুরের সাথি ফসল চাষ, শুষ্ক ভূমি অঞ্চলে প্রাইম পদ্ধতিতে মসুর চাষ) অনুসরণের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষম কয়েকটি ফসলের একটি নমুনা তালিকা দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: বারি গম-২১ (শতাব্দী), বারি গম-২৩ (বিজয়), বারি গম-২৬ ফসল তিনটি পাতার দাগ রোগ সহনশীল, মরিচা রোগপ্রতিরোধী ও তাপ সহনশীল। বারি বার্লি-৪ লবণাক্ততা সহনশীল এবং রোগবালাই কম। বারি বার্লি-৪ লবণাক্ততা সহনশীল এবং রোগবালাই কম। রাই-৫ (সরিষা) খরা ও কিছুটা লবণাক্ততা সহনশীল। বারি সরিষা-৭, ৮ ফসল দুটি অলটারনেরিয়া ব্লাইট রোগ এবং সাময়িক জলাবদ্ধতা সহনশীল। বারি আলু-১ (হীরা) তাপ সহনশীল এবং জাতটি ভাইরাস রোগ সহনশীল। বারি আলু-২২ (সৈকত) লবণাক্ত এলাকার জন্য উপযোগী ও ভাইরাস রোগ সহনশীল। বারি টমেটো-৪ উচ্চ তাপ সহনশীল। পাট কেনাফ-৩ ও ৪ ফসল দুটি জলাবদ্ধতা সহনশীল। ইক্ষু-৩৯ ও ৪০ ফসল দুটি খরা, জলাবদ্ধতা, বন্যা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু। বারি আম-৫, ৬, ৭ ও ৮ ফসল উচ্চ ফলনশীল ও মৌসুমি জাত। বারি লাউ-৩ ও ৪ বাংলাদেশের সর্বত্র চাষযোগ্য।

মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশ সংরক্ষণ উভয়ই একটি দেশের জন্য অপরিহার্য। একুশ শতকের এ বিশ্বায়নের যুগে বিশ্ব পরিবেশ আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। অথচ বেঁচে থাকতে হলে খাদ্যের বিকল্প নেই। কৃষকদের মাঝে পরিবর্তিত জলবায়ুতে ভালো উৎপাদনশীল জাতের প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। আমাদের মতো একটি জনবহুল দেশে একবার খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তাকে পুনরুদ্ধার করা সহজসাধ্য হবে না। তাই জলবায়ু পরিবর্তনে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা যেন হুমকিতে না পড়ে, সেজন্য কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করতে সরকারের দায়িত্বশীল সবাইকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।

 

উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

[email protected]