মত-বিশ্লেষণ

জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা ও ডেঙ্গু

সাধন সরকার: এ বছর রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্কের শেষ নেই! গত বছর চিকুনগুনিয়া নিয়ে বেশ আতঙ্কেই ছিল শহরবাসী। বছর বছর বেড়েই চলেছে মশাবাহিত রোগ ও রোগীর সংখ্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রভাব পড়ছে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ওপর। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঋতুবৈচিত্র্য ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের সম্পর্ক আছে এবং একই রোগ ভিন্ন ধরন ও লক্ষণ নিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে। আগে যেসব জায়গায় মশা টিকতে পারত না, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সেসব জায়গায় মশা অবস্থান করছে। বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় এডিস মশার বংশবিস্তার বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে ডেঙ্গু ব্যাপকতা লাভ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক তথ্যে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ সাধারণ ও মারাত্মক ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সত্তরের দশকে ফ্লু-জাতীয় ডেঙ্গু ভাইরাসের মহামারি প্রায় ৯টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এ বছর ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়িয়েছে শতাধিক দেশে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে গ্রীষ্মমগুলীয় দেশগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুহার বেড়েই চলেছে। বিশ্বে জলবায়ুগত দুর্যোগের শিকার হয়ে লাখ লাখ মানুষ খোলা আকাশের নিচে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন রোগের বিস্তারে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব ভূমিকা রাখছে। নিম্নমানের বসবাস, সেবা ও ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় মশা মানুষের খুব কাছে চলে আসছে বলে মনে হয়! শুধু মশা নয়, জলবায়ু পরিবর্তনে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অন্যান্য কীটপতঙ্গ প্রজননের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, লাওস, কম্বোডিয়া, মিয়ানমারসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে এবং মানুষের মৃত্যুও ঘটছে। ফিলিপাইনে ডেঙ্গুতে ৬০০ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে। ফিলিপাইনে ডেঙ্গুর কারণে ‘জাতীয় মহামারি’ ঘোষণা পর্যন্ত করতে হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকাতেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১৬ লাখের বেশি মানুষ। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই ব্রাজিলের নাগরিক। এ ছাড়া রয়েছে নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও অন্যান্য দেশের নাগরিক।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বিবেচনায় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে হবে। আগে শুধু রাজধানী বড়জোর বিভাগীয় শহরগুলোতে ডেঙ্গু দেখা দিত। আর এখন কমবেশি সারা দেশে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। ডেঙ্গু নির্মূলে শুধু ওষুধ প্রয়োগে কাজ হবে, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই! কয়েকটি বিষয় এখানে বিবেচনায় আনতে হবে। বিষয়গুলো হলো ১. পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, ২. ওষুধ ছিটানো ও ৩. জনগণের দায়বদ্ধতা। ঢাকা শহরকে আমরা যদি বিবেচনায় নিই, তাহলে দেখা যাবে এখানকার পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা বেশ নাজুক। অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ণের কারণে এ শহর আজ নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন। বিভিন্ন জরিপে বিশ্বের বসবাস-অযোগ্য প্রথম সারির শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম। শহরের সার্বিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য নেই বললেই চলে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বেশ নাজুক। বিভিন্ন ধরনের দূষণ শহরবাসীর নিত্যসঙ্গী! জনঘনত্ব এ শহরে সর্বাধিক। একটু বৃষ্টি হলেই সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যায়। শহরের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। দখল-দূষণে জর্জরিত হয়ে খালগুলো যেন এক-একটি মশা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে! এ শহরের খাল-নালাগুলোর পানিও প্রবহমান নয়। ঢাকার বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেম একসময় এমন ছিল যে, এখানে মশা কম হতো; অর্থাৎ বাস্তুসংস্থানগত ভারসাম্য মোটামুটি ভালো ছিল। এখন ব্যাঙ, চামচিকা ও টিকিটিকি এ শহরে নেই বললেই চলে! এগুলো মশাকে খেয়ে ফেলত। তবে বিষয়টি এমন নয় যে, ডেঙ্গু এবার প্রথম বিস্তার লাভ করেছে এ শহরে। দেশি-বিদেশি অনেক সংস্থার সতর্কবাণী ছিল এ বছর ডেঙ্গু ভয়াবহতা লাভ করতে পারে। বাস্তবে হলোও তাই! সারা দেশে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৪০ হাজারেরও বেশি লোক আক্রান্ত হয়েছে (যদিও বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি!)। আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র কয়েক হাজার হাসপাতালে আছেন; বেশিরভাগই বাসায় ফিরেছেন, অর্থাৎ সুস্থই বলা চলে। সরকারি হিসাবে বলা হচ্ছে, এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৪০ রোগীর মৃত্যু হয়েছে (যদিও বেসরকারি হিসাবে শত ছাড়িয়েছে)। পরিবেশ ও জলবায়ুগত অবস্থার কারণে ডেঙ্গু তার ধরন বদলেছে। বিভিন্ন ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের কথা এখন শোনা যাচ্ছে। এখন এটা নিশ্চিত হতে হবে যে, ঠিক কোন ধরনের ভাইরাস এখন সক্রিয় রয়েছে। এটা নিশ্চিত হতে না পারলে সে অনুযায়ী ওষুধ ছিটানো যাবে না। একটা বিষয় নিশ্চিত যে, দীর্ঘদিন যখন কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, তখন তার সঙ্গে ওই নিদিষ্ট ধরনের কীটপতঙ্গ ধীরে ধীরে নিজেকে সহনশীল করে ফেলে। ফলে ওষুধের কার্যকারিতা হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। সেক্ষেত্রে ভাইরাসের ধরন বুঝে নতুন কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। এ ব্যাপারে বিদেশের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো যেতে পারে। জনগণের সম্পৃক্ততা না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না! সাধারণত মে-জুন মাসকে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুর মাস হিসেবে ধরা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এবার শীতের আগ পর্যন্ত ডেঙ্গু তার কারিশমা দেখিয়ে যাবে!
জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি কোনোভাবেই হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে। ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী, ডায়াবেটিস রোগীসহ আগে অন্য কোনো ধরনের রোগের জটিলতা যাদের আছে তারাই। এডিস মশার উৎসস্থল ধ্বংসে জনসাধারণই মূল ভরসা। কেননা বাসাবাড়ি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও আমাদের চারপাশে এডিস মশার লার্ভা তৈরির বহু ক্ষেত্র থাকে। শীতকালেও ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার ডিম থাকে। এই ডিমে একটু বৃষ্টির পানির ফোটা পড়লেই লার্ভার জš§ হয়। শুষ্ক ও আর্দ্র উভয় মৌসুমে এডিস মশা সক্রিয় থাকে। বর্ষায় এদের আধিক্য বেশি দেখা যায়। এ জন্য মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ঢাকা শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এ ব্যাপারে কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে। ওয়ার্ডের সদস্যসহ তরুণদের সম্পৃক্ত করে স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করা যেতে পারে। ডেঙ্গু নির্মূলে কলকাতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। বিজ্ঞানসম্মত লড়াই চালানোর ফলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সফলতা পেয়েছে কলকাতা। সেখানে কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি জনগণও সমানতালে এ ব্যাপারে সক্রিয়। কলকাতায় আইন করে কর্তৃপক্ষ জনগণকে বাধ্য করেছে ডেঙ্গু নির্মূলে অংশ নিতে। কলকাতায় ডেঙ্গু নির্মূলে জনসাধারণের গাফিলতি বা অবহেলা হলে জরিমানার বিধান সক্রিয় আছে। ঢাকা শহরেও এমনটি করা যেতে পারে। বাসাবাড়িসহ আশপাশ, নিজের বাসাবাড়ির সামনের নালা ও রাস্তাঘাট অপরিচ্ছন্ন থাকলে বা পানি জমলে জবাবদিহি করতে হবে, এমন কিছু ভাবা যেতে পারে। তার আগে কর্তৃপক্ষকেও নিজেদের জবাবদিহিতার জায়গাটা পরিষ্কার করতে হবে! কেননা কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার চর্চা থাকলে জনসাধারণও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবে। বলে রাখা ভালো, স্যাঁতসেঁতে বা উপযুক্ত পরিবেশে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা দুই বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাই এখন ডেঙ্গু মশার ভাইরাস প্রতিরোধে শুধু বর্ষা মৌসুম বা মশার উৎপাত হলে নয়, অন্তত আগামী কয়েক বছর মাসব্যাপী ডেঙ্গু মশার বংশবিস্তার প্রতিরোধে ধারাবাহিক অভিযান সক্রিয় রাখতে হবে। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, ওষুধ ছিটানো ও নাগরিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা রোধ করা যাবে বলে মনে করি। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রয়োজন পরিকল্পিত নগরায়ণ, নগরের জলাধার রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা রোধ, প্রকৃতি রক্ষা, দূষণ রোধ প্রভৃতি বিষয়গুলোর দিকে নজর রাখা। আর ওষুধ ছিটানো বিষয়টা কর্তৃপক্ষের কাজ এবং এ ব্যাপারে পরিস্থিতি ও ভাইরাসের ধরন অনুযায়ী সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। সর্বোপরি নাগরিক দায়বদ্ধতা, অর্থাৎ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আইন তৈরি করে হলেও সেটা করতে হবে, যেমনÑবাসাবাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও যেন বেশিদিন পানি জমে না থাকে প্রভৃতি। দরকার হলে ডেঙ্গু নির্মূলে গণসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশব্যাপী সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে তিন কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি ভাবতে হবে।

কলাম লেখক ও পরিবেশকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..