প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জাইকার বিশ্লেষণ: পাইপলাইনের গ্যাসের তুলনায় এলপিজিতে খরচ সাড়ে পাঁচগুণ

 

 

ইসমাইল আলী: ২০১০ সালের জুলাইয়ে বন্ধ করা হয় আবাসিকে গ্যাস সংযোগ। ২০১৩ সালের মে মাসে তা তুলে দেওয়া হলেও ২০১৬ সালের মার্চ থেকে তা পুনরায় বন্ধ করা হয়। আবাসিকে আর গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না বলে এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এজন্য তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারে ভোক্তাদের আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করছে সরকার। তবে পাইপলাইনে সরবরাহকৃত গ্যাসের তুলনায় এলপিজিতে খরচ অনেক বেশি।

পাওয়ার সেক্টর মাস্টারপ্ল্যানে আবাসিকে ব্যবহƒত গ্যাসের দাম বিশ্লেষণ করে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। এতে দেখা যায়, পাইপলাইনে সরবরাহকৃত গ্যাসের তুলনায় এলপিজিতে খরচ সাড়ে পাঁচগুণ।

গত বছর এ বিশ্লেষণ করে জাইকা। তখন এক বার্নার গ্যাসের মাসিক বিল ছিল ৬০০ টাকা। চলতি বছর দুই দফা বেড়ে তা দাঁড়িয়েছে ৯০০ টাকা। আর ১২ কেজি ওজনের এলপিজির দাম ধরা হয়েছে এক হাজার ৫০ টাকা।

বিশ্লেষণে দেখানো হয়, বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে মাসে ৭২ ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম পড়ে ১২ টাকা ৫০ পয়সা। আর ঘনমিটারপ্রতি গ্যাসের হিট ভ্যালু ৩৯ দশমিক ৫৯ মেগাজুল। ফলে প্রতি মেগাজুল গ্যাসের দাম পড়বে ৩২ পয়সা। এদিকে এলপিজিতে প্রতি কেজি গ্যাসের দাম পড়ে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা। আর কেজিপ্রতি গ্যাসের হিট ভ্যালু ৫০ দশমিক ৮০ মেগাজুল। ফলে প্রতি মেগাজুল গ্যাসের দাম পড়ে এক টাকা ৭২ পয়সা।

এ হিসেবে এলপিজিতে ৭২ ঘনমিটার গ্যাসের দাম পড়বে চার হাজার ৮৩৮ টাকা। অর্থাৎ পাইপলাইনের গ্যাসের তুলনায় এলপিজিতে গ্যাসের দাম প্রায় সাড়ে পাঁচগুণ। যদিও প্রতি সিলিন্ডারের দামের সঙ্গে পাইপলাইনের গ্যাসের পার্থক্য মাত্র ১৫০ টাকা।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, ২০১৫ সালে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সময় জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল সৃষ্টি করা হয়। প্রতি ঘনমিটার গ্যাস থেকে এক দশমিক এক টাকা এ তহবিলে যাচ্ছে। সে সময় এ অর্থের একটি অংশ এলপিজিতে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এতে এলপিজির দাম কিছুটা কমানো যেত। এ ছাড়া গ্যাসের দাম বৃদ্ধির শুনানিতেও এলপিজি নীতিমালা চূড়ান্ত এবং সরকারের বেঁধে দেওয়া এর দাম নিশ্চিতের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু দুই বছরে এর কোনোটিই হয়নি।

উল্লেখ্য, প্রতি সিলিন্ডার এলপিজির দাম সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে ৭০০ টাকা। অথচ বাজারে এটি কোম্পানি ও স্থানভেদে এক হাজার ৫০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিশ্লেষণে জাইকা আরও জানায়, প্রতিটি পরিবারে মাসে দুটি সিলিন্ডার লাগে। এতে এলাকাভেদে দুই হাজার ১০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়, যা অনেক পরিবারের পক্ষেই বহন করা সম্ভব নয়। বিশেষত, গ্রামে এ খরচ বহন করা একেবারেই অসম্ভব। কারণ গ্রামে প্রতিটি পরিবারের মাসিক আয় গড়ে ৯ হাজার ৬৪৮ টাকা। আর এ আয়ের দুই-ছয় শতাংশ জ্বালানি বাবদ খরচ করে গ্রামীণ পরিবারগুলো। অর্থাৎ জ্বালানি খাতে তাদের মাসিক খরচ সর্বোচ্চ ৫৭৯ টাকা।

এলপিজি প্রসঙ্গে পাওয়ার সেক্টর মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়, জ্বালানি নীতিমালায় এলপিজি নিয়ে কৌশলগত অবস্থান অনুপস্থিত। যদিও সরকার ঘোষণা দিয়েছে আবাসিক ও যানবাহনে আগামীতে এলপিজি ব্যবহার করতে হবে। তাই শুধু ভর্তুকি দিয়ে এলপিজির দাম শুধু কমালেই হবে না এ-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা দরকার। তাই এলপিজির বিষয়ে বিশদ সমীক্ষা পরিচালনার সুপারিশ করেছে জাইকা।

গ্রামীণ পরিবারগুলোয় এলপিজির পরিবর্তে বায়োগ্যাস ব্যবহারের সুপারিশও করা হয়। এ সংক্রান্ত এক বিশ্লেষণে দেখা হয়, ৩০০ দিনের এলপিজির দামে একটি পরিবারের ছোট একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করা সম্ভব।

জানতে চাওয়া হলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফায়জুল্লাহ বলেন, আবাসিকে পাইপলাইনে আর গ্যাস দেওয়া হবে না বলে এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন মন্ত্রী। তাই এলপিজির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে পাইপলাইনে সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ছাড়া এলপিজি নীতিমালাও প্রণয়ন করা হচ্ছে। এতে এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।