প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জাতীয়তাবাদ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আলী নিয়ামত: ব্রিটিশশাসিত ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতির বিকাশ এবং উৎপত্তির ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ একটি বহুল আলোচিত শব্দ। জাতীয়তাবাদী উৎস থেকে নির্গত রাজনীতি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার মন্ত্র। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্ম সেখানে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। যদিও অনেকে জাতীয়তাবাদ এবং দেশপ্রেমকে একসঙ্গে মিলিয়ে ফেলার চেষ্টা করে, সেখানে জর্জ অরওয়েল জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা দেশপ্রেমের সংজ্ঞা থেকে পৃথক করে দেখেছেন। ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল স্বভাবতই বলতে চেয়েছেন, জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম দুটোই সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। সম্পর্কের দিক থেকে দুটি দুই বিষয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক আন্দোলনে দেশপ্রেমের নামে জাতীয়তাবাদকে ছলেবলে কৌশলে হাজির করা হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জীবদ্দশায় ন্যাশনালিজম-সম্পর্কিত আলোচনায় ন্যাশনালিজমের সমার্থক হিসেবে ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। কবির ন্যাশনালিজম বনাম জাতীয়তাবাদ নামকরণের পার্থক্যের মধ্য দিয়ে তার নিজস্ব দেশভাবনার প্রতিফলন স্পষ্ট হয়। আধুনিককালে যখন ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ দিয়ে দেশপ্রেমের তকমা লাগানো হয়, তখন দেশকে ভালোবাসা বা দেশপ্রেমের প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২ থেকে ১৫ প্রকারের শব্দ ব্যবহার করেছেন; ‘ন্যাশনালিজম’কে কোথাও জাতীয়তাবাদের সমার্থক করেননি। ন্যাশনালিজম বলতে তিনি দেশাভিমান, স্বদেশপ্রেম, দেশভক্তি ও স্বদেশচেতনাকে বুঝিয়েছেন। ন্যাশনালিজমে বিশ্বাস থেকে ন্যাশনালিস্ট হওয়ার প্রবণতা থাকে বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে আশিস নন্দী মন্তব্য করেছেন: ‘ঞধমড়ৎব ধিং ধ ঢ়ধঃৎরড়ঃ নঁঃ হড়ঃ ধ হধঃরড়হধষরংঃ.’
ন্যাশনালিস্টিক বা জাতীয়তাবাদী চেতনা ভালো কি মন্দ এ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। ভারতীয় উপমহাদেশে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপ থেকে জাতীয়তাবাদী চেতনার আমদানি হয়। এই ধাক্কায় ইউরোপীয় আদলে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ভারতবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতিরাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদী চেতনার অভাবকে অনেকে ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনে পিছিয়ে পড়ার কারণ বলে তখন মনে করেছিলেন। আবার জাতীয়তাবাদী চেতনার মোড়কে উগ্র জাতীয়তাবাদে জন্ম হয় কি না, সে বিষয়ে আশিস নন্দী সুদিপ্তা কবিরাজের রেফারেন্স টেনে বলেছেন, ভূদেব মুখোপাধ্যায় হচ্ছেন প্রথম সেই ব্যক্তি যিনি ভারতে উগ্র জাতীয়তাবাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ভারতে জাতীয়তাবাদী ভাবনা, রবীন্দ্রনাথের মতে ন্যাশনালিজম, মূলত ‘উদ্ভাবিত জাতীয়তাবাদ’ (ওহাবহঃবফ ঘধঃরড়হধষরংস) অবস্থান থেকে যাত্রা করে। এরিক হবসবম, আর্নেস্ট গেলনার-সহ অন্যরা আধুনিক কালে জাতীয়তাবাদকে এভাবেই সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, আধুনিক জাতীয়তাবাদ হচ্ছে ‘মধ্যযুগীয় বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া’। এই জাতীয়তাবাদ চেতনা তখনই সফল হবে, যখন মধ্যযুগীয় অতীত কোনো দেশের ঘাড়ে চেপে বসবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার সময়ে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ‘ন্যাশনালিজম’ (ঘধঃরড়হধষরংস) শিরোনামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। সেই গ্রন্থে তিনি ন্যাশনালিজমের আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে আলোচনা করেন। জাপানভ্রমণের অভিজ্ঞতা রবীন্দ্রনাথকে ন্যাশনালিজমবিরোধী ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করে। জাপান সফরে বিভিন্ন সভা সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের আদলে জাপানকে জাতীয়তাবাদী ভাবনায় অগ্রসর না হওয়ার অনুরোধ করেন। পুরো ইউরোপ যে শক্তির বড়াই করে সাম্রাজ্যবাদী কায়দায় সারা বিশ্বকে পদদলিত করেছে, জাপানকে সেই পথ অনুসরণ না করার জন্য তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের মতে, ভারতের তৎকালীন সমস্যা যতটা না রাজনৈতিক ছিল, তার চেয়ে বেশি সামাজিক। ফলে ভারতের সমস্যার সমাধান জাপানের মতো ছিল না। জাপানকে দেওয়া ভাষণে কবি বলেছেন, ‘ঘড়ঃ ঃযব রসরঃধঃরড়হ ড়ভ ঃযব ড়ঁঃবৎ ভবধঃঁৎবং ড়ভ ঃযব ডবংঃ নঁঃ ঃযব ধপপবঢ়ঃধহপব ড়ভ ঃযব সড়ঃরাব ভড়ৎপব ড়ভ ঃযব ডবংঃবৎহ হধঃরড়হধষরংস ধং যবৎ ড়হি.’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ন্যাশনালিজম ভাবনাকে একদিক থেকে দেখলে রাজনৈতিক নেতাদের ভাবনার চেয়ে সেটি অনেক পৃথক। যে জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে ভারতে স্বদেশী আন্দোলনসহ অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজমকেন্দ্রিক পদ্ধতি প্রয়োগের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ফয়সাল দেবজি ন্যাশনালিজমকে ‘পোর্টেবল কমোডিটি’ বলে নিন্দা করে বলেছেন, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের মূল বিবেচ্য বিষয় ছিল ‘একটি পলিটিক্যাল অ্যাকশন’ এবং ন্যাশনালিজমের বিপক্ষে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের জনক মহাত্মা গান্ধীও শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজম-বিষয়ক ভাবনায় মত দিয়েছিলেন। গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন ভারতকে একতাবদ্ধ হওয়ার যেসব ভিত্তি ন্যাশনালিজমের নামে হাজির করা হয়েছিল, সেগুলো কোনো শাশ্বত বিষয় নয়, বরং তা মধ্যযুগীয় ভাবনা। শাশ্বত ভাবনার আদলেই পরবর্তীকালে গান্ধীর ন্যাশনালিজমভিত্তিক ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনে দাঁড়িয়েছিল।

প্রভাষক
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি