মত-বিশ্লেষণ

জাপানের বন্ধু বাংলাদেশের সন্তান বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল

কাজী সালমা সুলতানা:বাংলাদেশের অনেক কৃতী সন্তান যোগ্যতা ও কাজের মাধ্যমে বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তেমনি একজন কৃতীজন বিচারপতি ড. রাধা বিনোদ পাল। সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান তাদের হিংস্র রূপ থেকে সভ্য জাতিতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ১৯৩৭ সালে তারা চীনের ওপর নৃশংসতা চালিয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে বর্বরতা দেখিয়েছে তারা, সেসব অপরাধের বিচারের মামলা সামনে এসে দাঁড়ায়। ১৯৪৬-৪৮ সাল পর্যন্ত মহা ধ্বংসলীলার জন্য জাপানের রাজধানী টোকিও মহানগরে জাপানকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করানো হয়। জাপানিদের দ্বারা সংঘটিত সব ধরনের বর্বরতার বিচারের জন্য গঠিত হয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের ‘টোকিও ট্রায়াল’।

এ ট্রায়ালের জন্য আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. রাধা বিনোদ পাল। হিটলারের মন্ত্রিপরিষদ এবং যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিচার করা হয় নুরেমবার্গে আর জাপানের সমরবিদ জেনারেল হিদেকি তোজোর বিচার করা হয় টোকিও ট্রাইব্যুনালে। ১১ দেশের ১১ প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত হয় টোকিও ট্রায়াল। এ ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রধান বিচারপতি ছিলেন ড. রাধা বিনোদ পাল। বিচারের এক পর্যায়ে রাধা বিনোদ পাল বাদে অন্য সব বিচারপতি জেনারেল তোজোকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করে ফাঁসিতে ঝোলানোর রায় দেন। অন্যান্য বিচারপতির ধারণা ছিল, বিচারপতি পালও মিত্রশক্তির পক্ষে অনুগত থাকবেন। কিন্তু বিচারপতি রাধা বিনোদ পালের ৮০০ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক রায় মিত্রশক্তি, এমনকি বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। তার প্রজ্ঞা আর দৃঢ় কৌশলগত কারণে জাপানিরা বেঁচে যায় অনেক বড় ক্ষতি থেকে। জাপানিরা যা করেছিল, তার পেছনে অল্প কজনের হাত থাকলেও মিত্রশক্তি চেয়েছিল পুরো জাতিকেই এর ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিতে, যেটি রাধা বিনোদ পালের কারণে সম্ভব হয়নি। এ রায় বিশ্বনন্দিত ঐতিহাসিক রায়ের মর্যাদা লাভ করে।

এ রায় জাপানের বিপক্ষে গেলে জাপানকে আন্তর্জাতিকভাবে সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হতো এবং বিভিন্ন শাস্তি ভোগ করতে হতো। এ রায়ের কারণে বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল ‘জাপান-বন্ধু ভারতীয়’ খ্যাতি অর্জন করেন। তাই জাপান সম্রাট হিরোহিতো কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, যতদিন জাপান থাকবে, ততদিন বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবে না। এই ঘটনার প্রায় ৬৫ বছর পর ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিসানে হামলায় নয়জন জাপানী বিশেষজ্ঞ মারা যায়। তখনও বাংলাদেশের পাশে ছিল জাপান। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃশর্ত বন্ধু। বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের টোকিও ট্রায়াল নিয়ে একটি টেলিসিরিয়ালও নির্মিত হয়েছে।

বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অধিকারী রাধা বিনোদ পাল ১৮৮৬ সালের এ দিনে (২৭ জানুয়ারি) কুষ্টিয়ার তৎকালীন দৌলতপুর থানার তারাগুনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মিরপুর উপজেলার গোলাম রহমানের কাছে তার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত লেখাপড়া করেন কুষ্টিয়া হাই স্কুলে। ১৯০৮ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সিয়াল কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে গণিতে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ১৯১১-১৯২০ পর্যন্ত তিনি অধ্যাপনা করেন। ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম পাস করে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯২৪ সালে। আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে ১৯১৩ সালে প্রণীত ভারতবর্ষের আয়কর আইনের সময়োপযোগী সংস্কার করেন। যুক্ত হন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সরকারের আয়কর আইন-সংক্রান্ত উপদেষ্টা ও ইউনিভার্সিটি ল কলেজের অধ্যাপনার সঙ্গে। তিনি ১৯৪১ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক মনোনীত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে কাজ করেন ১৯৪৪-৪৬ পর্যন্ত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক ছাড়াও জীবদ্দশায় অনেক বড় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে নিহোন বিশ্ববিদ্যালয় রাধাবিনোদ পালকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি দেয়। তিনি জাপান সম্রাটের কাছ থেকে জাপানের সর্বোচ্চ সম্মানী পদক ‘কোক্কা কুনশো’ও গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক আইনের পণ্ডিত ড. রাধা বিনোদ পাল একাধিকবার আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের বিচারপতি ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘জাতীয় অধ্যাপকের’ সম্মানে ভূষিত করে।

জাপানের ইতিহাসে রাধা বিনোদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। জাপানি পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে তার জীবনী। তার নামে জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু মেমোরিয়াল ও মনুমেন্ট। চিরকৃতজ্ঞ জাপান ড. রাধা বিনোদ পাল স্মরণে টোকিওতে তার নামে সড়ক এবং কিয়োটো শহরে তার নামে জাদুঘর ও স্ট্যাচু করেছে। তার স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য গঠিত হয়েছে পাল ফাউন্ডেশন। জাপান বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে একটি রিসার্চ সেন্টারও আছে। খ্যাতিমান এই মনীষী ১৯৬৭ সালের ১০ জানুয়ারি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..