প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জাবিতে আসছে শীতের অতিথি পাখি

নোমান বিন হারুন, জাবি: পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। শীতের সঙ্গে মিতালি গড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোর স্নিগ্ধ পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে অতিথি পাখিরা। লেকের লাল শাপলার ফাঁকে চলে তাদের জলকেলি। ঝাঁকে ঝাঁকে ওড়াওড়ি, কিচিরমিচির শব্দে ভরিয়ে তুলছে চারপাশ। মনোরম এ দৃশ্য দেখতে লেকপাড়ে ভিড় জমাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।

অগ্রহায়ণের শুরুতে হালকা শীতের আবহে জাবি ক্যাম্পাসে এসব পরিযায়ী পাখির আসা শুরু হয়। মাঘের শেষ পর্যন্ত থাকে থাকে তাদের বিচরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোর মধ্যে পুরোনো প্রশাসনিক ভবনের সামনের লেক, পরিবহন চত্বরের পেছনের লেক, সুইমিং পুল-সংলগ্ন জয়পাড়া লেক ও ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের লেকে অতিথি পাখিরা ভিড় জমায়। চৌরঙ্গী এলাকার রাস্তার দুই ধারের লেকেও অতিথি পাখির আনাগোনা দেখা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্যমতে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোয় ১৯৮৬ সালে প্রথম অতিথি পাখিরা আসতে শুরু করে। আগে দেশি-বিদেশি মিলে ১৯৫ প্রজাতির পাখির দেখা মিলত। তবে এখন দেশি প্রজাতির সংখ্যা বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব পাখি আসে তার মধ্যে বেশিরভাগ হাঁস জাতীয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑজলময়ূর,

ছোট সরালি, গার্গিনি, চিতা টুপি, বামুনিয়া, মুরহেন, খঞ্জনা, পিনটেইল, কোম্বডাক, পচার্ড, লাল গুড়গুটি, জলপিপি, শামুকভাঙা, নাকতা, মানিকজোড়, খোঁপাডুবুরি, ছোট পানকৌড়ি প্রভৃতি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট-বড়

১২টি লেক থাকলেও সাধারণত চারটি লেকে পাখিরা আসে।

পাখি বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত অতিথি পাখিরা আসতে শুরু করে। তীব্র শীত থেকে বাঁচতে হিমালয়ের আশপাশের অঞ্চল থেকে পাখিরা ছুটে আসে। জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে এসব অতিথিরা বংশানুক্রমে পরিযায়ী হয়। তবে বিগত বছরগুলোয় পাখিদের উপস্থিতি তুলনামূলক কমে যাচ্ছে। এজন্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও দর্শনার্থীদের আনাগোনাকে দায়ী করছেন অনেকে।

পাখি বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবারও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতেই পাখি আসা শুরু করেছে। ভর্তি পরীক্ষার কারণে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের ভিড় আর যানবাহনের শব্দের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন এলাকার লেকগুলোতে এখনও পাখিরা আসতে শুরু করেনি। তবে সংরক্ষিত লেকগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাখির আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগই ছোট সরালি প্রজাতির। নভেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়টুকু পাখি আসার সবচেয়ে অনুকূল সময়। আশা করছি বিগত বছরের মতো এবারও বিপুলসংখ্যক পাখির দেখা মিলবে।’

পাখি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে করতে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ আয়োজন করে ‘পাখি মেলা’।

মেলা আয়োজনের আহ্বায়ক অধ্যাপক কামরুল আহসান জানান, ‘গত বছর আমরা কভিড অতিমারির জন্য পাখি মেলা করতে পারিনি। তবে প্রাণিবিদ্যা বিভাগ এ ব্যাপারে সজাগ আছে। পাখি মেলার সম্ভাব্য তারিখ ৭ জানুয়ারি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. আব্দুর রহমান বলেন, ‘অতিথি পাখি আগমনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখে। ইতোমধ্যেই লেকের পাশে সতর্কতামূলক ব্যানার স্থাপন করেছি। পাখির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে লেক সংস্কার করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন লেকের পানিতে অতিরিক্ত কচুরিপানা পরিষ্কার, কাঁটাতারের বেড়া মেরামত করা হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আনন্দ মোহন রায় বলেন, অতিথি পাখিরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক অন্যতম অনুষঙ্গ। এ সময় আমরা লেকপাড়ে দিনভর পাখিদের কিচিরমিচির শুনি। তারা যেন আমাদের নিমন্ত্রিত অতিথি। শীতের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে পাখিদের আনাগোনা এক মোহময় আবহ সৃষ্টি করে।

প্রকৃতির নিয়ম মেনে প্রতি বছর পাখিরা দিগন্তের ওপার থেকে ছুটে আসে। তেমনি আমাদেরও দায়িত্ব তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা।