দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

জালিয়াতি প্রমাণের পরও পদোন্নতি পদ্মা অয়েলে

সাড়ে আট কোটি টাকার অনিয়ম

শেখ আবু তালেব: আর্থিক জালিয়াতির প্রমাণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ থাকার পরও কর্মকর্তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। উপরন্তু পদোন্নতি ও পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদনে কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের জন্য দায়ী করা হয়েছে এমন ব্যক্তিরাও পার পেয়ে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল লিমিটেডের এমনই এক বিতর্কিত কর্মকর্তাকে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এমনকি এক প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) থাকা সত্ত্বেও নতুন আরও একটি প্রকল্পে পি

জানা গেছে, পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে মোসাদ্দেক হোসেন নামে এক কর্মকর্তা গুপ্তাখাল এসি প্লান্টের কাজের দায়িত্বে ছিলেন। প্লান্ট ইঞ্জিনিয়ার থাকা অবস্থায় আট কোটি ৫৭ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্লান্ট ইনস্টলের সময়ে এই অর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়। তার বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে ২০০০ সালে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

পদ্মা অয়েলের ফার্টিলাইজার বিভাগের ব্যবস্থাপক মাহমুদ উল আলমকে আহ্বায়ক ও অ্যাকাউন্টস এক্সিকিউটিভ মহিউদ্দিন আহমেদকে সদস্য করে তদন্ত গঠিত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি কয়েক মাস তদন্ত শেষে ২০০০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়।

এতে উল্লেখ করা হয়, মোসাদ্দেক হোসেন দায়িত্ব পালনকালে রিপ্যাকিং কাজে ব্যবহার করা কাঁচামালের এক লাখ ৬৯ হাজার ২৭৩ দশমিক ৭৫ কেজি লস বা ক্ষতি হয়েছে। কাজের সময়ে ক্ষতি হয়েছে ১১ হাজার ২৭৮ দশমিক ৭৫ কেজির। এটি করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এতে পদ্মা অয়েলের লোকসান হয়েছে এক কোটি ৩৪ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। অননুমোদিত এই লোকসানটি হয়েছে পূর্বানুমতি না নেওয়ায়।

এছাড়া কম শ্রমিক নিয়ে বেশি মজুরি দেওয়া, শ্রমিক নিয়োগ না করেই পারিশ্রমিক দেওয়া ও বিভিন্ন ইনস্টলমেন্ট কাজে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। সব খাতের জালিয়াতির তথ্য যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় আট কোটি ৫৭ কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ কোম্পানির লোকসান হয়েছে তার দায়িত্বে থাকাকালে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও বলা হয়েছে।

এই অভিযোগের পরও তাকে পদ্মা অয়েলের ফার্নেস অয়েল, এমটিটি ও জেবিও’র বিক্রয়, বরাদ্দ ও বণ্টনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই পদে থেকে তিনি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বরাদ্দ দিয়ে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন পদ্মা অয়েলের এক শেয়ারহোল্ডার। এমন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কোম্পানির মংলা অয়েল ইনস্টলমেন্ট প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে।

কিন্তু তার বিরুদ্ধে এ অনিয়মের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এখনও। উল্টে ২০০৮ সালে তাকে এম-২ গ্রেডে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হয়। প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পদোন্নতি অনুমোদন করে। এর পরে তিনি দুই ধাপে পদোন্নতি পেয়ে এম-১ গ্রেডে উপ-মহাব্যবস্থাপক হন।

এখানেই শেষ নয়, সম্প্রতি তাকে মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এমনকি নিজেকে পদোন্নতি দিতে গত বছরের ১০ এপ্রিল জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেন মোসাদ্দেক। কিন্তু তা নাকচ করে বলা হয়, এই আবেদন সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা পরিপন্থি।

মোসাদ্দেক হোসেনকে আবার মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য চেষ্টা চলছে। এখানেই শেষ নয়, অভিযুক্ত মোসাদ্দেক খুলনার মংলায় একটি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তাকে নতুন করে আরও একটি প্রকল্পের পিডি নিয়োগ করা হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর তাকে রাজধানী ঢাকার পরিবাগ এলাকায় গৃহীত একটি প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা কোম্পানির কর্মকর্তাদের আরও বেশি হতাশ করেছে। এতে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ ও নতুন করে আরও দুর্নীতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দুর্নীতির পরও একটি মহল তাকে রক্ষায় উঠে-পড়ে লেগেছে বলে জানা গেছে।

রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটিতে এর আগে একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। সেই তদন্ত এখনও চলছে, কিন্তু অধরা রয়ে গেছেন অনেকেই। এ বিষয়ে পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..