দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

জাহাজ ভাঙা শিল্প তিন বছরে দুর্ঘটনায় ৬৬ শ্রমিক নিহত

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় গত তিন বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৬ শ্রমিক। বছরে কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় গড়ে ১৬-১৭ শ্রমিক প্রাণ হারালেও নিহত ও আহতদের সংখ্যা এবং আহতদের অবস্থান নিয়ে মালিকপক্ষ লুকোচুরি করছে। কিন্তু বছরের পর বছর জাহাজ-ভাঙা শিল্প খাতে দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের নিহত হওয়ার হার ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেলেও দায়ী মালিকদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এযাবৎ কোনো দায়ী মালিকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়েরও হয়নি।
জাহাজ-ভাঙা শিল্প খাতে ধারাবাহিক দুর্ঘটনায় শ্রমিক আহত ও নিহত হওয়ার প্রতিবাদে গতকাল সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জাহাজ-ভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের নেতারা উল্লিখিত অভিযোগ উত্থাপন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক জাতীয় শ্রমিক লীগের যুগ্ম সম্পাদক মো. শফর আলী। আর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন ফোরামের আহ্বায়ক বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত এবং ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন।
শফর আলী বলেন, গত ৩১ আগস্ট চট্টগ্রামের বারআউলিয়ায় অবস্থিত জিরি সুবেদার নামক শিপইয়ার্ডে কর্মরত অবস্থায় লোহার তার ছিঁড়ে দুই শ্রমিক নিহত এবং আরও ১০-১২ শ্রমিক আহত হয়েছেন। ৩১ জুলাই সোনাইছড়িতে অবস্থিত জাহাজ-ভাঙা মালিক সমিতির নেতা কাশেম মাস্টারের মালিকানাধীন ম্যাক করপোরেশন নামক শিপইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস বিস্ফোরিত হয়ে তিন শ্রমিক নিহত ও চার শ্রমিক মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। শুধু চলতি বছরেই ১৬ শ্রমিক নিহত হয়েছেন।
এই বছর নিহত ১৬ জনের মধ্যে আট শ্রমিক আগুনে দগ্ধ হয়ে এবং বিষাক্ত গ্যাস বিস্ফোরিত হয়ে মারা গেছেন, অথচ জাহাজগুলো যদি গ্যাসমুক্ত করে কাটা হতো, তাহলে আট শ্রমিকের প্রাণ হারাতে হতো না। একইভাবে যথাযথভাবে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ না দিয়ে এবং আধুনিক, নিরাপদ ও সচল যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে জাহাজ কাটা হচ্ছে। এতে চলতি বছরই কেবল প্লেটে চাপা পড়ে পাঁচ শ্রমিক নিহত হয়েছেন, যা জাহাজ-ভাঙা শিল্পের মালিকপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। তিনি বলেন, তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তথা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর, বিস্ফোরক এবং পরিবেশ অধিদফতর-সহ সংশ্লিষ্ট সব দফতরের তদারকি আরও জোরদার করা উচিত।
শফর আলী আরও বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মস্থলে নিহত শ্রমিকদের দুই লাখ টাকা এবং এর সঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত ক্রাইসিস কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক আরও পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও তা সব নিহত শ্রমিকের পরিবার পাচ্ছে কি না, সেজন্য কোনো তদারকি নেই। ফলে হতভাগ্য নিহত শ্রমিকদের পরিবার প্রাপ্য ক্ষতিপূরণও যথাযথভাবে পাচ্ছে না। তিনি নিহত প্রত্যেকের পরিবারপ্রতি ১০ লাখ টাকা এবং আহত হয়ে যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং টেকসই ও নিরাপদ শিপব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। আগামী সাত দিনের মধ্যে দাবিগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে হুশিয়ারি দেওয়া হয়।

সর্বশেষ..