প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জিপিএ ৫ নয়, লক্ষ্য যেন হয় ভালো মানুষ হওয়া

ওবায়দুর রহমান: মর্জিনা (প্রকৃত নাম নয়) মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ায় খুব ভালো। অবশ্য তার মা-বাবা তার লেখাপড়া নিয়ে মোটেই খুশি নন, কারণ পাশের বাসার ছেলেটা তার থেকে ১০ নম্বর বেশি পেয়েছে। কয়েক দিন হলো তার মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। সে জিপিএ ৫ পেয়েছে। মা-বাবার একটাই স্বপ্ন ছিল তার মেয়ে জিপিএ ৫ পাবে। যেভাবেই হোক তার মেয়েকে জিপিএ ৫ পেতেই হবে। পরীক্ষার আগে মর্জিনা অমানবিক পরিশ্রম করে মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য। সারাদিন কোচিং, প্রাইভেট ও স্কুল নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে মর্জিনা। বাসায় এলেই মা পড়তে বসার জন্য চাপ দিতে থাকেন। সারাদিন এই স্যার থেকে ওই স্যার, এই কোচিং থেকে ওই কোচিং করতে করতে তার শরীরটা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বাসায় এসে সে পড়ার টেবিলে বসতে আর সায় দিতে চায় না। মর্জিনার মনে হয় এখন যদি বিছানায় শরীরটা একটু এলিয়ে দেওয়া যেত, তবে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হতো। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব নয়, কারণ একটু পরেই গণিত স্যার আসবেন পড়াতে। মর্জিনার মনে হয় তার জীবনটা কেমন জানি রোবটের মতো হয়ে যাচ্ছে। নেই কোনো আরাম-আয়েশ, নেই কোনো অবসর। সারাদিন শুধু পড়া আর পড়া। গণিত স্যার চলে গেলে আসবেন ক্যামিস্ট্রির স্যর। তারপর ফিজিক্স, ইংলিশ…। স্যারদের পড়ানো শেষ হলে মর্জিনার নিস্তেজ দেহটাকে টেনেহিঁচড়ে পড়ার টেবিলে বসিয়ে দেয় মা। এভাবেই চলে মর্জিনার দৈনন্দিন জীবন। তার পরীক্ষার সময় যত ঘনিয়ে আসে তার পড়াশোনার চাপ ততই বাড়তে থাকে। একসময় তার পরীক্ষা শুরু হয় এবং সে সব পরীক্ষা খুব ভালোভাবে শেষ করে। ফল প্রকাশিত হলে দেখা যায় সে জিপিএ ৫ পেয়েছে। এতে মা-বাবাসহ গ্রামের সবাই খুশি। এভাবে হাজারো মর্জিনা প্রতিনিয়ত জিপিএ ৫ পাওয়ার আকাক্সক্ষা নিয়ে বিষিয়ে তুলছে তাদের শিক্ষাজীবন।

জিপিএ ৫-কে জীবনের লক্ষ্য গ্রহণ করে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে হাজারো তরুণ-তরুণী। যে বয়সে তাদের মেধা বিকশিত হওয়ার কথা নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, সেই বয়সে তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে জিপিএ ৫-এর বীজ। তাদের মাথায় প্রোগ্রাম্ড করে দেয়া হচ্ছে যে, তাকে যে কোনো মূল্যে জিপিএ ৫ পেতে হবে। জিপিএ ৫ না পেলে সে ভালো ছাত্রছাত্রী নয়। তথাকথিত ভালো শিক্ষার্থীর তকমা পেতে হলে তাকে জিপিএ ৫ পেতে হবে। পরিবার, পাশের বাসার আন্টি ও সমাজের চাপে এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা একদম চিড়েচ্যাপ্টা স্যান্ডুইচ হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে জিপিএ ৫ পাওয়ার মূলমন্ত্র। এতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন, জিপিএ ৫ অর্জন নয়। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা জিপিএ ৫-এর পেছনে ছুটে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জিপিএ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের নোট ও গাইড মুখস্থ করে তা উগরিয়ে দিয়ে আসছে পরীক্ষার হলে। ফলে তারা প্রকৃত জ্ঞান অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের সমাজ বারবার শিক্ষার্থীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে-‘তোমাকে জিপিএ ৫ পেতে হবে। জিপিএ ৫ না পেলে তুমি ব্যর্থ। সমাজ তোমাকে ব্যর্থ বলে আখ্যায়িত করবে।’ কিন্তু সমাজ কখনও এটা বলে না যে, ‘জিপিএ ৫ পাওয়ার আগে তোমাকে একজন ভালো মানুষ হতে হবে।’

শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে সমাজে একজন ভালো মানুষ হওয়া। একজন আদর্শবান মানুষ হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মাথায় জিপিএ ৫-এর পোকা ঢুকিয়ে দিয়ে আদর্শবান মানুষ হওয়া থেকে তাদের বঞ্চিত করছি। এভাবে জিপিএ ৫-কে লক্ষ করে সামনের দিকে অগ্রসর হলে জাতি অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অন্ধকারের করাল গ্রাসে পতিত হবে জাতির ভবিষ্যৎ। জিপিএ ৫-এর জয়জয়কারে যখন চারপাশ মুখর হয়, তখন একদল কোমলমতি শিক্ষার্থী যারা জিপিএ ৫ পায়নি, তারা হতাশার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়। জিপিএ ৫ না পাওয়ার ব্যার্থতায় তাদের জীবন বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। জিপিএ ৫ না পাওয়ায় সমাজ তাকে ব্যর্থতার তকমা উপহার দিচ্ছে। সমাজ তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, জিপিএ ৫ না পেলে সে সফল নয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা। কিন্তু শিক্ষা এখন হয়ে উঠেছে কেবল জিপিএ ৫-এর লক্ষ্য। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার চর্চা একেবারেই হচ্ছে না। আমাদের শিক্ষা আসলে আজকাল সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, যার কারণেই প্রকৃত মানুষ হওয়ার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে আমরা হয়ে যাচ্ছি ফলাফলকেন্দ্রিক। আর তখনই আমরা প্রত্যাশিত ফলাফল যখন পাচ্ছি না, তখন বেছে নিচ্ছি আত্মহত্যার পথ। প্রত্যেক পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যায়, যারা ফলাফল খারাপ করে, তাদের অনেকে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। ব্যর্থতার গ্লানি, সমাজের তাচ্ছিল্য ও পরিবারের মানসিক চাপ এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করতে না পেরে অকালে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। অথচ এই শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে একদিন সংসারের হাল ধরত, দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করত। আমাদের উচিত এসব কোমলমতি শিক্ষার্থীকে ভালো মানুষ হতে উৎসাহ দেয়া। তারা যেন এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে আসে, এ ব্যাপারে তাদের সচেতন করা। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ফলাফলকেন্দ্রিক করার পরিবর্তে প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভেতর নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। এর জন্য শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, পরিবার ও সমাজের মানুষের আরও সচেতন হতে হবে, যেন শিক্ষার্থীদের খারাপ ফলাফলের জন্য হেয়প্রতিপন্ন না করে তারা তাদের মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে থাকে, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।

আজকের শিক্ষার্থীই সমাজ ও দেশ গড়ার কারিগর। ফলাফল জিপিএ ৫ নয়; বরং শিক্ষা হোক মূল্যবোধ জাগ্রত হওয়ার, শিক্ষা হোক মনুষ্যত্ব বিকাশের, শিক্ষা হোক জ্ঞানার্জনের।

শিক্ষার্থী

ইংরেজি বিভাগ

ঢাকা কলেজ