আজকের পত্রিকা দিনের খবর প্রথম পাতা মত-বিশ্লেষণ সর্বশেষ সংবাদ

জিহাদের হৃদযন্ত্রের ছিদ্রই বলে দেয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র!

মর্মস্পর্শী

নিজস্ব প্রতিবেদক: ছোট্ট সাধারন এক খেটে খাওয়া মানুষের বসত বাড়ি। সামনে খাল, পিছনে পানিতে ডুবে যাওয়া মাঠ। এক চিলতে নিচু জমিতে বসবাস জিহাদের পরিবারের। হ্যাঁ, বাগেরহাটের ডেমার কাশিমপুরের জেহাদ। ১১ বছরের ছোট্ট শিশু, যে তার হৃদযন্ত্রের ছিদ্র সারাতে ঢাকায় গিয়েছিল বড় আশা নিয়ে।

কিন্তু ফিরে এসেছে করোনার অভিশাপ নিয়ে! জন্ম হতেই জিহাদের ভিএসডি রোগ। একটু দৌঁড়ালে হাফিয়ে যেত, উঠে যেত কাশি। খেলতে পারত না। ছুটতে পারত না জিহাদ। গ্রাম্য টোটকা চিকিৎসাই ছিল জিহাদের এগারো বছর ধরে ভরসা!

ছবি ডা: মোশাররফ হোসেন মুক্ত এর ফেসবকু ওয়াল থেকে নেওয়া

চলতি এপ্রিলের প্রথম দিকে জ্বরে ধরলে আর কমেনা। বাড়ে শ্বাস কষ্ট। এপ্রিলের মাঝামাঝি জিহাদের গরীব বাবা ধার-দেনা করে দালালের পরামর্শে যায় খুলনার এক প্রাইভেট হাসপাতালে। এগারো বছর পর জানা গেল জিহাদের হৃৎপিণ্ডে আছে জন্মগত ত্রুটি।

হায়রে আমাদের গালভরা প্রান্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। হায়রে শত কোটি টাকার ডিজিটাল হেলথ ভিডিও কনফারেন্সের আড্ডাবাজি। জিহাদের এগারো বছর লেগে গেল জানতে তার এই হৃৎপিণ্ডের রোগের কথা!

মাঝ এপ্রিলে খুলনার বেসরকারি হাসপাতালের এক বে আক্কেল তাকে পাঠায় ঢাকা হৃদরোগ হাসপাতালে। শুধু ভাবুন, জিহাদের দিন মজুর বাবা-মা তাকে এই করোনাকালে কিভাবে ঢাকায় নিয়ে গেল!

ছবি ডা: মোশাররফ হোসেন মুক্ত এর ফেসবকু ওয়াল থেকে নেওয়া

সন্তানের হৃৎপিণ্ডটা অপারেশন হলে ভালো হয়ে যাবে। তাই আরো ধার-দেনা করে যায় ঢাকায়। বিশাল ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট এর বিশাল প্রাঙ্গণে এরকম জিহাদের বাবাদের কে খোঁজ রাখে বলতে পারেন?

সারাদিন ঘুরে ফুটপাতের দোকানে খেয়ে শত মানুষের স্পর্শ আর ছোঁয়ার পর দালাল ধরে জিহাদের ঠাঁই মেলে বড় হাসপাতালের এক কোণে। আবার জিহাদের বাবার ধার-দেনার বোঝা বাড়ে। শ্বাস কষ্ট বাড়ে জিহাদের। ডাক্তার বলে বাড়ি যাও।

করোনাকাল কেটে গেল এস। হবে অপারেশন। পরদিন বাড়ি ফিরে আসে জিহাদ। নিয়ে আসে অভিশাপ, করোনা!
না, জিহাদ পালিয়ে আসেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র নিয়েই সে এসেছে। দিনমজুর বাবা তাকে বুকে আগলে ফিরিয়ে এনেছে তাদের এক চিলতে নিজ ভুইয়ে!

একদিন পর তাদের বাড়িতে শহরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তারা জানতে পারে তাদের এই করোনা অভিশাপের কথা। এখন তারা গৃহ অন্তরীণ। সাহায্য মিলেছে খাবার, চাল, ডাল, তেল, কুমড়ো আর মশলা। ওষধ কেনার পয়সা নেই। পুষ্টিকর খাবারের সংস্থান নেই। ধার-দেনা আকন্ঠ, তা শোধবার উপায় নেই।

আমি জানি তবু বেঁচে থাকবে জিহাদ। মৃত্যুকে সাথে করে এগারো বছর লড়ে যে টিকে আছে সে জিতবেই, হারবে না আর। হায় আমার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাগাড়ম্বর! একজন শিশু বুকের ভিতর মৃত্যু নিয়ে লড়ে যায় নিরন্তর, জানতেই পারে না কি হয়েছে তার।

জিহাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তার বাড়িতে ডা: মোশাররফ হোসেন মুক্ত। সাথে জিহাদ ও তার বোন

তার বাড়ির সামনে খাল। একটা বাঁশের সাঁকোও নেই। প্রতিবেশির বাড়ির সামনে এক বাঁশের সাঁকো পার হয়ে আরেকটা বাশের সাঁকো পার হয়ে জিহাদদের চলাচল। লাল পতাকা দিয়ে তাদের সীমাবদ্ধ জীবন আরো গন্ডিবদ্ধ!

করোনা চিহ্ন এই লাল পতাকা উঠে যাবে। মানুষ বিজয়ী হবে। জিতবে জিহাদও। আমি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মাতব্বরদের কাছে। স্বাস্থ্য বিভাগের প্রান্তিক ব্যবস্থাপনার সাফল্য নিয়ে সারাক্ষণ মুখে ফেনা তুলে ফেলা অর্বাচীনদের কাছ!

ডিজিটাইলেজেশনের শত কোটি টাকার টেন্ডার হয়ে যায় নিরবে। এক পর্দা কেনা হয় লাখ লাখ টাকায়। শত কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্র পড়ে নষ্ট হয় গুদামে। আমাদের জিহাদ কেন তার হৃৎপিণ্ডের ছিদ্রের কথা এগারো বছরেও জানতে পারে না?

কেন তার শৈশব কৈশোর কেটে যায় না খেলে, হাঁপিয়ে? কেন অসুস্থ বালক হৃৎপিণ্ডের ক্ষত সারাতে বসে রবে বিশাল অট্টালিকার বারান্দায় আর প্রাঙ্গনে সারাদিন! কেন সুস্থ হতে এসে সে ফিরে যাবে আরেক ঘাতক ব্যাধি শরীরে নিয়ে??

তাকে দেখে ফিরে আসার সময় হতে আত্মদংশনে ভুগছি। চিকিৎসক হিসেবে, একজন সমাজকর্মী হিসেবে, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে, স্বাস্থ্যসেবা আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে মনে হচ্ছে আমরা পরাজিত। স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনা আজ যাদের হাতে তারা জনবিচ্ছিন্ন। চাটুকার আর দালালরা সব অর্জন ধ্বংস করে দিচ্ছে!

(ডা: মোশাররফ হোসেন মুক্ত, সাধারণ সম্পাদক বিএমএ, সভাপতি স্বাচিপ, বাগেরহাট জেলা-এর ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া)

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..