প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জীবনযাত্রার মান ও আমাদের মনস্তত্ত্ব: অগ্রগতির আশাবাদ 

তাজরীন ইসলাম তন্বী: ৯০ এদেশের জন্য অদ্ভুত রকম ধনী একটা সময় ছিলো। অন্তত নাইন্টি’স কিড হিসেবে যতটুকু মনে পড়ে। নাটক, সিনেমা, সাহিত্য, ফুটবল আর সব কিছুতে একটা নিজস্বতা তৈরী হয়েছিলো সে সময়। বাঙালি, বাংলাদেশি এই শব্দ গুলোর অর্থ পূর্ণতার রূপ পাচ্ছিলো ধীরে ধীরে। সেই সময়টার সব চেয়ে বড় ধারক ছিল বোধয় তখনকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। নিজ চোখে দেখি নি। আন্দাজ করতে পারি। নেট ঘেঁটে সে সময়টার ছবি দেখলে চোখে প্রশান্তি আসে। শাড়ী-পাঞ্জাবী আর শালের ভাঁজে ভাঁজে যে আভিজাত্য আর আত্মবিশ্বাস দেখি তাতে বাঙালি সুলভ যে হীনম্মন্যতা, জাতীয়তাবোধের অভাবের গল্প শুনি যুগে যুগে, তার আফসোস মিটে যায়।

আজকাল বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর চরিত্র, এর ছাত্রছাত্রী দের মনস্তাত্ত্বিক দারিদ্র্য দেখে ওই সোনালী দশকটা ছিলো বিশ্বাস হতে চায় না। কি কারণে সেই দশকটা আমরা টানতে পারলাম না জানতে ইচ্ছা করে। ২০০০ বা তার পরবর্তী সময়ে হুট করে সিনেমায় যে অন্ধকার যুগ আসলো, লেখায় তার ছাপ পড়লো-একটার পর একটা মেধাবী শিল্পী, অভিনেতা, লেখককে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়া হলো, এর পেছনে যে রাজনৈতিক খেলা ছিলো, তা কেনো পেছনে ৯০ এর পরের ১০ টা বছরের মত সময় কে ধারণ করা বাঙালি প্রতিহত করতে পারলো না জানতে ইচ্ছা করে।

একসময় যেখানে ছাত্রীসংসদ নির্বাচন হতো, সেই জাবি তে আজ বিভাগের সংসদের ‘সংরক্ষিত’ নারী প্রার্থীর পদ নিয়ে ছেলেখেলা করা হয় জেনে খারাপ লাগে। মাঝে ২০০০ থেকে ১ টা দশক গেছে, আরেকটা দশক ও যাই যাই করছে। ধীরে ধীরে যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে মেরে ফেলা হয়েছে, আড্ডার জায়গা গুলোকে সরিয়ে, শতবিভক্ত করে, সময় দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে। সবশেষে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটতে থাকা সংগঠন গুলোর কাজ কর্মেও যে বাধা দেয়া হবে, টিএসসি গুলো বন্ধ করে দেয়া হবে, এ আর নতুন কি?

আড্ডাকে কেন্দ্র করে একেকটা দল তৈরী হয়। যাদের চিন্তা চেতনা এই আড্ডা গুলোকে ঘিরেই পরিণত হতে থাকে । মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই আড্ডা গুলোর বিষয়বস্তু, চিন্তার স্ট্যান্ডার্ড স্থান, পাত্র ভেদে খুব বড় আকারে বদলায়। এই যে আজ আমরা একীভূত চিন্তা করতে পারছি না, মতভেদ এত বেশি বেড়ে গিয়েছে তার পেছনে এই আড্ডার জায়গাগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ, এলোমেলো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে করে দেয়া বিশাল ভূমিকা রেখেছে। ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক হওয়ার পেছনে শুধু ফেসবুক, ওয়াইফাই কে দুষে তো লাভ নেই ; আমরা আলাদা হচ্ছি, আমাদের এন্টি পার্টি বাড়ছে তার কারণ আমরা অনেক গুলো ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পড়েছি। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো- ডাকসু, জাকসু বিহীন এই সময়ে এমন কোন শক্তিমান ব্যক্তিত্ব বা নেতা তৈরী হওয়া সম্ভব নয় যে এই সব গুলো ছোট ছোট উৎসুক দল আর দলের মানুষদের এক সুতোয় গাঁথতে পারে।

আমার খুব আপত্তি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের টগবগে সময়ে ‘জ্বী ভাই’ এর তুবড়ি ছোটানোতে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর এই সংস্কৃতি সামনে আরো ভোগাবে তা তো নিঃসন্দেহ। তবে প্রতিযোগিতায় যে দিন দিন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাচ্ছে, স্মার্ট হচ্ছে, তার কারণ পাবলিকে এই আড্ডা গুলোর অভাব আর সৃষ্টিহীনতা সবকিছুই । ভবিষ্যত দূরে না, যেদিন লাখ টাকার প্রাইভেটে পড়ার খরচ পোষাতে পারবে না বলে মধ্যবিত্ত বাঙালি ছাত্র, তথা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরাও টিকে থাকা সেই সামান্য মনস্তাত্বিক প্রজন্মের অংশ হওয়া থেকে বঞ্চিত হবে। অথচ বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সব কিছুই এসেছিলো এই মধ্যবিত্ত তরুণ শ্রেণীর হাত ধরে।

আরেকটা কাজেও আমার খুব আপত্তি। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে আজকাল যারাই খানিকটা চিন্তা করতে চায়, স্রোতে গা না ভাসিয়ে আলাদা থাকতে চায়, তাদেরই ট্যাগ লাগিয়ে একটা গোষ্ঠীভূত করার চেষ্টা প্রকট। বেশিরভাগ সময়ই সেই গোষ্ঠীর নাম বাম। বামদের প্রতি যে ঋণাত্মক দৃষ্টিভংগী, তাতে তাদের দোষ ই বা কম কি? ফাঁপর, র‍্যাগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আবার তারাই ফাঁপর দিয়ে হাতে ১০ টাকার পত্রিকা ধরিয়ে দিয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে স্রোতে গা না ভাসানো আর উগ্র স্বকীয়তার মধ্যে পার্থক্য না করতে পেরে অনেক কনফিউজড ছেলেমেয়েই তাই এদের দলে নাম লেখায়- যেখানে সেই ছেলেমেয়ে গুলোর হাত ধরেই চিন্তা গুলো বেঁচে থাকতে পারতো। বাম আর ভেক ধরা বামের এই জগাখিচুড়িতে সব চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কিছু স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে চাওয়া মানুষ দের-যাদের সাথে অলক্ষ্যেই লেগে যায় সেই ট্যাগ। লাভের লাভ কিছুই হয় না। শুধু যোগ হয় কিছু বাড়তি প্রতিকূলতা। শুধু বাম কেনো? সব মতাদর্শ ই কিছু ভিত্তি, লক্ষ্য আর মূল্যবোধ নিয়ে চলে। কিন্তু সেই আদর্শ কি জানতে চাইলে কোনদিন চেতনা আর এর কিছু প্রতিশব্দ ছাড়া আর কোন বিস্তারিত অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। নতুন কিছু দরকার। এই লেজুড়বৃত্তি আর আপোষকামিতার চক্রবুহ্য ভেঙে নতুনত্বের জন্মদান খুব কঠিন মনে হয়।

এই অস্থির সময়কাল থেকে বেরোনো জরুরী। যাকে বলে ইটস হাই টাইম। আজকাল আমরা বই পড়তে ভুলে গেছি। কবিতা পড়তে ভুলে গেছি। ভুলেও বোধয় এখন প্রেমিকেরা কবিতা শোনায় না, লেখে না। অথচ এই অল্প কিছু জিনিস ছাড়া তেমন আর কিছুই নাই যা আমাদের শেকড়, আর ফেলে আসা ৭০, ৯০ কে মনে করাতে পারে। বাঙালি ও পারে, প্রমাণ ফেলে আসা সময়। আমি খুব বিশ্বাস করি জীবনযাত্রার মান বাড়ার সাথে মনস্তাত্ত্বিক ধন বাড়ার সম্পর্ক সমানুপাতিক। তবে আমরা কেনো তলিয়ে যাচ্ছি? বিশ্বাস করি, এই গভীর অন্ধকার থেকেও আলো হয়ে জ্বলে ওঠার মত অনেক কিছুই আছে আমাদের নিজেদের। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী দের প্রতি অনুরোধ, অন্তত একবার সেই মনস্তাত্ত্বিক দারিদ্র্য ভেঙে বেরিয়ে আসুন। নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশ বদলাবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়