মত-বিশ্লেষণ

জীবনের প্রয়োজনে বিমা করুন

রিয়াজুল হক

অনেক মানুষকে আক্ষেপের সুরে বলতে শুনেছি যদি সরকারি চাকরি করতাম, তাহলে চাকরি থেকে অবসরের পর নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পেনশন পেতাম। অনেকেই আবার বলে থাকেন, হঠাৎ যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে পরিবারের কী হবে? কিংবা কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলে পরবর্তী জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা কীভাবে হতে পারে? এরকম অনেক প্রশ্ন। অথচ জীবন বিমার বিভিন্ন স্কিমের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান অনেকাংশে সম্ভব। আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই জীবন বিমা করপোরেশন বিভিন্ন ধরনের জীবন বিমা স্কিম চালু করেছে। জীবন বিমা করপোরেশনের ওয়েবসাইট থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু স্কিমের কথা উল্লেখ করছি, যেগুলোর অনেক কিছুই আমাদের জানা আছে।
বঙ্গবন্ধু সর্বজনীন পেনশন বিমা: বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ২০ থেকে ৬৫ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। আমাদের দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বয়স্ক মানুষকে অবসর জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা দেয়ার জন্যই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ উপলক্ষে জীবন বিমা করপোরেশন এই বিমা স্কিম চালু করেছে। এই স্কিম কমপক্ষে ১০ বছরের পেনশন লাভের গ্যারান্টি দেয়। তবে বিমা গ্রাহক ইচ্ছা করলে ১৫ থেকে ২০ বছর পেনশন সুবিধা নিতে পারবেন। পেনশন সুবিধা গ্রহণের আগে বিমাগ্রাহকের মৃত্যু হলে নমিনি পূর্ণ বিমা অঙ্ক বোনাসসহ প্রাপ্ত হবেন। এছাড়া পেনশন শুরুর পর বিমাগ্রাহকের মৃত্যু হলে নমিনি অবশিষ্ট সময়ের জন্য পেনশনপ্রাপ্ত হবেন। বিমা গ্রহণকালে বয়স সর্বনিম্ন ২০ বছর ও সর্বোচ্চ বয়স ৬০ বছর। এই স্কিমের মেয়াদ সর্বনিম্ন পাঁচ বছর। মেয়াদ পূর্তিতে পেনশনের টাকার ৫০ শতাংশ অথবা ১০০ শতাংশ সমর্পণ (কম্যুটেশন) করে এককালীন টাকা পাওয়ার সুবিধা রয়েছে।
ব্যক্তিগত পেনশন পলিসি: অবসর জীবনের আর্থিক প্রয়োজনের দিকে লক্ষ রেখেই তৈরি করা হয়েছে আমাদের পেনশন বিমা পরিকল্পনা। যে কোনো পেশায় নিয়োজিত মানুষ এই পলিসি নিতে পারেন। এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো কর্মজীবনে অকাল মৃত্যুতে পরিবারের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা বিধান, যা অন্য কোনো সঞ্চয় মাধ্যমে সম্ভব নয়। একই সঙ্গে কর্মজীবনে অকাল মৃত্যুতে জীবন বিমার আর্থিক নিরাপত্তা এবং অবসর জীবনের জন্য আমরণ পেনশনের ব্যবস্থা করা হয়। পেনশন প্রদান শুরুর ১০ বছরের মধ্যে বিমাগ্রহীতার মৃত্যু হলে ১০ বছরের বাকি সময়ের জন্য পেনশনভোগীর মনোনীত ব্যক্তিকে (নমিনি) পেনশন লাভের গ্যারান্টি দেয়া হয়। পেনশন দেয়ার নির্ধারিত তারিখের আগে বিমাগ্রহীতার স্বাভাবিক মৃত্যু হলে নিন্মোক্ত বিকল্পের যেটিতে বেশি অর্থ পাওয়া যায়, তা মনোনীতকে এককালীন পরিশোধের নিশ্চয়তা দেয়া হয়।
ধরা যাক, ৩৫ বছর বয়স্ক কোনো ব্যক্তি ৫৭ বছর বয়স পূর্তির পর থেকে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা পেনশনের জন্য একটি পেনশন বিমা পলিসি গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে মাসিক ১০০ টাকার পেনশনের জন্য এক বছরের প্রিমিয়াম ১৮৪ টাকা ২০ পয়সা। আবার মাসিক পাঁচ হাজার টাকার জন্য এক বছরের প্রিমিয়াম ১৮৪ টাকা ২০ পয়সা – ৫০ বা ৯ হাজার ২১০ টাকা, অর্থাৎ ৫৭ বছর হওয়ার পূর্ব সময় অবধি বার্ষিক প্রিমিয়াম দেবেন ৯ হাজার ২১০ টাকা। মেয়াদ পূর্তি অর্থাৎ ৫৭ বছর পর তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন তত দিন মাসিক পাঁচ হাজার টাকা করে পেনশন পাবেন, যা তার ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে যাবে।
সিঙ্গেল প্রিমিয়াম বিমা: বাংলাদেশের স্বল্প আয়ের মানুষ কৃষক, শ্রমিক, সমবায়ী, পশুপালক, মৎস্যজীবী, কামার-কুমার, তাঁতিসহ দেশে-বিদেশে অবস্থানরত সব স্তরের মানুষ একটিমাত্র প্রিমিয়াম প্রদানের মাধ্যমে এই পরিকল্পনার আওতায় জীবন বিমার কল্যাণ লাভ করতে পারেন। একটিমাত্র প্রিমিয়াম প্রদান করতে হবে। মেয়াদ পূর্তির আগে বিমা গ্রাহকের মৃত্যু হলে বিমাকৃত টাকার দ্বিগুণ প্রদান করা হবে। একক জীবনের ওপর সর্বোচ্চ বিমার অঙ্ক তিন লাখ টাকা। কোনো ডাক্তারি পরীক্ষা রিপোর্ট এই বিমায় প্রদান করতে হবে না। একক প্রিমিয়ামের জন্য নির্ধারিত প্রস্তাবপত্র ফরম পূরণ করতে হবে। বিমা গ্রহণের তিন বছর পর বিমাগ্রাহক ইচ্ছা করলে নগদ টাকার বিনিময়ে পলিসি সমর্পণ করতে পারবেন।
সাময়িক বিমা: ঋণগ্রহীতার অকাল মৃত্যুতে বন্ধকি সম্পত্তি রক্ষায় বা প্রিয়জনকে ঋণের দায় থেকে মুক্ত রাখতে অল্প প্রিমিয়ামের এ প্রকার সাময়িক বিমার অবদান অসীম। স্থাবর সম্পত্তি গচ্ছিত রেখে ব্যাংক বা অন্য কোনো অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকলে এবং ঋণ গ্রহণের প্রমাণক দাখিল করলেই কেবল এই পরিকল্পনার আওতায় এক বছর মেয়াদের জন্য বিমা পলিসি গ্রহণ করা যায়। তবে বেশি মেয়াদের জন্য পলিসি চালু রাখতে হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে ‘সুস্বাস্থ্যের প্রমাণক’ দাখিল করে এবং প্রয়োজনীয় প্রিমিয়াম জমা দিয়ে পলিসি পরবর্তী বছরের জন্য নবায়ন করা যায়। প্রিমিয়ামের হার তুলনামূলকভাবে খুব কম।
দারিদ্র্য বিমোচনে জীবন বিমা স্কিম: স্বল্প আয়ের মানুষ যাতে স্বল্প সময়ে স্বনির্ভর হতে পারে, সেই লক্ষ্যে জীবন বিমা করপোরেশন প্রবর্তন করেছে এই স্কিম। এই পরিকল্পনার আওতায় ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ বছর মেয়াদের জন্য পলিসি গ্রহণ করা যায়। মেয়াদ শেষে প্রাপ্ত টাকা বিনিয়োগ করে স্বল্প আয়ের মানুষ স্বনির্ভর নিরাপত্তা বিধান করতে পারে। সর্বোচ্চ বিমা অঙ্ক ১০ হাজার টাকা (প্রতি ইউনিট) একজন বিমাগ্রাহক সর্বোচ্চ পাঁচ ইউনিট কিনতে পারবেন। সর্বোচ্চ প্রবেশকালীন বয়স ৪৫ বছর। কোনো ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট এই বিমায় প্রদান করতে হবে না। মেয়াদ শেষে বিমাকৃত অর্থ প্রদান করা হবে এবং বিমাগ্রাহকের অকালমৃত্যু হলে বিমাকৃত টাকার দ্বিগুণ দেয়া হবে।
জেবিসি মাসিক সঞ্চয়ী স্কিম: এই স্কিম চালুর ফলে দেশের আপামর জনগণ মাসিক কিস্তিতে স্বল্প প্রিমিয়াম প্রদানের মাধ্যমে বিমার সুবিধা নিতে পারবে। অন্যদিকে বিমাগ্রহীতার অকালমৃত্যুতে তাদের পরিবার আর্থিক নিরাপত্তা পাবে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়াদপূর্তিতে লাভসহ টাকা পেয়ে ভবিষ্যতে আর্থিক চাহিদা মিটাতে পারবে। এই স্কিমের মেয়াদ সর্বনিম্ন ১২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১৬ বছর পর্যন্ত। মাসিক কিস্তিতে প্রিমিয়াম প্রদান করতে পারবে। সর্বনিম্ন প্রবেশকালীন বয়স ১৮ বছর, সর্বোচ্চ প্রবেশকালীন বয়স ৪৮ বছর। মেয়াদপূর্তিকালীন বয়স ৬০ বছরের বেশি হবে না। নতুন এই স্কিমের জন্য শুধু একটি নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হবে। প্রস্তাবপত্রের সঙ্গে বয়সের প্রমাণক অবশ্যই দাখিল করতে হবে। কোনো ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট এই বিমায় প্রদান করতে হবে না। মেয়াদ শেষে বিমাকৃত অর্থ (লাভসহ) প্রদান করা হয়। বিমাগ্রাহকের অকালমৃত্যু হলে বিমাকৃত অর্থ অর্জিত লাভসহ মনোনীত ব্যক্তিকে দেয়া হবে।
হজ বিমা: এই স্কিমের মেয়াদ শেষে বিমাকৃত অর্থ বোনাসসহ প্রদান করা হয়ে থাকে, যা দ্বারা বিমাগ্রাহক পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালন করা ছাড়াও অন্য যে কোনো প্রয়োজন মেটাতে পারবেন। বিমাগ্রাহকের অকাল মৃত্যু হলে বিমাকৃত অর্থ অর্জিত বোনাসসহ মনোনীত ব্যক্তিকে প্রদান করা হবে। প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তিনি বিমাগ্রহীতার পক্ষে বদলি হজ ও ওমরাহ পালন করতে পারবেন। ১০, ১২, ১৫, ১৬ ও ২০ বছর মেয়াদের মধ্যে যেকোনো মেয়াদে এ বিমা পলিসি গ্রহণ করা যাবে। এই বিমায় সর্বনিম্ন প্রবেশকালীন বয়স ১৮ বছর, সর্বোচ্চ প্রবেশকালীন বয়স ৫৫ বছর। স্কিমের বিমার প্রিমিয়াম ষাণ¥াসিক ও বার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য।
তিন কিস্তি বিমা: বিমা মেয়াদকে তিন ভাগে ভাগ করে প্রতিভাগ মেয়াদ শেষে বিমাকৃত অর্থের ২৫ শতাংশ, ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশও নির্ধারিত বোনাস দেয়া হয়। বিমাকৃত অর্থ মেয়াদকালে তিন কিস্তিতে প্রাপ্তির ব্যবস্থা থাকায় এই বিমা ভবিষ্যতে আর্থিক প্রয়োজন একাধিকবার মেটাতে সক্ষম। প্রথম বা দ্বিতীয় কিস্তির টাকা প্রদান করা সত্ত্বেও বিমার মেয়াদকালে মৃত্যু হলে বিমাকৃত সম্পূর্ণ অর্থ এবং নির্ধারিত সময়ে বোনাস প্রদান করা হয়। এটা এই বিমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। বিশেষ সুবিধাদি হচ্ছে প্রথম কিস্তির প্রাপ্ত (বিমার অঙ্কের ২৫ শতাংশ) অর্থ অন্যত্র বিনিয়োগ করে যে লভ্যাংশ পাবেন, তা নিয়েই বিমা পলিসির প্রিমিয়াম জমা দেয়া সম্ভব। উপরন্তু প্রাপ্ত প্রথম কিস্তির অর্থ মূলধন হিসেবে থেকে যাবে। দ্বিতীয় কিস্তির প্রাপ্ত (বিমা অঙ্কের ২৫ শতাংশ ) সম্পূর্ণ অর্থ একইভাবে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে পারবেন। তৃতীয় কিস্তি (শেষ কিস্তি) হিসেবে বিমাগ্রহীতা পাবেন বিমা অঙ্কের অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ অর্থ নির্ধারিত সময়ের বোনাস। বিমার মেয়াদ চলাকালে জীবনের ওপর মূল বিমার অর্থ-ঝুঁকি হিসেবে থাকবে এবং মেয়াদ শেষে অকল্পনীয় সঞ্চয় হবে, যা আপনার জীবনে আর্থিক নিশ্চয়তা এনে দেবে। এছাড়া দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও অঙ্গহানির অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে বিমাগ্রাহক একটিমাত্র প্রিমিয়াম দেয়ার পরও যদি দুর্ঘটনায় (৯০ দিনের মধ্যে/সঙ্গে সঙ্গে) মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে নমিনী পাবেন বিমাকৃত অর্থের দ্বিগুণ। বিমার মেয়াদকালে দুর্ঘটনায় বিমাগ্রাহকের একটি পা/একটি হাত/একটি চোখ নষ্ট হলে তৎক্ষণাৎ বিমাকৃত অর্থের (৫০ শতাংশ) অর্ধ পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হবে এবং মূল বিমার অর্থ যথারীতি নির্দিষ্ট সময় অন্তে দেয়া হবে। এছাড়া উভয় হাত/ উভয় পা/ উভয় চোখ নষ্ট হলে অথবা এক হাত এবং এক পা নষ্ট হলে তৎক্ষণাৎ বিমাকৃত অর্থের সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করা হবে। ভবিষ্যতে দেয় অবশিষ্ট প্রিমিয়ামসমূহ মওকুফ হয়ে যাবে। বিমার নির্দিষ্ট সময় অন্তে মূল বিমার অর্থ দেয়া হবে।
জীবন বিমার প্রিমিয়ামের ওপর আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়, যেটা আমরা অনেকেই হয়তো জানি না। অর্থাৎ মাসিক কিংবা বাৎসরিক যে প্রিমিয়াম প্রদান করে থাকি, তার ওপর আয়কর রেয়াত সুবিধা রয়েছে। অনেক জীবন বিমা স্কিমের দুই বছর প্রিমিয়াম প্রদানের পর সমর্পণ ও ঋণ গ্রহণ করা যাবে। আমরা কেউই জানি না, ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে। কিছুটা সচেতনতা যদি আমাদের নিজেদের জীবন এবং পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে সেটা অবশ্যই মন্দ নয়। আর কোনো বিমা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে যদি কারও নেতিবাচক ধারণা বা অভিজ্ঞতা থেকে থাকে, তবে ব্যর্থতা নির্দিষ্ট সেই প্রতিষ্ঠানের, জীবন বিমার নয়।
আন্তর্জাতিক আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিমা করা বাধ্যতামূলক। পণ্যের নিরাপত্তার জন্য বিমা করা হয়ে থাকে। যদি জীবনের জন্য বিমা বাধ্যতামূলক করা হতো, তখন আমরা সকলেই নিজেদের জীবনের উপর বিমা করে রাখতাম। যেহেতু বাধ্যতামূলক নয়, সেজন্য অনেক সময় আমরা এটাকে গুরুত্ব দিই না। কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ কিংবা পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে জীবন বিমা করা উচিত। এটা অবশ্যই হিতকর ও অনাকাক্সিক্ষত বিপদ থেকে আমাদের মুক্ত রাখতে সহায়তা করবে।

যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..