Print Date & Time : 9 May 2021 Sunday 1:21 pm

জীবন বিমা কোম্পানির নির্ভরযোগ্য আর্থিক বিবরণী কত দূর?

প্রকাশ: October 16, 2020 সময়- 11:00 pm

মো. নূর-উল-আলম : বিশ্বে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিগুলোয় হিসাব সংরক্ষণ এবং জনগণের সামনে তা প্রকাশ করার বিষয়ে চূড়ান্ত হিসাব বা আর্থিক বিবরণী একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আর্থিক বিবরণীর পাঁচটি অংশ রয়েছেÑচারটি বিবরণী এবং অপরটি নোটস বা টীকা। অথচ বাংলাদেশে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো খণ্ডিতভাবে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করে। অর্থাৎ তারা তা যথাযথভাবে প্রস্তুত করে না; তারা লাভ-লোকসান হিসাব তৈরি করে না! এ প্রবন্ধে ‘বিমা আইন, ১৯৩৮’ ও ‘বিমা আইন, ২০১০’, আইএফআরএস-৪ (বিমা চুক্তি), আইডিআরএ সার্কুলার, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিশ্বের অপরাপর দেশগুলোয় জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুতিবিষয়ক ভাবনা, বাস্তবতা এবং এ বিষয়ে সম্ভাব্য সংস্কার তুলে ধরা হয়েছে।

স্থিতিপত্র তথা ব্যালেন্স শিট, ইনকাম স্টেটমেন্ট তথা আয় বিবরণী বা লাভ-লোকসান হিসাব এবং স্টেটমেন্ট অব চেঞ্জেস অব ওনার্স ইকুইটি তথা সাধারণ শেয়ারে পরিবর্তনের বিবরণী হলো একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির আর্থিক বিবরণীর তিনটি অবিচ্ছদ্য অংশ। এ ছাড়া ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট বা নগদ বিচলন বিবরণী এবং ব্যালেন্স শিটের টীকাগুলোও আর্থিক বিবরণীর অংশ হিসেবে হিসাববিজ্ঞানীদের কাছে সমাদৃত।

চূড়ান্ত হিসাবে আর্থিক বিবরণীকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন লাভ-লোকসান হিসাব তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা হিসাব রক্ষণের মৌলিক বিষয়। একটি হিসাববছরে অর্জিত সব আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য থেকে ওই বছরের নিট মুনাফা বের করা হয়, যার ওপর ভিত্তি করে পরে বণ্টনযোগ্য মুনাফা বের করা হয়। 

অবশ্য প্রায় ২০০ বছর ধরে এদেশের জীবন বিমা কোম্পানিগুলো বার্ষিক লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুত করছে না। ফলে সঠিকভাবে বার্ষিক আয়-ব্যয় নির্ণয় করতে পারছে না। এতে একদিকে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সঠিক মুনাফা বের না হওয়ায় ‘বিনিয়োগকারী’রাও বঞ্চিত হচ্ছে প্রাপ্য ডিভিডেন্ড থেকে। বিমা গ্রাহকরাও বঞ্চিত হচ্ছে তাদের প্রাপ্য মুনাফা থেকে। বিনিয়োগকারীরা লাভ-লোকসান হিসাবের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন। ফলে সঠিক লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুতির অভাবে তাদের অধিকার ব্যাপকভাবে খর্ব হচ্ছে।

‘কোম্পানি আইন, ১৯৯৪’, ‘বিমা আইন, ২০১০’ ও ‘সিকিরিটিজ এক্সচেঞ্জ রুল, ১৯৮৭’-এ পরিষ্কারভাবে সব পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির জন্য লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুতের নির্দেশনা রয়েছে। আর্থিক বিবরণী বিষয়ে বিশ্বজনীন নিয়মগুলোও বেশ সুস্পষ্ট। আন্তর্জাতিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশন মান-৪-এ জীবন বিমা, সাধারণ বিমাসহ সব ধরনের পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির আয় বিবরণী প্রস্তুতির বিষয়ে সুস্পষ্ট মান বজায় রাখতে বলা হয়েছে। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত, নেপালসহ আমাদের সব পার্শ্ববর্তী দেশের বিমা কোম্পানিগুলো লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুত করে। পিছিয়ে নেই বিমা জগতে নবীনতম দেশ মিয়ানমারও।

বিমা কোম্পানির আর্থিক বিবরণী অন্যান্য পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। বড় ভিন্নতা হলো এক্ষেত্রে রাজস্ব হিসাব নামে বাড়তি একটি হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করতে হয়। দেশের সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় স্থিতিপত্র ছাড়াও তারা যেসব হিসাব প্রস্তুত করে তা হলোÑক. লাভ-লোকসান হিসাব; খ. মিলিত রাজস্ব হিসাব এবং প্রোডাক্ট অনুযায়ী আলাদা আলাদ রাজস্ব হিসাব; গ. নগদ বিচলন বিবরণী; ঘ. সাধারণ শেয়ারে পরিবর্তনের বিবরণী এবং ঙ. টীকাসমূহ। অর্থাৎ দেশের সাধারণ বিমা কোম্পানির আর্থিক বিবরণীর অংশ ছয়টি। কিন্তু জীবন বিমা কোম্পানিগুলো লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুত করে না!

এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, তাহলে আমাদের জীবন বিমা কোম্পানিগুলো যা প্রস্তুত করে, তা আসলে কী? মূলত আমাদের জীবন বিমা কোম্পানিগুলো রেভেনিউ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি সলভেন্সি সারপ্লাস নির্ণয় করে থাকে। এ সারপ্লাস নির্ণয় করা হয় লাইফ ফান্ড থেকে অনুমাননির্ভর বিমা দায় বাদ দিয়ে। অর্থাৎ বছর শেষে পুঞ্জীভূত লাইফ ফান্ড থেকে সারা বছরের আনুমানিক বিমা দায় বিয়োগ করে সারপ্লাস নির্ণয় করে তা রেভেনিউ অ্যাকাউন্টে দেখানো হচ্ছে, কোনো প্রকার লাভ বা লোকসান হিসাব প্রস্তুত করছে না। এত বড় অনিয়মের মূলে রয়েছে ব্রিটিশ ভারতের ‘বিমা আইন, ১৯৩৮’-এর ধারা ১৩, যা বাংলাদেশে ‘বিমা আইন, ২০১০’-এর ধারা ৩০ এ হুবহু প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ সারপ্লাস কখনোই বাষিক পারফরম্যান্স বা লাভ নয়! বরং এ সারপ্লাস হলো একচুয়ারি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্ণীত অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অর্জনের সম্মিলিত একটি রূপ, যা কোনো কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সচ্ছলতা-বিষয়ক একটি তথ্যমাত্র। লাভ কখনোই অনুমাননির্ভর হতে পারে না। এজন্যই চলতি বছরে সংগঠিত পারফর্ম্যান্সই হলো বিশ্বজুড়ে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর আয় নির্ণয়ের ভিত্তি। ফলে সেটিই করপোরেট টেক্স নির্ণয়েরও ভিত্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত ধারণা। সারপ্লাসকে লাভ হিসেবে দেখানো তাই বাতিল ধারণা ছাড়া কিছুই নয়।

‘বিমা আইন, ২০১০’-এর ধারা ২৭-এ সুস্পষ্টভাবে সব বিমা কোম্পানিকে লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুতের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলো বিষয়টি মেনে চললেও মানছে না জীবন বিমা কোম্পানিগুলো। এ বিষয়ে জানতে প্রতিবেশী দেশগুলোর জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসন্ধানে লাভ-লোকসান হিসাবের পাশাপাশি রাজস্ব হিসাব তৈরি করার প্রমাণ পাওয়া যায়। এইচএনএস ইন্স্যুরেন্সসহ শ্রীলঙ্কার বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তারা আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে সব আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখছে। অর্থাৎ লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুত করছে। কোম্পানিগুলো বার্ষিক প্রতিবেদনে একচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন-বিষয়ক একচুয়ারি কর্তৃক স্বাক্ষরিত সার্টিফিকেশন প্রদর্শিত হয়েছে। রয়েছে ক্লেইম রিজার্ভ-বিষয়ক পৃথক একচুয়ারি কর্তৃক স্বাক্ষরিত সার্টিফিকেশন। অথচ বাংলাদেশে একচুয়ারিরা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশে এ ধরনের কোনো প্রত্যয়নপত্র দিচ্ছেন না। এতে ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ শেয়ার মালিক, গ্রাহক ও অপরাপর অংশীজনদের স্বার্থ। সরকারও বঞ্চিত হচ্ছে যথাযথ রাজস্ব থেকে। আমাদের জীবন বিমা কোম্পানিগুলো দাবি করে ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪-এর চতুর্থ শিডিউলে বর্ণিত সারপ্লাসের (যা কোনোভাবেই প্রফিট নয়, ভিত্তিতে তারা মুনাফা নির্ণয় করে এবং তদনুযায়ী ট্যাক্স প্রদান করে। বরং তা হলো তারা যা বলে তা পরিষ্কারভাবে ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪-এর অর্থকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার। ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪ এ বিষয়ে আসলে কী বলেছে? ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪ শুধু বলেছে জীবন বিমা কোম্পানির সারপ্লাস নির্ণয় করতে হবে বিমা আইন, ২০১০-এ বর্ণিত একচুয়ারিয়াল ভেলুয়েশনের ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে উল্ল্যেখ্য, একচুয়ারিয়াল ভেলুয়েশনের ভিত্তিতে নির্ণীত বিমা দায় আমাদের আলোচ্য লাভ-লোকসান হিসাবের অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ! অধিকন্তু সারা বিশ্বের সব দেশে একচুয়ারিয়াল ভেলুয়েশনের ভিত্তিতে নির্ণীত ওই বিমা দায়কে লাভ-লোকসান হিসাবে দেখানো হয়। ব্যতিক্রম নয় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও।

তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, আমাদের দেশে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো কেন লাভ-লোকসান হিসাব করছে না, কেন তারা শুধু রেভেনিউ হিসাব তৈরি করে তাদের দায় সারছে? এর মূলে রয়েছে ২০১২ সালের ১১ জুনে ইস্যুকৃত আইডিআরএ সার্কুলার লাইফ-৪/২০১২: হিসাব এবং আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতি-বিষয়ক নির্দেশনা, যেখানে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর জন্য কোনো লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুতির বিধান রাখা হয়নি। এ বিষয়ে ওই সার্কুলারে প্রদত্ত বিমা আইন, ২০১০-এর ১৬০ ধারার যে উদ্ধৃতি দিয়েছে, তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ওই সার্কুলারে বিমা আইনের ১৬০(২) ধারার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যেহেতু অদ্যাবধি বিমা আইন, ২০১০-এর কোনো রুলস বা বিধিমালা জারি হয়নি, তাই নতুন আইনের ব্যাখ্যায় ১৯৩৮ সালের বিমা আইনের বিধিগুলো (বিমা বিধিমালা, ১৯৫৮) বহাল থাকবে। দুটি আলাদা আইন যেটি একটি অপরটিকে রিফিল করেছে, সেক্ষেত্রে প্রতিস্থাপিত আইনের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা কি কখনও বাতিলকৃত আইনের রুল দিয়ে দেওয়া সম্ভব? বিষয়টি আইন বিশেষজ্ঞদের আলোচনার ভালো একটি বিষয় হতে পারে। আইনের ছাত্র হিসেবে আমার বরং মনে হয় বিষয়টি এরূপ হওয়ার কথাÑযেসব বিষয়ে ‘বিমা আইন, ১৯৩৮’-এর অনুরূপ ‘বিমা আইন, ২০১০’, সেসব ক্ষেত্রে আইনের ব্যাখ্যায় ‘বিমা বিধিমালা, ১৯৫৮’ প্রযোজ্য হবে।

বাংলাদেশের জাতীয় বিমা নীতিতে বলা হয়েছে, আমাদের বিমা নীতি হবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিমা নীতিগুলোর অনুরূপ। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা বিমা-সংক্রান্ত তাদের মূল বিধি-বিধান পেয়েছে ব্রিটেন থেকে। এসব দেশের জীবন বিমা কোম্পানিগুলো লাভ-ক্ষতি হিসাব প্রস্তুত করছে। একমাত্র ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ!

আগেই বলেছি সারপ্লাস কোনো ক্রমেই লাভ নয়, বরং লাভ নির্ণয়ের অনুঘটক মাত্র। বাংলাদেশের জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর প্রদর্শিত লাভের হার বিশ্ব গড়ের অর্ধেক। ফলে আমাদের জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর করের হার বিশ্ব গড়ের প্রায় দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও কোম্পানিগুলোর প্রদর্শিত স্বল্প রাজস্বের বিপরীতে কোম্পানিগুলোর প্রদত্ত করের পরিমাণ বিশ্বের অপরাপর দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। এতে একদিকে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সঠিক মুনাফা বের না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরাও বঞ্চিত হচ্ছে প্রাপ্য ডিভিডেন্ড থেকে। উপরন্তু সব বিমা গ্রাহকও বঞ্চিত হচ্ছে প্রাপ্য মুনাফা থেকে।

সহযোগী সদস্য, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি)