প্রচ্ছদ শেষ পাতা

আট বছরে বাড়তি ব্যবস্থাপনা ব্যয় আড়াই হাজার কোটি টাকা

জীবন বিমা খাত

পলাশ শরিফ:দেশে ব্যবসারত ৩২টি জীবন বিমা কোম্পানির সিংহভাগই ব্যবস্থাপনা ব্যয়কে নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে পারছে না। এ নিয়ে বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনায় বাড়তি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। ২০১৪ সালে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপের পর ব্যয়ের হার কমলেও গত আট বছরে এ খাতের বাড়তি ব্যয় দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইন সংশোধনের কথা বলছেন কোম্পানির প্রতিনিধিরা। অন্যদিকে ব্যয়ের লাগাম ধরার তাগিদ দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালে দেশে ব্যবসারত ৩২টি জীবন বিমা কোম্পানি সম্মিলিতভাবে প্রায় পাঁচ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করেছে। প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে বিদ্যমান আইনি নির্দেশনা মেনে ব্যবস্থাপনা খাতে কোম্পানিগুলোর দুই হাজার ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয় করার কথা ছিল। কিন্তু ওই বছরে কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় ছিল দুই হাজার ৪২০ কোটি টাকা, যা নির্দেশিত সীমার চেয়ে প্রায় ২৬৭ কোটি টাকা বেশি। ওই বছরে আগের বছরের তুলনায় প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। এর বিপরীতে বাড়তি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ২২ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চার বছরে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০১১ সালে প্রিমিয়াম আয় ছিল দুই হাজার ৫২২ কোটি টাকা, ওই বছরে ব্যবস্থাপনা খাতে প্রায় ৩৯৭ কোটি টাকা বেশি ব্যয় করেছে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো। একইভাবে নিয়ম ভেঙে ২০১২ সালে ৩৬১ কোটি টাকা, ২০১৩ সালে ৪৪৫ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে ৩৪৮ কোটি টাকা, ২০১৫ সালে ২৭৯ কোটি টাকা, ২০১৬ সালে ২০২ কোটি টাকা ও ২০১৭ সালে ১০৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে কোম্পানিগুলো। দায়িত্বশীল হিসেবে ‘সহনীয় মাত্রা’য় নামলেও বাড়তি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের ধারা ২০১৮ সালেও অব্যাহত ছিল।

সময়ের সঙ্গে নির্দেশনা হালনাগাদ না করায় ব্যবস্থাপনা ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখা যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করে আইন সংশোধনের দাবি জানাচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের আইনি নির্দেশনা অনেক পুরোনো। কয়েক দশকে ব্যবস্থাপনা ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ব্যবসার পরিধি বাড়ানো ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্যই ব্যয় করতে হচ্ছে। ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ে ঢালাওভাবে কিছু বলার সুযোগ নেই। এতে জীবন বিমার প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এর আগে দুদকের হস্তক্ষেপের কারণেও বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছিল। এসব কারণে নতুন বিধিমালা করা হচ্ছে, এতে ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ে চলমান জটিলতা কাটবে।’

মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আগে জীবন বিমা খাত অনেক বিশৃঙ্খল ছিল। নীতিমালা না থাকায় অনিয়ম-অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল। এর মধ্য দিয়েই বিমা খাতের পরিসর বেড়েছে। এখন আইন-কানুন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির কারণে নীতিমালা হচ্ছে, শৃঙ্খলাও ফিরছে। তাই ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ে যেসব বিতর্ক অতীতে ছিল, সেগুলো সামনে আর থাকবে না। আইডিআরএ-বিআইএ যৌথভাবে কাজ করলে জীবন বিমায় স্বচ্ছতা ফিরবে।’

তথ্যমতে, ওই সময়ের মধ্যে সীমা অতিক্রম করে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে ২০১৩ সালে। ওই বছরে প্রায় ৪৪৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে। বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) গঠন ও সংস্থাটির কড়াকড়ির মধ্যেই টানা চার বছর ধরে জীবন বিমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধির প্রশ্ন ওঠে। সতর্ক-জরিমানার পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাড়তি ব্যয়ের লাগাম ধরতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয় হয়ে দুদক পর্যন্ত গড়ায়। কড়াকড়ির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থাপনায় বাড়তি ব্যয় কমতে শুরু করলেও কোম্পানিগুলোর ওই ব্যয় আরও কমাতে চায় আইডিআরএ।

আইডিআরএ’র দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ‘জীবন বিমার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রয়েছে। এজন্য জটিলতা এড়াতে একটি সময়োপযোগী বিধিমালা করা হচ্ছে। কয়েক দফায় সংশোধনের পর এরই মধ্যে জীবন বিমার ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের খসড়া বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ব্যবস্থাপনায় বাড়তি ব্যয় করলে, ব্যয়ের নামে অর্থ সরিয়ে নেয়া হলে, কিংবা কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে।’

সর্বশেষ..