দিনের খবর প্রচ্ছদ

জুয়েলারি শিল্পীদের অনিশ্চিত জীবন

নেই সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: এক কামরার ছোট্ট একটি ঘরে বিধবা মা, দুই ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে চল্লিশোর্ধ্ব বিধান ধরের বসবাস। তিনি জুয়েলারি শিল্পীর কাজ ছেড়ে সাতকানিয়ার নলুয়া গ্রামে দিনমজুরি করে সংসার চালান। ঘরে নেই কোনো আসবাব। অন্যত্র জায়গা না থাকায় গৃহপালিত ছাগলটিরও স্থান হয়েছে ওই ঘরে। অথচ এই বিধান ধর এক বছর আগেও চট্টগ্রামের হাজারী গলির শ্রেষ্ঠ জুয়েলারি শিল্পীদের একজন ছিলেন। জীবনের ২৫ বছরের অধিক সময় কাটিয়েছেন ওই গলিতে। তার করা কারুকাজেরও বেশ সুনাম ছিল সেখানে। কিন্তু একটা সময় ভালো উপার্জন করলেও সময়ের সঙ্গে টিকে থাকতে পারেননি বিধান। 

বর্তমানে আগের মতো কাজ নেই। শ্রমের সঙ্গে মজুরির সম্মিলন নেই। ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ভারসাম্য নেই। তাই বাধ্য হয়ে কয়েক পুরুষের আদি পেশা ছাড়তে হচ্ছে বিধানের মতো অনেকেরই। একই অবস্থা মোহাম্মদ হারুনেরও। তিনিও স্বর্ণশিল্পের কারিগর ছিলেন। কভিড-১৯-সহ নানা কারণে কাজ হারিয়ে ঠাঁই নিয়েছেন মানিকগঞ্জের নিজ ভিটায়।

বাণিজ্যিক রাজধানীর স্বর্ণের হাট খ্যাত চট্টগ্রামের হাজারী গলি। এখানে প্রায় আড়াই হাজার কারিগরি দোকানে পাঁচ থেকে ছয় হাজার স্বর্ণশিল্পী নিয়মিত কাজ করেন। তাদের সহযোগী হিসেবে আরও ১০ থেকে ১২ হাজার শ্রমিক এই কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। পুরো শহরের আট থেকে ১০ হাজার জুয়েলার্স শোরুমের সিংহভাগ স্বর্ণের জোগানও দেওয়া হয় এখান থেকে। কিন্তু যে আঁতুড়ঘর থেকে বাহারি ডিজাইনের স্বর্ণের জোগান দেওয়া হয়, সেসব স্বর্ণশিল্পীর কর্মজীবন আজ পেন্ডুলামের মতো দুলছে!

এখানে শুধু অনিশ্চিত জীবন নয়, জুয়েলারি শ্রমিকের কাজে রয়েছে নানা ঝুঁকি। দিনের পর দিন লাগাতার কাজ করেও পাওয়া যায় না ন্যায্য মজুরি। দেখারও কেউ নেই। কারণ এই শ্রমিকদের মধ্যে শিক্ষার হার খুবই কম। প্রাথমিক স্তরের গণ্ডি পেরিয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন। ফলে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগ মিলেও জুয়েলারি শ্রমিকরা করতে পারেননি কোনো ট্রেড ইউনিয়ন।

১৯৯৬ সালে কে.সি. দি রোড ঠিকানায় নামমাত্র একটি ট্রেড ইউনিয়ন হলেও বছরান্তে বন্ধ হয়ে যায়। জানা যায়, দেশের অন্যান্য স্থানেও একই অবস্থা। তাই দেশে কী পরিমাণ জুয়েলারি শ্রমিক রয়েছেন, তারও সঠিক পরিসংখ্যান মেলেনি। আর সরকার ৪২টি শিল্পের নি¤œতম মজুরি নির্ধারণ করলেও সেখানে জুয়েলারি শিল্প নেই। ফলে ন্যায্য মজুরি থেকে বরাবরেই পিছিয়ে রয়েছে অভিজাত মহলে নিপুণ কাজের গহনার জোগানদাতা ওই মানুষগুলো।

চট্টগ্রাম জেলা পরিসংখ্যান অফিসের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওয়াহিদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাছে জুয়েলারি শ্রমিকদের কোনো ডেটা বেইজ নেই। তাই চট্টগ্রামসহ সারা দেশে কী পরিমাণ জুয়েলারি শ্রমিক রয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।’

এদিকে জুয়েলারি শিল্প খাতে যারা কাজ করেন, তাদের জীবনে স্বল্পমেয়াদি সাফল্য থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি দুর্গতিতে পড়তে হয়। কারণ এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫০-৬০ শতাংশই শিশুশ্রমিক। প্রতিটি কারিগরের সঙ্গে কমপক্ষে দু-তিনজন শিশুশ্রমিক সহকারী হিসেবে কাজ করে, যাদের বেশিরভাগের বয়সই ৯ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। এ শিল্পে একটা কথা আছেÑযত কম বয়সে কাজ শুরু করবে, তত দক্ষ কারিগর হবে। আর সরকার প্রতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম নিরুৎসাহিত করলেও জামদানি, তাঁত, কাঠ, মৃৎ ও স্বর্ণশিল্পের ক্ষেত্রে শিশুদের অংশগ্রহণকে প্রশিক্ষণ হিসেবে গণ্য করছে। তাতে এই খাতের শ্রমিকরা প্রাথমিক শিক্ষাও গ্রহণ করতে পারে না। ফলে কোনো এক সময় পেশা পরিবর্তন করতে চাইলেও ভালো কোথাও সুযোগ মেলে না।

এ বিষয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল সাকিব মুবাররাত বলেন, ‘চট্টগ্রামের হাজারী গলি, টেরিবাজার, ঢাকার আজিমপুর, মিরপুরের বেনারসি পল্লিসহ একাধিক স্থানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রচুর শিশুশ্রমিক কাজ করে। বিশেষ করে স্বর্ণশিল্পে খুব কম বয়স থেকে শিশুরা কাজ শুরু করে। তাদের পরিবারই এ কাজ করতে বাধ্য করে। অতীতে এসব এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, কিন্তু শিশুশ্রমের বিষয়গুলো তারা স্বীকার করেন না। জানতে চাইলে কেউ নিজের ছেলে আবার কেউ ছোট ভাই পরিচয় দিয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ শেখানোর কথা জানান।’

এদিকে কাজ শুরুর প্রথম পাঁচ বছর কোনো বেতন পায় না শিশুশ্রমিকরা। কারিগর হয়ে ওঠা অবধি পেটে-ভাতেই চলে তাদের কর্ম। তারপর সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছরে কারিগর হয়ে ওঠার পর মজুরি পেলেও কর্মঘণ্টার সঙ্গে তুলনা করলে ন্যায্য মজুরি হয় না। যেমন এক ভরি হালমার্ক কাজ করতে একজন শ্রমিকের টানা চার থেকে পাঁচ দিন কাজ করতে হয়। বিনিময়ে মজুরি পান সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আর এই কাজ করতে ওই শ্রমিকের এক আনা দুই রত্তি স্বর্ণ অপচয় হয়, যার মূল্য বর্তমানে চার হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ পাঁচ দিন টাকা কাজ করে একজন শ্রমিক মজুরি পান এক হাজার টাকা।

এ বিষয়ে জুয়েলারি শ্রমিক তাপস দাশ বলেন, ‘পাঁচ দিন কাজ করে এক হাজার টাকা আয় করলে ঘণ্টায় মজুরি পড়ে ২৫ টাকা। হিসাবটা কিন্তু এমন নয়! কারণ স্বর্ণ শ্রমিকরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কাজ করে না। আমাদের কাজ করতে হয় লাগাতার। অর্থাৎ সকাল ১১টায় কাজ শুরু করলে রাত ১১টা থেকে ভোর ৪টা থেকে ৫টা অবধি কাজ করতে হয় মধ্যখানে প্রয়োজনীয় সামান্য বিরতি ছাড়া। ফলে শোভন কর্মঘণ্টা কী আমরা জানি না! তাই মজুরির হিসাবটিও সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে অবশিষ্ট কিছুই থাকে না!’

আবার এ শিল্পের কাজে রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। স্বর্ণ গলাতে গ্যাসের প্রয়োজন হয়। পরিষ্কার করতে সারফার। তারপর ওই স্বর্ণকে খাঁটি করতে নাইট্রিক এসিডের ব্যবহার রয়েছে। এছাড়া ছাই থেকে স্বর্ণ আলাদা করতে পারদ ও সিসা গলানো হয়।

চট্টগ্রাম স্বর্ণশিল্পী সমিতির সভাপতি শুবল ধর ও সাধারণ সম্পাদক রিপন তালুকদার জানান, ‘জুয়েলারি শিল্পীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। হাজারী গলিতে ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে স্বর্ণের কাজ করতে গিয়ে মারাত্মকভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে জনি ধর, তুলসী সেনসহ ছয়জন নিহত হন। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন, যারা কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে নানা সংকটে দিন যাপন করছেন ওই শ্রমিকরা।’

জুয়েলারি শ্রমিকদের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সীমান্ত ওয়াদেদ্দার বলেন, ‘জুয়েলারি শ্রমিকদের কাজের ধরনের জন্য নানা রকম সমস্যা হতে পারে। তারা দীর্ঘ সময় মেঝেতে বসে কাজ করার ফলে কোমর ও হাঁটুতে দীর্ঘমেয়াদি নানা সমস্যা হতে পারে। কল্যাপ্স করতে পারে কোমরের ডিস্ক। এছাড়া সালফার ও নাইট্রিক এসিডের মতো কেমিক্যাল ব্যবহারে কোনো দুর্ঘটনা হলে চোখসহ শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..