প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জুলাই মাসে ব্যাংকঋণ কমেছে সরকারের

রোহান রাজিব: ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ কমেছে। নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে সরকারের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ কমেছে এক হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এ সময়ে সরকার যে পরিমাণে ঋণ নিয়েছে তার চেয়ে বেশি পরিমাণে শোধ করেছে।

বিদায়ী অর্থবছরের জুন শেষে সরকারের ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৭০ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে প্রথম মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৬৮ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

বিদায়ী অর্থবছরের ১১ মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার যে ঋণ নিয়েছে, শেষ মাস জুনেই নিয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ অর্থ। বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ঋণ ছিল ২৬ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। আর জুনে ঋণ নেয়া হয় ৪৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, সরকার ঘাটতি বাজেট মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। ঋণের অধিকাংশই বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে ব্যয় হয়। নতুন অর্থবছর মাত্র এক মাস অতিবাহিত হলো। এখনও উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ভালোভাবে শুরু হয়নি, তাই সরকারের ঋণের পরিমাণ কম।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের সরকার ঘাটতি বাজেট মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় বাজেটে। তবে অর্থবছরের প্রথম মাসে ঋণ নেয়ার তুলনায় পরিশোধ বেশি করেছে। জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৫৩০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। সরকার এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিবর্তে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। তবে আগের নেয়া ঋণের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কাছে পরিশোধ করেছে দুই হাজার ২৩৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা জানান, নতুন অর্থবছরের শুরুতে আগের নেয়া ঋণ পরিশোধ বাড়িয়েছে সরকার। এছাড়া এখনও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য ঋণ নেয়া শুরু করেনি, তাই নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসে সরকারের ঋণের পরিমাণ কম। তবে উন্নয়ন ব্যয় বাড়লে ঋণের পরিমাণও বাড়বে।

বিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকঋণ নিয়েছে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এর আগের ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয় ২৬ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা, যার অন্যতম কারণ রাজস্ব আহরণ ও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কম।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, সরকার এখন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সরকার যদি এখন ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়ে বিভিন্ন প্রজেক্টে ব্যয় করে, তাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। তাই সরকার এখন চিন্তা করছে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে যতটুকু কম ঋণ নেয় যায়। কারণ সরকারের ট্যাক্স রেভিনিউ এখন কম। তাই ব্যাংকের ওপর এখন চাপ দিতে চাচ্ছে না। আর বাংলাদেশ ব্যাংকও চাচ্ছে মুদ্রা সরবরাহ কমুক, তাই কমিয়ে দিয়েছে। এটা ভালো করেছে। সরকার এখন যত ঋণ কম নেবে ততই ভালো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, নতুন অর্থবছরের জুলাই শেষে সরকার নন-ব্যাংকিং খাত থেকে ট্রেজারি বিল বন্ডের মাধ্যম ৯ দশমিক ২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

এদিকে বিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরের সরকারের সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণের পরিমাণ কমেছে ১৯ হাজার ৯১৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা বাজেট ঘাটতি মেটাতে এ খাতের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৬২ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকার নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ হাজার কোটি টাকা।

বিদায়ী অর্থবছরের (জুলাই-জুন) জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোয় এক লাখ আট হাজার ৭০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে ঋণ নিয়েছে সরকার। তবে আগের ঋণ ও মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে ৮৮ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।

এ সময়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের ৪০ হাজার দুই কোটি ৬৯ লাখ টাকা মুনাফা বা সুদ পরিশোধ করা হয়েছে। এ অর্থ জনগণের করের টাকা। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

যদিও ২০২২-২৩ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রথমত, বেসরকারি খাতে ঋণে প্রবৃদ্ধি কমিয়ে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ করা হয়, যা আগে ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধারের সুদ বা রেপো হার পাঁচ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে পাঁচ শতাংশ করা হয়েছে।