মত-বিশ্লেষণ

জেগেছে যুব গড়বে দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ

জাহাঙ্গীর হাফিজ: মুজিব জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে আজ (১ নভেম্বর) স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুবদিবস, ২০২০’ শিরোনামে এবারের জাতীয় যুব দিবস উদ্যাপিত হবে। জাতীয় উন্নয়নে যুব সমাজের অপরিহার্য সম্পৃক্ততার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব দিবস, ২০২০-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মুজিববর্ষের আহ্বান, যুব কর্মসংস্থান’।

একটি দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিতে তরুণ ও যুবসমাজের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষা যেমন জাতির মেরুদণ্ড তেমনি তরুণরা একটি দেশের মেরুদণ্ড। তারাই দেশের উন্নয়নে অবদান রাখে এবং দেশকে প্রত্যাশিত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে। সে বিবেচনায় বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি। কারণ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রকাশিত মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৫টি দেশ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বাংলাদেশকে তরুণদের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই আমাদের সামনে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে তারুণ্যের উদ্যমকে কাজে লাগানোর।

উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে তরুণ জনগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে। বাংলাদেশের সামনেও সোনালি ভবিষ্যৎ হাতছানি দিচ্ছে। বর্তমান সরকার ঘোষিত ‘ভিশন-২০২১’ ও ‘ভিশন-২০৪১’ এবং জাতিসংঘ ঘোষিত ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ বা ‘টেকসই উন্নয়ন’ বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ ও যুবসমাজ।

একটি দেশে যুবকরাই সর্বোচ্চ কর্মঠ ও শক্তিশালী মেধাশক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাখে। তাই যুবকদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের কর্তব্য ও দায়িত্ব। বর্তমান যুগ ডিজিটাল যুগ এবং বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে এক অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছেন এবং তার ফলেই বাংলাদেশ আজ প্রবেশ করেছে ইন্টারনেটসহ নানা রকম ডিজিটাল প্রযুক্তিতে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এগিয়ে গেছে অনেক দূর। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছে এদেশের যুবকরা। অনেকেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা কাজের ক্ষেত্র গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে সম্ভাবনার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা যেমন নিজেদের দক্ষ করে তুলছে, তেমনি উপার্জনের ব্যবস্থা করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। যুবসমাজের এ দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কর্মের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। কাজেই আমরা বলতেই পারি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান সরকার বিশ্ব করোনা মহামারিতে তরুণ ও যুবসমাজকে নিয়ে বিশেষ কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জরুরি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। সারা বিশ্বই করোনা মহামারিতে যুবক ও তরুণ সমাজের কর্মসংস্থাপনের বিষয়টি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এ লক্ষ্যে দেশের যুবসমাজকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রাণালয় নিরলস কাজ করে চলেছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, করোনার কারণে আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যুবকরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে এবং কর্মহীন হয়ে না পড়ে সেজন্য সরকার যুবকদের জন্য গ্রামে অত্মকর্মসংস্থান নামক বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাত লাখ যুবক প্রশিক্ষণ ও যুব ঋণ সুবিধা পাবে। ২০২০ সালটি বাংলাদেশের যুবক ও তরুণদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জš§শতবর্ষ উদ্যাপন করছি। একই সঙ্গে এ বছর সারা বিশ্বেও যুবক-তরুণদের অংশগ্রহণে ঢাকা ওআইসি ইয়ুথ ক্যাপিটাল ২০২০-এর নানা বর্ণাঢ্য কর্মসূচি উদ্যাপন করা হবে।

বাংলাদেশের যুবকদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অত্যাবশ্যক। যুবকরাই পারে সমাজের আমূল পরিবর্তন আনতে। দেশের যে কোনো পরিস্থিতিতে যুবকরাই এগিয়ে আসে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে এদেশের আপামর জনগণসহ যুবকরাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কাজেই যুবকদের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশে যুবকদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে।

বর্তমান যুবসমাজ হতাশাগ্রস্ত হয়ে নানা রকম অসামাজিক কাজ ও অবক্ষয়ের সঙ্গে লিপ্ত হচ্ছে, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সমাজে এই শ্রেণির যুবকের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। তারা মাদকাসক্ত হচ্ছে এবং নানা রকম অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব করোনা মহামারিতে তাদের কর্মসংস্থান সংকটসহ সামাজিক অস্থিরতার কারণে তুলনামূলকভাবে তারা বিভ্রান্ত্র হচ্ছে, তাই যুবকদের মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন রকম নেশা, ছিনতাই, চুরি, রাহাজানি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে আনা অতি জরুরি। যুবকদের সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। সারা বিশ্বেই যুবকদের জন্য বিনোদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। তেমনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। আমাদের দেশের যুবকদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া অতি জরুরি। বিভিন্ন মোটিভেশনাল প্রোগ্রামের মাধ্যমে যুবকদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। দেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে যুব ও তরুণসমাজকে অবহিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শহরাঞ্চলে আপাতদৃষ্টিতে কোনো মাঠ নেই বললেই চলে। ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে উš§ুক্ত মাঠের স্বল্পতা যুবসমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে প্রতিনিয়ত। সেই লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন এবং সেইসঙ্গে সরকার অনেক দখলকৃত জমি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, যুবক ও তরুণদের জন্য যুগোপযোগী বিনোদনের ব্যবস্থা না হওয়ার কোনো কারণ নেই।

বর্তমান বিশ্বে সৃজনশীলতার গুরুত্ব অপরিসীম। সেই লক্ষ্যে আমাদের দেশের যুবকদের সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত করতে পারলে যুবক ও তরুণসমাজ সঠিক পথে পরিচালিত হবে। বর্তমান বিশ্ব বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি আর্থসামাজিক ও প্রযুক্তিগত কাজে সারা বিশ্বে বিজ্ঞান এগিয়ে চলেছে দুর্নিবার গতিতে। কাজেই যুবকদের বিজ্ঞানমনস্ক করতে হলে তাদের সেই সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রকেই।

বর্তমান সরকারের বদৌলোতে বাংলার গ্রামগঞ্জে প্রায় প্রতিটি মানুষের হাতে আজ ইন্টারনেট সংযুক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ইন্টারনেট সুবিধা ভোগ করছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আগের তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল। কিন্তু এর কিছু অপব্যবহার লক্ষণীয়, যা একটি বিশেষ ক্ষতিকারক দিক। তবে আশার বাণী হলো, বর্তমান সরকার এরই মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সামনে আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, যার মধ্যে যুবকদের কর্মসংস্থানের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এসডিজি-১৬-তে টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থা, সবার ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এবং সব স্তরে কার্যকর জবাদিহিতাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীকার করা হয়েছে এবং তারুণ্যের বিকাশ ত্বরান্বিত হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট পরিমাণ পদক্ষেপ নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে গুরত্বারোপ করা হয়।

সরকার ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুবদিবস, ২০২০’ যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্যাপনের জন্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরাধীন সাতটি বিভাগ পর্যায়ের জেলা কার্যালয়ে (ঢাকা জেলা ব্যতীত) এক লাখ ৬১ হাজার টাকা ৫৬টি জেলা কার্যালয়ে ছয় লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং ৪২৮টি উপজেলা কার্যালয়ে ৩২ লাখ ১০ হাজার টাকা (সদর/ইউনিট থানা ব্যতীত) বাজেট বরাদ্দ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত যুবসমাজের কোনো বিকল্প নেই। ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির মাধ্যমে অস্থায়ী কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জাতিগঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে জেলায় জেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে যুবক ও তরুণদের মেধা, দক্ষতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে আশা করা যায়, দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যুবসমাজ তাদের প্রতিভা ও সর্বোচ্চ যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ  মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে অবদান রাখবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার যুবক ও তরুণদের জন্য এক সম্ভাবনার দ্বার উš§ুক্ত করেছে, যা বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে বিশ্বদরবারে সম্মানজনক অবস্থানে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..