বাণিজ্য সংবাদ

জ্বালানির দাম বাড়ালে শিল্পোৎপাদন ব্যয় বাড়বে

নিজস্ব প্রতিবেদক: পেট্রোবাংলাসহ বিভিন্ন গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির যে প্রস্তাব দিয়েছে তা কার্যকর হলে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বলে জানিয়েছেন তারা।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ: শিল্প খাতে এর প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনারে ব্যবসায়ীরা এ কথা বলেন। ঢাকা চেম্বারে গতকাল অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ওসামা তাসীর বলেন, চলতি বছরের মার্চ মাসে পেট্রোবাংলা এবং অন্যান্য গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ গ্যাসের ক্ষেত্রে গড়ে ১০২ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবনা করে। এর মধ্যে শিল্প খাতে ১৩২ শতাংশ, ক্যাপটিভ পাওয়ারের জন্য ৯৬ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ২০৮ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবনা করা হয়। তিনি বলেন, শিল্প উৎপাদন অব্যাহত রাখতে অধিকতর চাপ সম্পন্ন গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রস্তাবিত মূল্য বৃদ্ধির হার কার্যকর হলে, শিল্প খাতের উৎপাদন খরচ বাড়বে, বিশেষ করে সার, বস্ত্র, ডেনিম, তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, স্টিল প্রভৃতি খাতসমূহের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেনÑভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার এবং কম্বোডিয়া প্রভৃতি প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে, আমাদের অবশ্যই স্বল্পমূল্যে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে ডিসিসিআই সভাপতি এলএনজির মূল্য নির্ধারণের ওপর গবেষণা পরিচালনা, আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানো, সিস্টেম লস কমানো এবং ৩-৫ বছরমেয়াদি গ্যাস মূল্য নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়ে জোরারোপ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নসরুল হামিদ বলেন, বর্তমান সরকার ২০০৯ সাল থেকেই গ্যাস ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং এ জন্য গ্যাস ব্যবস্থাপনার একটি মহাপরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। তিনি জানান, গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা, খরচ এবং সেই প্রেক্ষিতে প্রাপ্তির বিষয়টি সামঞ্জস্যকর বা ন্যূনতম লাভজনক হচ্ছে কি না; তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্যাস ক্ষেত্রের কূপ খননের বিষয়টি মোটেও সহজসাধ্য নয়। এ কাজে বিপুল পরিমাণ অর্থের পাশাপাশি সময় প্রয়োজন এবং সেই সঙ্গে প্রাপ্ত গ্যাসের পরিমাণ খরচ ও সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে কি না; তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার জন্য শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রতি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক এলাকায় শিল্পোদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিচ্ছিন্ন স্থানে শিল্পকারখানা স্থাপন না করে প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে শিল্পকারখানা স্থাপন ও স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলে, সরকার নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রাক্তন সচিব ড. এম ফওজুল কবির খান মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, গ্যাসের প্রস্তাবিত মূল্য কার্যকর হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৯৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ বাড়বে। পাশাপাশি টেক্সটাইল, সিমেন্ট ও স্টিল খাতে যথাক্রমে ১৮, এক দশমিক ৯৩ ও সাত দশমিক ৩৭ শতাংশ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। তিনি অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ, এলপিজি ব্যবহারকে উৎসাহিত করা এবং পিক ও অফপিক সময়ে আলাদা ট্যারিফ প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন।
নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন অংশ নেন। বিটিএমএ সভাপতি বলেন, বিটিএমএ’র অন্তর্ভুক্ত ৫৮৫টি টেক্সটাইল মিল ক্যাপটিভ পাওয়ার স্টেশনের মাধ্যমে এক হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদান করছে। যাতে ব্যয় হচ্ছে ৩০-৩৫ কোটি টাকা। বিটিএমএ’র সভাপতি টেক্সটাইল খাতকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
ড. বদরুল ইমাম বলেন, গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার ও উত্তোলনের লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে আমাদের বিদ্যমান গ্যাস সংকট মোকাবিলা সম্ভব হবে। ড. ইজাজ হোসেন বলেন, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে। তিনি নিজস্ব কয়লা ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরামর্শ দেন।
নির্ধারিত আলোচনায় ডিসিসিআইর পরিচালক নূহের লতিফ খান, ইঞ্জি. মো. আল আমিন, প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি আলহাজ আবদুস সালাম, প্রাক্তন সহসভাপতি এম আবু হোরায়রাহ, প্রাক্তন পরিচালক হুমায়ুন রশিদ, একেডি খায়ের মোহাম্মদ খান, আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, পিডিবির প্রাক্তন চেয়ারম্যান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, বিএনও লুব্রিক্যান্টের প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন ইউসুফ এবং ম্যাগনাম স্টিল মিলস লিমিটেডের প্রতিনিধি জহির এ চৌধুরী প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।

সর্বশেষ..