সম্পাদকীয়

জ্বালানি তেল কিনতে কঠিন শর্তের ঋণ নয়

 

জ্বালানি তেল কিনতে জিটুজি ভিত্তিতে সৌদি আরবের একটি সংস্থার কাছে কঠিন শর্তে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এটি এমন সময়ে নেওয়া হচ্ছে, যখন এর প্রায় চার গুণ মুনাফার অর্থ নিজস্ব তহবিলে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থার। অন্য দেশ থেকেও রয়েছে অপেক্ষাকৃত কম দামে তেল কেনার সুযোগ। প্রশ্ন ওঠে, নিজস্ব তহবিলে অর্থ থাকা সত্ত্বেও কেন নেওয়া হচ্ছে কঠিন শর্তের ঋণ? অনেক সময় এমন ঋণচুক্তি সম্পাদনে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিতে পরোক্ষ কিছু বিষয় থাকে। উল্লিখিত ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সে রকম কিছুও নাকি নেই। প্রশ্ন হলো, অপেক্ষাকৃত বেশি সুদে জ্বালানি তেল কিনতে বাংলাদেশ তাহলে সৌদি আরবের কাছে ঋণ নিতে যাচ্ছে কেন? সচেতনদের মনে আরেকটি প্রশ্ন জাগতে পারে, বিশ্ববাজারে অপেক্ষাকৃত কম দামে তেল কেনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কী কারণে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশমুখী হচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা?

দীর্ঘ সময় ধরেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যে নিম্নমুখী, তা বলাই বাহুল্য। অনেকের মনে আছে, এ অবস্থায়ও তুলনামূলক বেশি দামে অত্যাবশ্যক এ পণ্য কিনতে হয়েছে বাংলাদেশি ভোক্তাদের। বিভিন্ন মহল থেকে দাম কমানোর দাবি থাকলেও তা কার্যকর হয়নি নানা অজুহাতে। এখন কঠিন শর্তে তেল আমদানির জন্য ঋণচুক্তি করা হলে এর প্রভাব যে বাজারেও পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। অনেকে এমন প্রশ্নও তুলতে পারেন, দেশের বাজারে তেলের দাম কমুক এবং জনজীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়–ক, নীতিনির্ধারকরা কি এটা চাচ্ছেন না? নাকি উল্লিখিত দেশের কোম্পানি থেকে তেল আমদানির পেছনে যুক্ত রয়েছে ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থ?

আমরা জানি, সিংহভাগ মানুষের স্বার্থ দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। উল্লিখিত চুক্তি কার্যকর হলে এ ধারা যে ব্যাহত হবে, তা বলা যায়। আমরা চাইবো, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকুক সরকার। কম দামে জ্বালানি তেল কিনতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হোক। এতে ঋণ ও সুদের বোঝা থেকে জনগণ যেমন রেহাই পাবে, তেমনি তেলের দাম কমে আসায় প্রভাব পড়বে বাজার ও জনজীবনে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা দরকার, দ্বিপক্ষীয় ঋণচুক্তি সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায়। এর অনুল্লিখিত প্রভাব থাকে কূটনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও। আর দেশি তহবিল অলস থাকা সত্ত্বেও কঠিন শর্ত ও বেশি সুদে বিদেশি ঋণ নেওয়ার অর্থ হলো পরনির্ভরতাকে উৎসাহিত করা। দেশ যখন নানা ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে, তখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত কি বিবেচনাপ্রসূত হবে? একদিকে ঋণচুক্তি সম্পাদন, অন্যদিকে মুনাফা হিসেবে বিপিসির তহবিলে জমা ২০ হাজার কোটি টাকার সদ্ব্যবহার যদি করা না যায়, তাহলে আমাদের লোকসান হবে দুদিক থেকেই।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও দেশের বাজারে এর প্রভাব সেভাবে না পড়ায় জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও এ ব্যাপারে নানা কথা শোনা গেছে বিভিন্ন সময়ে। ঋণচুক্তি ঘিরে সরকারের সমালোচনা শুরু হোক, সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই তা চাইবেন না। আমরা মনে করি, চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করা হোক। তেল আমদানির ক্ষেত্রে সৌদি আরবের বেশ কিছু বিকল্প বাজার রয়েছে আমাদের সামনে। এমন বাস্তবতায় নিজস্ব তহবিল অলস ফেলে রেখে বেশি হারের সুদে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলে

বিপিসির তহবিলে জমা থাকা অলস অর্থ সদ্ব্যবহারের বাস্তবতাও তৈরি হবে। সংস্থাটি নিজ তাগিদে এত দিন নিজস্ব তহবিল যথাযথ কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয়নি; এখন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তাদের দেওয়া হোক।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..