প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জ্বালানি তেল বিক্রিতে দৈনিক লোকসান ২৫ কোটি টাকা!

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: বিদেশ থেকে প্রতি ব্যারেল ডিজেল কেনায় ব্যয় হচ্ছে ৯৬ ডলার। আর আমদানি শুল্কসহ অন্যান্য ব্যয় মিলে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৯৮ ডলার। অন্যদিকে দেশের বাজারে প্রতি ব্যারেল বিক্রি হচ্ছে ৭২ ডলারে। এতে ব্যারেলপ্রতি লোকসান হচ্ছে ২৬ ডলার। অর্থাৎ লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ১৪ টাকা। একইভাবে লিটারপ্রতি ফার্নেস অয়েলে লোকসান আট টাকা। সবমিলে বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল বিক্রিতে প্রতিদিন ২২ কোটি থেকে ২৫ কোটি টাকা লোকসান গুনছে। আর আন্তর্জাতিক বাজারের দাম আরও বাড়লে লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হবে।

বিপিসির হিসাব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে আমদানিকৃত ডিজেলের ব্যারেলপ্রতি ব্যয় প্রায় ৯৮ ডলার হলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৪০ ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ ব্যারেলপ্রতি আমদানি ব্যয় ২৫০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলারের দামে বিপিসিকে ডিজেল বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে ব্যারেলপ্রতি লোকসান হচ্ছে ২৬ ডলার।

দেশে প্রতিদিন ডিজেলের গড় চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার টন। সে হিসাবে প্রতিদিন লোকসান প্রায় ২১ কোটি টাকা। অন্যদিকে অন্যদিকে প্রতি মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েলের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫১০ ডলার। এতে লিটারপ্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে আট টাকা। একই অবস্থা অন্যান্য জ্বালানি তেল দামেও। যদিও এসব জ্বালানি পরিমাণে কম আমদানি করতে হয়, তাই লোকসান কম। তবে সবমিলে বিপিসির দৈনিক লোকসান ২২ কোটি থেকে ২৫ কোটি টাকা।

আরও জানা যায়, দেশের জ্বালানি তেলের বাজারের প্রধান নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থাটি বছরে প্রায় ৫৫ লাখ টন জ্বালানি বিক্রি করে। এর মধ্যে অপরিশোধিত ক্রুড অয়েল ১১ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেল ৪০ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। এসব জ্বালানির আমদানি ব্যয় ছিল প্রায় ২১ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে আগের অর্থবছরের ২০১৮-১৯ অপরিশোধিত ক্রুড অয়েল ১৩ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এবং ৪৬ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল। আর এসব জ্বালানির আমদানি ব্যয় ছিল ৩০ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ২০১৯-২০ বছরের আমদানি সাশ্রয় হয়েছিল ৯ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে করোনাভাইরাসের কারণে তেলের চাহিদা ও তেলের দাম কম ছিল। কিন্তু চলতি বছরের শুরুর আগে থেকে টানা ছয় মাস অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েছে। আর দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে উচ্চমূল্যে কিনে পূর্বনির্ধারিত মূল্যে সরবরাহ করছে বিপিসি। এ কারণে গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে লোকসানে তেল বিক্রি করছে বিপিসি।

ইনডেক্স মুন্ডির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছরের মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের ব্যারেল প্রতি দাম ছিল ৩০ ডলার ৩৮ সেন্ট, যা গত জুন মাসে ছিল ৩৯ ডলার ৪৬ সেন্ট, ডিসেম্বরের ৪৮ ডলার ৭৩ সেন্ট। আর চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫৩ ডলার ৬০ সেন্ট, মার্চে ৬৩ ডলার ৮৩ সেন্ট এবং মে মাস শেষে ৬৬ ডলার ৪০ সেন্ট। আর অক্টোবরের ৮৪ ডলার ৩৩ সেন্ট। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি তেল দ্বিগুণ বেড়েছে। একইভাবে ফার্নেস, জেট ফুয়েল ও গ্যাসলিনের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, গত বছরের করোনাভাইরাসের সংক্রমণে স্থবির হয়ে পড়েছিল পুরো বিশ্ব। কিন্তু শেষদিকে টিকা আসায় আবারও বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলো ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। এতে তাদের তেলের চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু তেল পরিশোধন কিংবা খনি থেকে উত্তোলন বাড়েনি। এর মধ্যে বিশ্বব্যাপী জাহাজ ভাড়ার দামও তিনগুণ বেড়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, বন্দরের জাহাজজট প্রভৃতির প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। ফলে টানা দাম বাড়ছে, যা অব্যাহত আছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) সৈয়দ মেহদী হাসান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিনিয়ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, যা অব্যাহত আছে। ফলে গত কয়েক মাস ধরে আমরা লোকসানে তেল বিক্রি করছি। এখন বিপিসি দৈনিক প্রায় ২২ থেকে ২৫ কোটি টাকা লোকসান করছে। এর মধ্যে ডিজেলে লিটারপ্রতি ১৫-১৬ টাকা এবং ফার্নেস অয়েলে সাত থেকে আট টাকা লোকসান হচ্ছে।’ আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে তেলের নতুন দর নির্ধারণের পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। বিষয়টি আমরা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে অবহিত করেছি।

উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে ডিজেলে চাহিদা ছিল ৮ দশমিক ৪৮ মেট্রিক টন। আর বর্তমানে মোট জ্বালানি তেলের চাহিদা ৫৫ লাখ মেট্রিক টন। সাড়ে চার দশকে জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় সাতগুণ।