দিনের খবর সারা বাংলা

ঝিনাইদহে পুকুরে গলদা চিংড়ি চাষে অভাবনীয় সাফল্য

নয়ন খন্দকার, ঝিনাইদহ: ধীরে ধীরে পুকুরপাড়ে বাড়ছিল উৎসুক জনতার ভিড়। জেলেরা জাল টেনে পুকুরের কিনারায় আসতেই সবাই অবাক! গলদা চিংড়ি! সাইজেও অনেক বড়। সবার মাঝে শোরগোল পড়ে যায়। সম্প্রতি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরপুর-দুর্গাপুর ইউনিয়নের মহাদেবপুর গ্রামে সোহাগ মৎস্য খামারে গলদা চিংড়ি ধরাকে কেন্দ্র করে এমনই এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। মাছ দেখতে ও কিনতে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি শহর থেকেও লোকজন এসেছিলেন।

জানা গেছে, প্রথমদিনেই খামার থেকেই প্রায় ৫০ হাজার টাকার মাছ বিক্রি হয়ে যায়। জেলায় এই প্রথম গলদা চিংড়ির চাষ হয়েছে। সোহাগ মৎস্য খামারের ৬৬ শতাংশ জায়গায় গলদা চিংড়ি ও কার্পজাতীয় মাছ চাষ করে মাত্র সাত মাসেই অভাবনীয় সফলতার আশা করছেন মৎস্যচাষি সোহাগ। এরই মধ্যে স্থানীয়দের চাওয়া পূরণ করতে গত শনিবার জাল টেনে অল্প পরিমাণে গলদা চিংড়ি, রুই-কাতলা ও সিলভার কার্প ধরেন তিনি। মাছগুলো আশানুরূপভাবে বৃদ্ধিও পেয়েছে। উপযুক্ত দাম পেলে প্রায় তিন লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন সোহাগ কুমার বিশ্বাস।   

সোহাগ কুমার বিশ্বাস জানান, তার বাবা স্বপন কুমার বিশ্বাস চার বছর ধরে পুকুরে কার্পজাতীয় মাছ চাষ করছেন। সেই সূত্রে তিনি নিজেকে একজন সফল মৎস্য উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঢাকা আইইউবিএটি থেকে কৃষিতে অনার্স শেষ করলেও ইন্টার্ন করেন মৎস্য চাষের ওপর। ২০১৮ সালে মংলায় গাজী ফিস ফার্ম থেকে সফলতার সঙ্গে ইন্টার্ন শেষে গ্রামে ফিরে বাবার সঙ্গে মাছ চাষ শুরু করেন।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনি পাবদা ও গুলশা মাছের চাষ করেন। কার্পজাতীয় মাছের তুলনায় এ-জাতীয় মাছ চাষে অধিক মুনাফাও পেয়েছেন। এ বছর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুর রহমান রেজার পরামর্শে ৬৬ শতাংশ জায়গায় গলদা চিংড়ির সঙ্গে রুই-কাতলা ও সিলভার কার্প মাছের চাষ করেন তিনি।

সোহাগ বলেন, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ৬৬ শতাংশের একটি পুকুরে  বাগেরহাটের একটি মৎস্য খামার থেকে পিএল সাইজের তিন হাজার ২০০ গলদা চিংড়ি ও তিন হাজার কার্পজাতীয় মাছ ছাড়া হয়। প্রতিটি গলদা চিংড়ি ১৮ টাকা দরে কেনা হয়। পুকুর প্রস্তুতকরণ, খাবার, প্রোবায়োটিক ও শ্রমিক খরচ বাবদ সাত মাসে তার প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সময়মতো খাবার ও সঠিক পরিচর্যা করায় মাছের ওজনও ভালো এসেছে।

তিনি আরও বলেন, পুকুর থেকে ৩৫০ কেজি চিংড়ি ও এক হাজার কেজি কার্পজাতীয় মাছ পাবেন বলে আশা করছেন। সব ঠিক থাকলে চিংড়ি থেকে কমপক্ষে তিন লাখ টাকা ও কার্পজাতীয় মাছ থেকে তিন লাখ টাকার মাছ বিক্রি করা যাবে। সব মিলিয়ে খরচ বাদে কমপক্ষে তিন লাখ টাকা মুনাফা পাবেন বলে তিনি আশা করছেন।  

খাবার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সোহাগ জানান, প্রতিদিন সকাল ১০টা ও সন্ধ্যা ৭টায় চিংড়ির ফিড ও বিকাল ৪টায় ভাসমান ফিড দিতেন। মাছের ওজন অনুযায়ী খাবার দিতে হয়। এছাড়া অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দিলে অ্যারেটর ব্যবহার করে অক্সিজেনের জোগান দিতে হয়। গলদা চিংড়িতে তেমন কোনো রোগবালাই দেখা যায়নি বলে তিনি জানান।

মাছের বাজারজাতকরণ নিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে গলদা চিংড়ির বাজার সেভাবে গড়ে ওঠেনি। সেজন্য উৎপাদিত গলদা চিংড়ি বিক্রির জন্য সাতক্ষীরা চুকনগরের এক মৎস্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। তিনি প্রতি কেজি চিংড়ি এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা দর দিতে চেয়েছেন। কয়েক দিনের মধ্যে সব মাছ ধরা হবে।  রুই-কাতলা ও সিলভার কার্প মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হবে। আর চিংড়ি সাতক্ষীরায় পাঠানো হবে।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুর রহমান রেজা বলেন, কালীগঞ্জের মাটি, পানি ও আবহাওয়া গলদা চিংড়ি চাষের উপযোগী। গলদা চিংড়ি চাষ লাভজনক হওয়ায় উপজেলার মৎস্যচাষিদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। কেউ চিংড়ি চাষে এগিয়ে এলে মৎস্য অফিস তাদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে বলে তিনি জানান।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..