দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের উদ্যোগ

জিনাত রহমান: বাবুলের বয়স ৯ কিংবা ১০ বছর। ঘড়ির কাঁটায় রাত ৯টা। তারপরও কাজ শেষ হয় না শিশু বাবুলের। মিরপুর-১০-এর লেগুনার হেলপার। ক্ষীণকণ্ঠে ডেকে চলেছে আগারগাঁও, তালতলা, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মোহাম্মদপুর। তার সারাদিন কাটে লেগুনার হাতলে ঝুলে। এমন হাজারো বাবুলের দিন কাটে লেগুনার হাতলে ঝুলে, ইট ভেঙে, লেদ মেশিন চালিয়ে অথবা ঝুঁকিপূর্ণ অন্য কোনো কাজ করে। এই বয়সে বাবুলের লেখাপড়া করার কথা। অথচ তার কাঁধে বই নয়, চড়ে বসেছে সংসার।

রাজধানী ঢাকায় প্রতিটি রুটে লেগুনার হেলপারদের বেশিরভাগই শিশু। প্রতিটি শিশুই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেগুনায় হেলপার হিসেবে কাজ করছে। প্রায়ই তারা ছোট ছোট দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশেই লেগুনা, টেম্পো বা বাসের হেলপার শিশুরাই। সারা দেশে পরিবহন সেক্টরে কাজ করছে প্রায় দেড় লাখ শিশু। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হয়তো তাদের মা-বাবা ভাবছেন না। তারা মনে করছেন, লেখাপড়া করানোর টাকা আসবে কোথা থেকে? এখন বরং সংসারে টাকা আসছে, তাদের পেছনে টাকা খরচ করতে হচ্ছে না। শুধু পরিবহন খাতেই নয়, আরও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এই শিশুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে।

দারিদ্র্যই শিশুর ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের একমাত্র কারণ নয়, অভিভাবকের অসচেতনতা অনেকাংশে দায়ী। শিশুশ্রম শিশুর আনন্দময় শৈশব কেড়ে নেয়। বর্তমানে প্রতিটি গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বিনা মূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তি ও স্কুলে দুপুরে পুষ্টিকর খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতে অভিভাবকের কোনো খরচ হয় না। সরকার সব খরচ বহন করছে। অভিভাবকরা অল্প বয়সে শিশুদের দিয়ে উপার্জনের চিন্তা না করে স্কুলে পাঠালে শিশুর লেখাপড়া নিশ্চিত হবে পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শিশুশ্রম-সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এই বিপুলসংখ্যক শিশুদের শিক্ষার বাইরে রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন কঠিন। এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শিশুশ্রম নিরসনে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে সরকার সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন করে জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়নের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন করার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছর পর্যন্ত কোনো শিশুকেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা যাবে না। তবে ১২ বছর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নয় এমন হালকা কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে।

শিশুশ্রম নিরসনে সরকার ২০১০ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। পরে ৩৮টি কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কাজগুলো হচ্ছেÑঅটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, বিড়ি-সিগারেট কারখানা, ইট-পাথর ভাঙা, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, টেক্সটাইল, লেদ মেশিনের কাজ, লবণ কারখানা, সাবান ও ডিটারজেন্ট কারখানা; স্টিল, ফার্নিশার্স ও মোটর গ্যারেজ; চামড়াজাতীয় দ্রব্যাদি অর্থাৎ ট্যানারি শিল্প, ওয়েলডিং বা গ্যাস বার্নার, কাপড়ের রং ব্লিচ, জাহাজ ভাঙা, ভলকানাইজিং, জিআই সিট, চুনাপাথও, চকসামগ্রী, স্পিরিট ও আ্যালকোহল, জর্দা বা তামাকজাতীয় দ্রব্যাদি, সোনা বা ইমিটেশন, কাচ বা কাচের সামগ্রী, আতশবাজি, ট্রাক, টেম্পো বা বাস হেলপার, স্টেইনলেস স্টিল, কার্বন ফ্যাক্টরি, তাঁতের কাজ, ইলেকট্রিক মেশিন, বিস্কুট বা বেকারি, সিরামিক, নির্মাণকাজ, কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি, কসাইয়ের কাজ, কামারের কাজ, বন্দর বা জাহাজে মালামাল হ্যান্ডলিং, অ্যালুমিনিয়াম জাতীয় দ্রব্যাদি তৈরি, ম্যাচ ফ্যাক্টরি, প্লাস্টিক বা রাবার তৈরি ও কীটনাশক তৈরির কারখানা।

সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় দেশের চারটি বিভাগীয় শহরে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কী পরিমাণ শিশু কাজ করছে তার একটি জরিপ সম্পন্ন করেছে। আইএলও’র সহযোগিতায় প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিভাগীয় কমিশনারের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন বেসরকারি এবং সামাজিক সংস্থার সমন্বয়ে জনসচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শিশুশ্রম নিরসনে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিশুদের উন্নয়নে কাজ করে এমন সব মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং এনজিওর সমন্বয়ে জাতীয় কমিটি কাজ করছে।

শিশুশ্রম নিরসনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদিÑএই তিন ভাগে ভাগ করে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অবশ্যই ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্র্ণ শিশুশ্রম এবং ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসন করতে হবে। সরকারও এ বিষয়ে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ঝুঁকিপূর্র্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায়ে এসে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের আওতা বাড়ানো হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ২ লাখ শিশুকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঝুঁকিমুক্ত জীবনে ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে। এর মধ্যে এক লাখ শিশু পাবে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা আর এক লাখ শিশু পাবে কারিগরি প্রশিক্ষণ। সেই সঙ্গে প্রতি মাসে দেওয়া হবে এক হাজার টাকা করে বৃত্তি। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এর আগে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে নিয়োজিত ৯০ হাজার শিশু শ্রমিককে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের মা-বাবাকে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে হাজার হাজার বাবুল পাবে শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ। প্রচার-প্রচারণায় বাড়বে জনসচেতনতা। অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রতিটি মা-বাবা তাদের সন্তানদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে ফিরিয়ে এনে স্কুলে পাঠাবেন, নিজেরা কষ্ট করে হলেও তাদের সন্তানকে শিক্ষিত করবেন, ২০২১ সালের পর আর কোনো শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে থাকবে না, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি শিশু প্রশিক্ষিত জনসম্পদে পরিণত হবে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা সক্ষম হবো, এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..