মত-বিশ্লেষণ

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ হোক

মো. হাবিবুর রহমান: রাজধানী ঢাকার কমলাপুরে একটি গ্যারেজে কাজ করে সাগর। বয়স আনুমানিক ১২ বছর। শিশুর জন্য অনুপযোগী পরিবেশ এবং বিভিন্ন রং ও রাসায়নিক দ্রব্যের কাজ করতে হয় তাকে। প্রায় তিন বছর ধরে এ গ্যারেজে কাজ করছে সাগর। প্রথমে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ শিখতে হয়েছে তাকে। এখন মালিক তাকে দিনে ৮০ টাকা আর দুপুরে খাবার দেয়। কোনো ছুটি নেই। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যান্ত কাজ করতে হয় সাগরকে। কষ্ট হলেও সাগর এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ তার ঠেলাগাড়িচালক বাবার পক্ষে ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ করা সম্ভব নয়। তাই পরিবারের অভাব কিছুটা লাঘব করার জন্য বাবাকে সাহায্য করছে সে। কমলাপুর সরকারি প্রাইমারি স্কুলে সে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে। এরপর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশে শিশুশ্রমের প্রধান কারণ হচ্ছে দারিদ্র্য ও অসচেতনতা। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে ভরণপোষণ মিটিয়ে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগান দেওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না। ফলে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান না। এ পরিস্থিতিতে বয়সের কথা বিবেচনা না করে উপার্জনের জন্য সন্তানদের যেকোনো পেশায় নিয়োজিত করাকে বাবা-মা লাভজনক বলে মনে করেন। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শিশুদের পর্যাপ্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেক বাবা-মা অসচেতনতার কারণে সন্তানকে স্কুলে না পাঠিয়ে অর্থলাভের আশায় শিশুশ্রমে নিয়োজিত করেন, যা অত্যন্ত অমানবিক, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও শিশুর শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। আবার লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ঝরেপড়া শিশুরাও পরে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হয়ে পড়ে। তার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে বেশি নিয়োজিত হচ্ছে এসব শিশু।

শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধিত) আইন, ২০১৮’ পাস করা হয়েছে। কেউ যদি শিশুশ্রমিক নিয়োগ করে, তাকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড করা হবে। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিশোর-কিশোরীরা হালকা কাজ করতে পারবে। আগে ১২ বছরের শিশুরা হালকা কাজের এ সুযোগ পেত। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রমিককে নিয়োগ দিলে মালিকের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করা যাবে। এখন প্রস্তাবিত আইনে ৯০ দিনের মধ্যে রায় দিতে হবে বলে উল্লেখ আছে। কোনো কারণে এই ৯০ দিনের মধ্যে রায় দেওয়া না গেলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অবশ্যই এই রায় দিতে হবে।

আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শিশু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী, দেশে পাঁচ থেকে ১৮ বছর বয়সি শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৪ লাখ। এদের মধ্যে একটি বিরাট অংশ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। জরিপে দেখা গেছে, দরিদ্র বা বস্তি এলাকার শিশুদের ৬৪ শতাংশ স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন সুবিধা,  ৫৯ শতাংশ তথ্যলাভের অধিকার, ৪১ শতাংশ বাসস্থান এবং ৩৫ শতাংশ বিশুদ্ধ খাদ্য থেকে বঞ্চিত হয়। ‘বাংলাদেশে শিশুশ্রমের অবস্থান’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় শিশুশ্রমের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে দারিদ্র্য, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকা, বাবা-মা পরিত্যাজ্যতা, অসেচতনতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অভিবাসন প্রভৃতি।

জাতিসংঘ ১৯৫৯ সালে শিশু অধিকার সনদ ঘোষণা করে। বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। বাংলাদেশ শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাইকে শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শিশু অধিকার সনদে বলা হয়েছে, শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। সমাজকল্যাণ ও আইনের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য হবে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ। রাষ্ট্রসমূহ শিশুদের পরিচর্যা এবং সরকার শিশুদের সেবা ও সুবিধাদি প্রদান করবে এবং শিশুদের মৌলিক অধিকার, যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করবে। শিশুর পরিচয় ও জাতীয়তা অর্জন এবং প্রতিপালিত হওয়ার অধিকার থাকবে। শিশুকে অপহরণ করা, অবৈধভাবে দেশত্যাগ করানো অথবা পাচার করা যাবে না। শিশুর বিকাশের পরিবেশ ও অধিকার দিতে হবে। বাবা-মায়ের পরিচয়বিহীন শিশুকে রাষ্ট্র লালন করবে। শিশু নির্যাতন ও শিশুকে দিয়ে জবরদস্তিমূলক কোনো কাজ করানো যাবে না। যৌনাচারে ব্যবহার করা যাবে না। পঙ্গু শিশুকে পরিপূর্ণ সামাজিক ও সুন্দর পরিবেশে জীবনযাপনের মর্যাদা দিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। শিশুদের আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। শিশুদের অপরাধ জগতে প্রবেশের পথ রুদ্ধ করতে হবে।

শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও কাজ করে যাচ্ছে। সরকার এরই মধ্যে এক লাখ ৬৬ হাজার শ্রমজীবী শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা থেকে সরিয়ে এনে মৌলিক শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। চার থেকে ছয় বছর বয়সি দুই লাখ শিশুকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। পথশিশুদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ছয়টি বড় শহরে শিশুবিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপের ফলে এখন শিশুরা স্কুলমুখী হয়েছে। অনেকে স্কুল সময়ের আগে ও পরে কাজ করে থাকে। এমন শিশুর সংখ্যাও আমাদের দেশে কম নয়। সরকারের পক্ষ থেকে কর্মজীবী শিশুদের পড়ালেখার বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ায় শিশুদের শিক্ষার হার বেড়েছে। তাদের ঝরে পড়ার হারও কমেছে।

সরকার ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশে ইউনিসেফ, আইএলও ও বিজিএমইএ পোশাকশিল্পে শিশুশ্রম নিরোধে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা সনদ স্বাক্ষর করেছে। সরকারের কঠোর নজরদারিতে গার্মেন্ট সেক্টরে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া দরিদ্র এলাকা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

শিশুদের শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিতে হবে। এতে একদিকে যেমন তারা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে, অন্যদিকে তারা উৎপাদনশীল খাতে নিজেদের নিয়োজিত করতে সমর্থ হবে। এ লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণে বিশাল উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশেকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ২০২০ সালের মধ্যে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ২০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এজন্য উপজেলা পর্যায়ে ৩৮৯টি কারিগরি স্কুল ও কলেজ এবং ২৩ জেলায় একটি করে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে আটটি বিভাগীয় সদরে নারীদের জন্য কারিগরি কলেজ এবং চার বিভাগীয় শহর চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুরে একটি করে প্রকৌশল কলেজ প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে শহর ও গ্রামাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও যুবকরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারবে।

শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা ছাড়া মানুষ উচ্চ উৎপাদনশীল কাজ করতে পারে না। তাই সরকার সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারি সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিটি অভিভাবকের উচিত তাদের শিশুদের স্কুলে পাঠানো। অল্প বয়সে শিশুকে কাজে না পাঠিয়ে তাকে শিক্ষিত করলে ভবিষ্যতে সে অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হবে, এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

আগামী ২০২১ সালের মধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছি। তাই শিশুশ্রম প্রতিরোধে ১৮ বছর বয়সের নিচে কোনো শিশু যেন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে না পারে, সে লক্ষ্যে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন অভিভাবকদের সচেতনতা। আমাদের দেশে দারিদ্র্যের হার অনেক কমে গেছে। প্রাথমিক স্তর থেকে শিশুদের ঝরেপড়া আরও বেশি সংখ্যায় রোধ করতে হবে। শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। যেসব বাসা ও কারখানায় শিশুরা শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত, সেসব বাসা ও কারখানার মালিককে শিশুর প্রতি যত্নশীল হতে হবে। তাদের কম কষ্টের ও ঝুঁকিহীন কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে তারা যেন নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার না হয়ে ঝুঁকিমুক্ত কাজ করতে পারে, সেদিকে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা সবাই মিলে যদি আমাদের শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি এবং শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তাহলে আমাদের উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন সফল হবে। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের অভিশাপ থেকে আমাদের শিশুরা মুক্ত হবে। সোনার বাংলায় শিশুরা হেসে-খেলে বেড়াবে নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..