প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ঝুঁকিমুক্ত থাকুক বঙ্গবন্ধু সেতুর রক্ষাকাঠামো

 

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত খবরের শিরোনামÑ‘যমুনার ভাঙনে ঝুঁকিতে বঙ্গবন্ধু সেতু রক্ষাকাঠামো’। সেখানে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে (২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল) যমুনার গভীরতায় তেমন হেরফের না হলেও মূলত সে াতের গতি বৃদ্ধি পাওয়া ও দিক পরিবর্তন ঘটায় ঝুঁকিতে পড়েছে বঙ্গবন্ধু সেতুর রক্ষাকাঠামো। প্রতিবেদক জানাচ্ছেন, গাইড বাঁধ ও হার্ড পয়েন্টের কাছে নদীভাঙন প্রত্যাশিত নয়। তবে ভাঙন নাকি দেখা যাচ্ছে পূর্বদিকের গাইড বাঁধ ও ভুয়াপুর হার্ড পয়েন্টে। সে ভাঙন গোটা নদীশাসন কাঠামোর স্থায়িত্বকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে শঙ্কা। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধনের পর ভাঙন রোধে ৩৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণ হয় ১৯৯৯ সালে। খেয়াল করার বিষয়, যমুনা নদী শাসনের জন্য ওই শহররক্ষা বাঁধই শেষ ব্যয় নয়। ছোটখাট ও আপৎকালীন প্রকল্প বাদেও নদীশাসনের জন্য পরবর্তী সময়ে সেখানে নেওয়া হয় একাধিক বৃহৎ প্রকল্প। এর মধ্যে এক হাজার ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল (পাইলট) ড্রেজিং অব রিভার সিস্টেম ইন বাংলাদেশ, ২৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর ডান তীর সংরক্ষণ, বিশ্বব্যাংকের প্রায় ৭৩ কোটি টাকা অর্থায়নে হার্ড পয়েন্ট রক্ষায় ওয়াটার ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প এখনও বাস্তবায়নাধীন। দেখা যাচ্ছে, ভাঙন রোধে শুধু বোল্ডার ও পাথর ফেলতেই ১৮ বছরে সেতু বিভাগের ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ২৫০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ১৯৯৮ সালে উদ্বোধনের পর প্রায় চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতু রক্ষায় গৃহীত উদ্যোগে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা।

অবশ্য বঙ্গবন্ধু সেতু রক্ষার এই বিপুল ব্যয় আড়াল হয়ে যায় এর অর্থনৈতিক সুফলের ছায়ায়। সেতুটি টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। দ্বিতীয় বিষয় হলো, নদীকে শাসনে রাখা যে কোনো দেশের জন্যই চ্যালেঞ্জ; বাংলাদেশ সেখানে ব্যতিক্রম নয়। বাড়তি সমস্যা হলো, পুরাতীত কাল থেকেই যমুনা যেন একটু বেশি খেয়ালি। তাই এদিকে মনোযোগ দিতে হবে বেশি। সেজন্য বিশেষজ্ঞদের মত গুরুত্বসহকারে নেওয়া প্রয়োজন। দেখা দরকার, নদীভাঙন রোধ করতে গিয়ে যমুনাকে আসলেই বেশি শাসন করা হয়েছে কিনা। নদীশাসন বিশেষজ্ঞ ড. শামছুল হক আমাদের প্রতিবেদকের কাছে মত ব্যক্ত করেছেন যে, সেজন্যও যমুনার আচরণ ইদানীং হিংস  হয়ে থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের উচিত দেশি বিশেষজ্ঞ তো বটেই, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা। এ ব্যাপারে কোনো দেশের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে না গিয়ে বিশ্বব্যাংক বা এডিবি’র মতো উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। আর তা নির্দিষ্ট ইস্যু ধরে চাওয়া হলে বিশ্বজুড়ে নানা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে অর্জিত তাদের অভিজ্ঞতা ও বিশেষ জ্ঞান আমাদের জন্য সহায়ক হবে বলে প্রতীয়মান। আরেকটি বিষয়, এক্ষেত্রে যথাসম্ভব ভারসাম্য বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ মুহূর্তে সিরাজগঞ্জ শহর ঝুঁকিতে নেই। তবে কেউ কেউ মনে করেন, গোটা শহরটাই হচ্ছে বঙ্গবন্ধু সেতুর কাঠামো রক্ষার প্রধান রক্ষাবাঁধ। ফলে এটি অরক্ষিত রেখে সেতুর কাঠামো টেকসই করা কঠিন। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, সেতু রক্ষায় নদীশাসন দরকার; কিন্তু সেক্ষেত্রেও যথাসম্ভব অর্থের সাশ্রয় আবশ্যক। এক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রবল অভিযোগ শোনা যায়। সেটি দূর করা জরুরি। নইলে বঙ্গবন্ধু সেতু রক্ষাকাঠামোর উদ্ভূত ঝুঁকি খানিকটা হলেও রয়ে যাবে বলে শঙ্কা।