বাণিজ্য সংবাদ

ঝুঁকির মুখে লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: পানির অভাবে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলে। দেশের অন্যতম এ শিল্পাঞ্চলে ছোট-বড় তিন শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ লাখো কোটি টাকার অধিক। সম্প্রতি উৎপাদনের জন্য পানি ছাড়াও বিশুদ্ধ পানির সংকটও পড়ে। উদ্যোক্তারা মনে করেন, দ্রুত পানি সংকট সমাধান না হলে ঝুঁকির মুখে পড়বে লাখো কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ।
পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ইস্পাত খাতের প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড মানসম্মত ইস্পাতের বাজার চাহিদা ও সম্প্রসারণের সুযোগ থাকায় বছর দুয়েক আগে একটি নতুন সম্প্রসারণ প্রকল্প গ্রহণ করে। যা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আসবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে। প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্লান্টে বছরের উৎপাদন হবে ১০ লাখ টন। এর জন্য প্রতিদিন প্রয়োজন হবে ৬০ লাখ লিটার পানি। কিন্তু সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলে চলমান পানি সংকটের সমাধান এখনও হয়নি। আর দ্রুত সমাধান না হলে বিপদে পড়তে পারে এ প্রতিষ্ঠান।
শুধু জিপিএইচ ইস্পাত নয়, চট্টগ্রামের আবুল খায়ের, পিএইচপি, বিএসআরএম, কেএসআরএম, জিপিএইচ, কেডিএস, টিকে গ্রুপ, মোস্তফা গ্রুপ, মোস্তফা হাকিম, ইউনিটেক্স, বসুন্ধরাসহ ব্যক্তি মালিকানাধীন একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পানি সংকটে আছে। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠা সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলে এসব প্রতিষ্ঠানে গত কয়েক বছর ধরে আছে প্রয়োজনীয় পানি সংকটে। আর গ্রীষ্মকালে এ সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। আর এ অঞ্চলের ছোট-বড় তিন শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের পরিমাণ লাখো কোটি টাকার অধিক। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া মধ্যে দিয়ে ঝুঁকি আছে বিনিয়োগে। অথচ দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ড। এ অঞ্চলের আছে ইস্পাত, সিমেন্ট, টেক্সটাইলসহ উৎপাদন খাতের বড়-ছোট মিলে ৩০০ অধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আছে এক লাখের অধিক কমসংস্থান। ফলে দ্রুত পানি সংকট নিরসন করা না হলে হুমকিতে পড়বে বিনিয়োগ-এমন আশঙ্কা শিল্পমালিকদের।
পিএইচপি গ্রুপের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পিএইচপি গ্লাস কারখানায় বালু পরিষ্কারে প্রতিদিন প্রয়োজন প্রায় চার হাজার টন মিঠা পানি। পানি না পেয়ে তারা পার্শ্ববর্তী জেলা ফেনী থেকে বালি পরিষ্কার করে আনে। এতে তাদের উৎপাদন খরচ অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি পড়ে। যার ফলে মুনাফার পরিমাণও কমছে। ফলে হিমশিম খেতে হচ্ছে উৎপাদন সচল রাখতে।
সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলের শিল্পোদ্যোক্তারা বলেছেন, চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায় বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপতি হয়েছে দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল। শিল্পাঞ্চলে চরম পানি সংকট চলছে। এলাকার ভূ-গর্ভেও পানি সংকট থাকায় বেশিভাগ কারখানাগুলো স্থানীয় পুকুর, ডোবা, বৃষ্টির পানি, ছড়ার পানি সংরক্ষণ করে কোনো মতে উৎপাদন সচল রাখছে। উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায় থাকা ও উৎপাদনে থাকা এসব কারখানার সবকটির মালিক হঠাৎ ভূগর্ভস্থ পানি সংকটে চোখে সরষে ফুল দেখছেন। গত কয়েক বছর থেকে এ সংকট তীব্র হয়েছে। কারণ, আগে প্রতি বছর দুই-তিন ইঞ্চি করে পানির স্তর নিচে নামত। এখন আধা ইঞ্চি করে নামা শুরু করছে। ফলে হাজার ফুটের নিচে নেমেও প্রত্যাশিত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো আমলতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান মিলছে না। অথচ বছরের আমরা সরকারকে রাজস্ব কয়েক হাজার কোটি টাকা। এ অঞ্চলের পানি সংকট সমাধান দ্রুত না করলে লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। এতে মিল-কারখানা বন্ধ হবে। ব্যবসায়ীরা ব্যাংক দেউলিয়া হবে। তাই সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো দ্রুত পানি সংকট নিরসনে এগিয়ে আসা উচিত। কারণ শিল্প বাঁচলে দেশ এগিয়ে যাবে।
এ বিষয়ে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গত কয়েকদিন আগে আমাদের খাবার পানিও ছিল না। আমাদের নতুন কারখানার জন্য প্রতিদিন ৬০ লাখ লিটার পানি প্রয়োজন। অথচ পাচ্ছি খুবই কম। ইতোমধ্যে পানির সন্ধানে বিভিন্ন গভীরতায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। কিন্তু ভূগর্ভের ১৩০০ ফুট গভীরেও পানি মিলছে না। এভাবে হলে তো বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে। আমাদের কারখানা একদিন বন্ধ থাকলে অন্তত সরকার দেড় কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হবে। আর এ অঞ্চলের সব কারখানা বন্ধ থাকলে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ঘাটতি হবে দুই হাজার কোটি টাকার মতো।
তিনি বলেন, সংকট উত্তরণে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির পানি সরকারি উদ্যোগে জলাধারে সংরক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সীতাকুণ্ড এলাকার সবগুলো সুইচগেট চালু করতে হবে। এছাড়া ওয়াসার উদ্যোগে স্বল্পমূল্যে পানি সরবরাহ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
উল্লেখ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চলে ইস্পাত কারখানা ৫১টি, সিমেন্ট কারখানা চারটি, ঢেউটিন তৈরির কারখানা তিনটি, তৈরি পোশাক কারখানা দুটি, কাচ তৈরির কারখানা একটি, পাটকল ৯টি ও চারটি সুতার কারখানা আছে। এছাড়া ১০০ অধিক জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..