প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ঝড়-শিলাবৃষ্টিতে বোরোর ২০% ফসলহানির শঙ্কা

শেখ শাফায়াত হোসেন: বৈশাখ মাস আসার আগেই এবার শুরু হয়েছে কালবৈশাখীর তাণ্ডব। গত ৩১ মার্চ থেকে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও বয়ে যাচ্ছে ঝড় ও শিলাবৃষ্টি। এতে গত সোমবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নওগাঁ, বগুড়া, জয়পুরহাট, কুমিল্লা, নড়াইল, হবিগঞ্জ ও রাজশাহী এ ৯ জেলার অন্তত আট হাজার ৭৩৫ একর জমির বোরো ধান ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। আক্রান্ত এসব জমিতে অন্তত ১৫-২০ শতাংশ ফসলের ক্ষতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে ফসল কাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, হাওরাঞ্চলে এ বছর এখনও ফসল কাটা শুরু হয়নি। মাত্র এক শতাংশ জমির ফসল কাটা সম্পন্ন হয়েছে। হাওরে পানি বাড়লে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ড. মো. আবদুল মুঈদ গতকাল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘হবিগঞ্জের ৬০ হেক্টর বা ১৫০ একর জমির বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। ওই এলাকার ৯০ চাষিকে আমরা পুনর্বাসনের চেষ্টা করছি। তবে অন্যান্য এলাকার এখনও চূড়ান্তভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. আলহাজ উদ্দিন আহম্মদ জানান, দেশের ৯ জেলার সাত লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ চলছে। এসব জমিতে ফসল কাটা শুরু হতে আরও কিছুদিন বাকি রয়েছে। এর মধ্যে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত তিন হাজার ৪৯৪ হেক্টর বা আট হাজার ৭৩৫ একর জমির ধান ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে বলে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রতিবেদন পেয়েছি। এছাড়া পাঁচ হাজার ২০ হেক্টর জমির ভুট্টার মধ্যে ৫৩ হেক্টরের ফসল আক্রান্ত হয়েছে, ২৬৬ হেক্টরের শাকসবজি ও ৩৪২ হেক্টরের আম প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে বলেও তথ্য রয়েছে।
আলহাজ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘এখনও ফসল কাটা শুরু হয়নি। কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়ায় এ বছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ফসলহানি হতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত করে আমরা এখনই বলতে পারছি না। চূড়ান্ত তথ্য পেলে বলা যাবে।’ ফসল কাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যাবে না বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, চলতি বোরো মৌসুমে সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে চার লাখ ৯৭ হাজার ১৯৭ হেক্টরে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত দুই হাজার ৭৬৯ হেক্টরের ফসল কাটা শেষ হয়েছে, যা মোট পরিমাণের মাত্র এক শতাংশ।
এদিকে গতকালও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঝড় ও বজ্রবৃষ্টি হয়েছে। এদিনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কাছে এলে ফসলহানির পরিমাণ আরও বাড়বে। এছাড়া আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার পর্যন্ত ঝড় ও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে এবং আগামী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। এরপর আবহাওয়া অধিদফতর থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরকে নতুন আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার কথা রয়েছে। এ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো দুর্যোগের আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা।
এদিকে দেশের ধান চাষের প্রধান প্রধান অঞ্চলের কৃষকের কাছ থেকেও ফসলহানির আশঙ্কার কথা জানা গেছে। আগামী বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে বোরো ধান কাটার অপেক্ষায় রয়েছেন সেসব এলাকার চাষি।
শেয়ার বিজের জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পাঁচবিবি উপজেলার বাগুয়ান, নওদা ও বালিঘাটাসহ কয়েকটি গ্রামে আগাম কালবৈশাখী ঝড়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতার আশ্বাস সেখানকার কৃষক পাননি।
জানা যায়, ২ এপ্রিল বিকালে হঠাৎ ছোবল হানে আগাম কালবৈশাখী ঝড়। এতে উপজেলার নওদা, বাগুয়ান ও বালিঘাটা গ্রামের দু’শতাধিক বাড়িঘর লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এতে শিশু ও নারীসহ প্রায় ৪০ গ্রামবাসী আহত হওয়া ছাড়াও আবাদি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ঝড়কবলিতদের অনেকের রাতযাপন হয় খোলা আকাশের নিচে। এ অবস্থায় ঘটনার পরদিন থেকে সরকারি-বেসরকারিভাবে সামান্য দান-অনুদান পেলেও নিজের চেষ্টায় আবারও কোমর সোজা করে দাঁড়াতে চেষ্টা করছেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, কালবৈশাখী ঝড়ে বোরো ধান ৩৫০ হেক্টর, করলা, বেগুনসহ অন্যান্য শাকসবজি ২০ হেক্টর, কলা ১৫ হেক্টর, ভুট্টা ১২ হেক্টর, শজনে ও সাত হেক্টর আম ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
পাঁচবিবি উপজেলার নওদা গ্রামের কৃষক হাফিজুল ইসলাম জানান, ‘আমার ১৭ বিঘা কলাক্ষেত নষ্ট হওয়া ছাড়াও বেরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফসলের যত্নে আমি ৭০ হাজার টাকার ওষুধ বাকি নিয়েছি, সেই বাকি টাকা কবে কীভাবে পরিশোধ করব ভেবে পাচ্ছি না।’ বাগুয়ান গ্রামের কৃষক আফজাল মণ্ডল, সিরাজুল ইসলাম বুদাসহ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে তাদের ধান, কলা, ভুট্টাসহ অন্যান্য শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতি কীভাবে তারা কাটিয়ে উঠবেন এ নিয়ে সংশয়ে আছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই সুদে টাকা নিয়ে জমিতে আবারও ফসল লাগানোর চেষ্টা করছেন। আবহাওয়া যদি আর বৈরী না হয়, তাহলে তারা কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।
একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সুনামগঞ্জ থেকেও ফসলহানির খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ফসলরক্ষা বাঁধের ২০ থেকে ২৫টি স্থানে ছোট ছোট গর্ত, আবার কোথাও বাঁধের মাটিতে চিড় ধরেছে।
এর আগে ২০১৭ সালে বোরো মৌসুমে আকস্মিক বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ বছরও ফসল কাটার আগেই একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রাথমিক এক তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে হাওরভুক্ত সাত জেলার (সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ৫৫ উপজেলায় চার লাখ ৪৮ হাজার ৬৬ হেক্টর জমির মধ্যে মাত্র ২৭ হাজার ৫০ হেক্টরে বোরো ধান কাটা সম্ভব হয়েছিল। যা ছিল মোট ফসলের মাত্র ছয় শতাংশ। হাওরাঞ্চলে হাইব্রিডের মধ্যে জনকরাজ, হীরা-৫, এসএল ৮৮, উফশী জাতের ব্রিধান-২৮ ও স্থানীয় খৈয়া বোরো, টেপি বোরো এবং জাগলি বোরো ধানের চাষ হয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..