প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

‘নিয়মের মধ্যে থেকে শৃঙ্খলা মেনে কাজ করতে হয়’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইওর সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন টপ ম্যানেজমেন্ট। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আবুল মনসুর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

‘নিয়মের মধ্যে থেকে শৃঙ্খলা মেনে কাজ করতে হয়’

মোহাম্মদ আবুল মনসুর। আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের কোম্পানি সচিব। স্নাতকোত্তর শেষে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস ও চার্টার্ড সেক্রেটারি কোর্স সম্পন্ন করেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের ফেলো মেম্বার ও ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের অ্যাসোসিয়েট মেম্বার

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ার গড়ার পেছনের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…

মোহাম্মদ আবুল মনসুর: আমার ক্যারিয়ার শুরু ২০০৫ সালে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। সর্বশেষ ২০১৫ সাল থেকে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডে (এপিএসসিএল) কোম্পানি সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

 

শেয়ার বিজ: আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড সম্পর্কে কিছু বলুন…

আবুল মনসুর: আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় খাতে বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। বর্তমানে এর ১০টি ইউনিটে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ১৪০১ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন ও সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড ২০০০ সালে কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত হয়। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসসিএল) মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ভেন্ডরস এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কমপ্লেক্সকে এপিএসসিএলের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানির সব কার্যক্রম শুরু হয়। কোম্পানির আর্টিক্যালস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী, মোট শেয়ারের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ বিপিডিবি ও অবশিষ্ট শেয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং এনার্জি ডিভিশনের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

এ পাওয়ার স্টেশনে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে পুরো দেশজুড়ে ভোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এ পাওয়ার স্টেশন দেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় অর্থনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড কর্তৃক সরবরাহকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্টিম তৈরি ও শীতলীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পানি মেঘনা নদী থেকে নেওয়া হয়। শীতলীকরণের জন্য ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ডিসচার্জ চ্যানেল দিয়ে নদীতে ছাড়া হয়। শুষ্ক মৌসুমে ডিসচার্জ চ্যানেলের পানি বিএডিসির মাধ্যমে আশুগঞ্জ ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় ৩৬ হাজার একর জমি সেচ সুবিধা প্রাপ্ত হয়।

 

শেয়ার বিজ: বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি ও আপনাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাই।

আবুল মনসুর: বর্তমান সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ খাত নির্ধারিত সময়ে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ খাতে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে এবং সরকারের সুস্পষ্ট স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকায় এই উন্নতি হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এপিএসসিএলের জন্য একটি টার্গেট দেওয়া হয়েছে। আমরা সঠিক পথে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই কাজগুলো সম্পন্ন করতে পেরেছি। আশা করি, সামনের কাজগুলোও সঠিক সময়ে সম্পন্ন করতে পারবো ও দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করতে পারবো।

আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার মেগাওয়াট। এ লক্ষ্য অর্জনে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের নিজস্ব টার্গেট ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনসক্ষমতা অর্জন। সে লক্ষ্যে আমরা আশুগঞ্জের বাইরে পটুয়াখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক প্লান্ট করছি, আমরা উত্তরবঙ্গেও ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবো। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্লান্টের টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছি।

 

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে সচিবের ভূমিকা কেমন?

আবুল মনসুর: কোম্পানিতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন গুরুত্ব দিয়ে কোম্পানি সচিবের পদটি নির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। সচিব প্রয়োজনীয় কোম্পানির বিভিন্ন বিধি ও নীতিমালা এবং ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক বিষয়াদি নিয়ে বোর্ডকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করে। তিনি বোর্ডের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনাকে সার্বিক সহায়তা প্রদান করেন। ম্যানেজমেন্ট ও বোর্ডের মধ্যে কোম্পানির সঠিক তথ্য আদান-প্রদান করেন সচিব। এ কারণে সচিবকে দুয়ের মধ্যে ব্রিজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সচিব যদি সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবে প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব।

 

শেয়ার বিজ: সরকারি প্রতিষ্ঠানে সচিবের জন্য বিশেষ কোনো চ্যালেঞ্জ আছে কি?

আবুল মনসুর: সরকারি প্রতিষ্ঠানে চ্যালেঞ্জ বলতে বোর্ডসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কাজ করতে হয়। এখানে কোম্পানির বোর্ড ও মন্ত্রণালয় উভয়ের সঙ্গে সমতা রেখে কাজ করাটাই চ্যালেঞ্জ।

 

শেয়ার বিজ: কোম্পানির সফলতার অনেকাংশ সচিবের ওপর নির্ভর করেÑ এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

আবুল মনসুর: এ বিষয়ে আমি একমত। সচিবের সততা ও দক্ষতার সঙ্গে আইন-কানুন, ব্যবসা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকলে তিনি বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টকে সঠিক নির্দেশনা দিতে পারবেন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে সচিবের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।

 

শেয়ার বিজ: দায়িত্ব পালনে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে আপনার মূলমন্ত্র কী?

আবুল মনসুর: কোম্পানি সচিবকে পাবলিক রিলেশনশিপ অফিসারও বলা হয়। তিনি প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সুতরাং সবার সঙ্গে সুসম্পর্কের জন্য খুব সতর্কতার সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের মনোভাব বুঝে কাজ করতে হয়। অধিকাংশ সমস্যার সমাধানে সমস্যার সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। একজন মনোযোগী শ্রোতা একজন দক্ষ ব্যবস্থাপকও।

 

শেয়ার বিজ: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন কী?

আবুল মনসুর: গতানুগতিক পেশার বাইরে এটি একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। কারণ অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করেই আপনাকে কাজ করে যেতে হবে। মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিয়ম শৃঙ্খলাকে এড়িয়ে যেতে চায়। তবে নিয়মের মধ্যে থেকে শৃঙ্খলা মেনে সবাইকে নিয়েই কাজ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য বর্তমানে সরকারসহ রেগুলেটরি অথরিটিগুলো বিশেষ তত্ত্বাবধান করছে। ফলে কোম্পানিগুলো পারিবারিক প্রথা থেকে করপোরেট কালচারে রূপান্তরিত হচ্ছে। এ সময় চার্টার্ড সেক্রেটারির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশে যতো বেশি শিল্পায়ন ঘটবে, করপোরেট কালচার প্রতিষ্ঠা হবেÑ এ পেশার চাহিদা ততো বাড়বে। তাই এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহীদের আমি স্বাগত জানাই।

সফলভাবে টিকে থাকার জন্য নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে। সবসময় নিজেকে আপডেট রাখতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন, তার ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা রাখা উচিত। আর সততার কোনো বিকল্প নেই।