প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

টাকায় মিলছে কভিড টিকা গ্রহণের জাল সনদ

মানসুরিন আক্তার রিমা: বর্তমান বিশ্বের জন্য মহাআতঙ্কের নাম সার্সের নতুন ধরন ওমিক্রন। ভাইরাসের এ ধরনের সংক্রমণের হার অন্য ধরনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। বাংলাদেশেও এ ভাইরাসে আক্রান্তের হার দিন দিন বেড়ে চলেছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে সংক্রমণ হার কমলেও সম্প্রতি তা কয়েকগুণ বেড়েছে। নতুন বছরে দেশে শনাক্ত হওয়া ২০ শতাংশ রোগী ওমিক্রন এবং ৮০ শতাংশ ডেলটাসহ অন্যান্য ধরনে আক্রান্ত।

২০২০ সালের শুরুতে যে করোনাভাইরাস মরণব্যাধি হয়ে দেখা দিয়েছিল, আজ তার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে মানুষ করোনার ভ্যাকসিন গ্রহণ করছে। ভ্যাকসিন দেয়ার ফলে মানবদেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে, যা করোনা সংক্রমণের থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা করতে পারবে। যদিও ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকে তবে প্রথম দিকে ভ্যাকসিন গ্রহণে সাধারণ মানুষের অনাগ্রহ থাকলেও বর্তমানে জীবন বাঁচানো ও প্রয়োজনের তাগিদে তারা ভ্যাকসিন নিতে ইচ্ছুক। সরকারি হিসাব মতে, দেশে এখন পর্যন্ত জনসংখ্যার মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষকে দ্বিতীয় ডোজ ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৭৫ শতাংশ মানুষ এখনও করোনার দ্বিতীয় ডোজ টিকা পায়নি। এ বিষয়ে শুধু জনসাধারণের অনীহা নয় ভ্যাকসিনের সংকট, টিকা গ্রহণের এসএমএস যথাসময়ে না পৌঁছানো, অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকায় টিকার জন্য নিবন্ধন করতে না পারা অন্যতম কারণ। অনেকের প্রথম ডোজ গ্রহণ করার দুই মাস থেকে তিন মাস অতিক্রম হয়ে গেছে; তবুও দ্বিতীয় ডোজের এসএমএস পাননি, যার কারণে তারা ভ্যাকসিন দিতে পারছেন না।

টিকা নিবন্ধন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ‘দেশে এক কোটির বেশি মানুষ নিবন্ধন করার পর তাদের ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস। এ অবস্থায় অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা ও বিদেশ ভ্রমণ প্রভৃতির জন্য ভ্যাকসিন দেয়ার ক্ষেত্রেও নিবন্ধনের জটিলতা এবং ধীরগতিসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া কিছু পর্যটন ব্যবসা সংস্থা যাত্রীদের জন্য ভ্যাকসিন নেয়ার সনদ বাধ্যতামূলক করেছে।

যেহেতু এখনও বাংলাদেশে ওমিক্রনের বিস্তার তুলনামূলক কম এবং ডেলটা ভাইরাসের সংক্রমণের সংখ্যা ৮০ শতাংশের ওপরে। তাই সংক্রমণের হার কমাতে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ‘সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যতামূলক’ করার জন্য সরকারকে সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকার করোনার বিস্তার বেড়ে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে জনসমাগমপূর্ণ স্থানে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা এবং করোনার সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করেছে। বাঙালির প্রাণের একুশে বইমেলার আয়োজন দুই সপ্তাহ পিছিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করা হবে। বইমেলা হলো নানা শ্রেণি-পেশার নানা বয়সের মানুষের মিলনমেলা। এটি যেন মহামারি ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না হয় সে জন্য সরকার বইমেলায় প্রবেশকারী সব ক্রেতা-বিক্রেতাদের টিকা সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করেছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় প্রবাসী বাংলাদেশিরা কাজে যোগ দেয়ার জন্য করোনাভাইরাসের দুই ডোজ টিকা গ্রহণের সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। তারা বলছেন, যারা টিকা নিয়েছেন, বা যাদের কভিড পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছে বা যারা খুব সম্প্রতি কভিড সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন তাদের কাছে এমন সনদ থাকলেই কেবল তারা ইইউ দেশগুলোয় প্রবেশের অনুমতি পাবেন। এসব শর্ত মেনে যখন প্রবাসী ও বিদেশগামী মানুষ দ্রুত টিকা গ্রহণ ও সনদ সংগ্রহে ব্যস্ত সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি কুচক্রী মহল ভুয়া সনদপত্র প্রদানের রমরমা ব্যবসা শুরু করেছে।

আমাদের দেশে সামাজিক থেকে রাজনৈতিক পরিবেশের বিভিন্ন অস্থিতিশীলতার কারণে সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে গেছে। জীবন বাঁচানোর মতো কাজেও চলছে জালিয়াতি। এভাবে যদি ভ্যাকসিনের জাল সনদ দেয়া হয় তাহলে অনেক মানুষ ভ্যাকসিনের আওতায় আসবে না, যার ফল ভোগ করবে সাধারণ মানুষ। কভিড সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে উঠে এসেছে এমন চিত্র। যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ১-২ হাজার টাকার বিনিময়ে অনায়াসেই মিলছে কভিড টিকার সনদ এবং ওই হাসপাতালের অসাধু কর্মচারীর বিরুদ্ধে এ কাজের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। শুধু যশোরেই নয়, এমন চিত্র ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও টিকাকেন্দ্রে পাওয়া গেছে। এসব সনদ বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বলে, শুধু নাম এবং কোন তারিখে টিকা হয়েছে বলে লিখতে হবে, সেই তথ্যটুকু তাদের জানাতে হবে। পরবর্তী সময়ে মেসেজ পাঠিয়ে জানায়, ‘আপনাকে কোনো চিন্তা করতে হবে না, এটা আমাদের দায়িত্ব, আমরা অনেককে এমন সার্টিফিকেট দিয়েছি। এভাবে ঘণ্টা কয়েকের বা একদিনের মধ্যে কভিডের ভ্যাকসিন গ্রহণের জাল সনদ তৈরি করে তা টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হচ্ছে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘যারা টিকাদানের মিথ্যা সনদ সংগ্রহ করতে চাইছেন বা ভ্যাকসিনেশন কার্ড বা কভিড-১৯ পরীক্ষার নেগেটিভ সনদ জোগাড় করার চেষ্টা করছেন তাদের এটা জানা খুবই দরকার যে, এভাবে টিকা গ্রহণ না করে সনদ সংগ্রহ করে তারা খুবই বড় ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে এটি অনেক বড় বিপদের কারণ হতে পারে।’

এসব মানুষ যখন বিদেশে ভ্রমণ করবেন অথবা কর্মসংস্থানে যোগ  দেবেন তখন তাদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকতে হবে। বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে খুব সহজেই কভিডে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে।

যারা টিকা গ্রহণের পরও নিবন্ধন সনদ পাননি তারাও এমন বিকল্প পদ্ধতিতে সনদ সংগ্রহ করছেন। এতে করে জাতীয় পরিসংখ্যানে বড় ধরনের গরমিল হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। দেশের সিংহভাগ মানুষকে সরকার করোনা ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচির আওতায় আনার যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তা অনিশ্চিত হয়ে যাবে। সেহেতু সময় থাকতে ওই বিষয়ে সরকারের নজরদারি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা প্রয়োজন; যাতে করে ভুয়া সনদ বাণিজ্য বন্ধ করে মানুষকে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আনা সম্ভব হয়।

শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়