প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

টাকার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করবেন না দয়া করে

একজন বোদ্ধা লোকের কাছে একটি সমস্যার সমাধান চেয়েছিলাম। তিনি উত্তরে বললেন, ‘খাও দাও ফুর্তি করো, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াও।’ আর পারলে বিদেশে চলে যাও। আমি উত্তরে বললাম, স্যার এটা তো কোনো সমাধান হলো না। তিনি বললেন, এটাই বিদ্যমান বাস্তবতা। কেমন? একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি। তার বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব আছে। হিসাব আছে তার ও ছেলের যৌথ নামে। অ্যাকাউন্ট অপারেশন হয় ‘আইদার অর সারভাইভার’ ভিত্তিতে। বহুদিনের সব অ্যাকাউন্ট। নিয়মিত অপারেশন হয়। ব্যাংক যখন যা চায়, সেভাবেই কাগজপত্র দেওয়া হয়। অনিয়মিত কোনো কাজ কোনোদিনই অ্যাকাউন্টে হয়নি। অথচ সম্প্রতি ভদ্রলোক মারা গেলে ব্যাংক ‘অ্যাকাউন্ট অপারেশন’ বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ কী? ব্যাংক তো এটা পারে না। ‘আইদার অর সারভাইভার’ নির্দেশিত অ্যাকাউন্ট ব্যাংকে ব্যাংকে চালু আজ থেকে নয়। এ ধরনের নির্দেশসংবলিত অ্যাকাউন্ট ব্যাংকের একটা শক্ত রীতি। এতে বলা হচ্ছে, দুজনের একজন অ্যাকাউন্ট অপারেশন করবে। একজন মারা গেলে জীবিত ব্যক্তি ওই অ্যাকাউন্ট বিনা বাধায় অপারেট করবে এটা হচ্ছে ব্যাংকিং বিধি। এতে ‘উত্তরাধিকার’ সার্টিফিকেটের কোনো ঝামেলা নেই। সেজন্যই এ ধরনের অ্যাকাউন্ট ব্যাংকিং খাতে বেশ জনপ্রিয়। অথচ দেখা যাচ্ছে ইদানীং হরেদরে এ ধরনের অ্যাকাউন্ট অনেক ব্যাংক বিনা অজুহাতে বন্ধ করে দিচ্ছে একজন মারা গেলে। কেন? বলা হচ্ছে মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইনের কথা। বেশ কড়াকড়ি। রাজনৈতিক ব্যক্তি হলে তো আরও বিপদ। সামান্যদের অ্যাকাউন্টেই কড়াকড়ি। বস্তুত মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইন এখন ব্যাংকিং খাতে ভীতি সঞ্চার করছে। ব্যাংকাররা এ আইনের কোনো ধরনের ব্যত্যয়ের ঝুঁকি নিতে চান না।

টাকা তোলা ও জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বসীমা আছে। লেনদেনের প্রোফাইল (ট্রানজেকশন প্রোফাইল) আছে। কেওয়াইসি (নো ইয়োর কাস্টমার) আছে। ইদানীং আবার একটা ফরম পূরণ করতে বলা হয় যে, একজন অ্যাকাউন্টহোল্ডার আমেরিকার নাগরিক নন, তিনি সেখানকার গ্রিনকার্ড হোল্ডার নন। কয়েক দিন আগে কাগজে পড়লাম, এখন থেকে সব ব্যাংক একই ধরনের হিসাব খোলার ফরম (অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফরম) ব্যবহার করবে। সেখানে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে বলতে হবে, কোন কোন ব্যাংকে কার কত অ্যাকাউন্ট আছে। এ ধরনের নানা সমস্যা নিয়ে, জটিলতা নিয়ে বোদ্ধা লোকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ভদ্রলোক সরকারের প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি। তখন তিনি বলেছিলেন, খাও দাও ফুর্তি করো, পারলে বিদেশ চলে যাও। অর্থাৎ তিনি এসব সমস্যার সমাধান জানেন না। আর তার কথা মানলে বলতে হয়, সঞ্চয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। রোজগার করো, খরচ করো, ভোগ করো। ব্যাংকে টাকা রাখার দরকার নেই। প্রয়োজনে আমেরিকানদের মতো ধার করে হলেও ঘি খাও। ব্যাংকে টাকা রাখা যায় না বলে কি অন্যত্র রাখা যায়? ধরুন শেয়ারবাজারে? না, সেখানেও লেনদেনে কড়াকড়ি। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত লেনদেনের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হয়। সেখানে বড় ধরনের লেনদেন হচ্ছে কি না, হলে কারা করছে, সেই টাকার উৎস কী তার হিসাব দিতে হয়। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও ব্যাংকাররা অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করছেন। সম্প্রতি এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তার ছেলে ব্রিটেন থেকে কিছু টাকা পাঠিয়েছেন। ব্যাংকাররা তাকে জেরার পর জেরা করছেন। ভদ্রলোক বললেন, এর পর থেকে টাকা আনবেন অন্য পন্থায়। সম্ভবত এ কারণেই সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ‘হুন্ডি’র বড় প্রাদুর্ভাব। হুন্ডি আগেও ছিল, ইদানীং আরও বেশি। খবরের কাগজে দেখলাম, ‘বিকাশ’ ব্যবস্থা হুন্ডির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে ‘বিকাশ’ চালু হয়েছে। অভিবাসীরা, প্রবাসীরা তাদের কাছে যায়। কারণ ব্যাংকের ‘হুজ্জতি’ সেখানে নেই। মুহূর্তের মধ্যে বিনা প্রশ্নে পেমেন্ট। তাহলে কী দাঁড়ালো দাঁড়ালো টাকা এখন ভীষণ এক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

টাকা দেখলেই একশ্রেণির লোক মনে করছে, এটা ‘কালো টাকা’, ঘুষের টাকা, এটা সন্ত্রাসের টাকা, অবৈধ পথে অর্জিত টাকা। টাকার প্রতি মানুষের সন্দেহ বাড়ছে। ইতিহাস বিবেচনা করে বললে বলতে হয়, বাঙালি এমনিতেই একটি ‘অ্যান্টি-মানি’ সম্প্রদায়। পুরো ব্রিটিশ আমলে বাঙালিকে দেখা যায় আউল-বাউল-মাইজভাণ্ডারির অনুসারী হিসেবে। সে বলত, ‘টাকা মাটি, মাটি টাকা।’ এটা একটা আপ্তবাক্যে পরিণত হয়। টাকার প্রতি এ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে তাকে দেখা যায় ‘অ্যান্টি-ক্রেডিট’ হিসেবেও। সে ঋণ পছন্দ করে না। ঋণকে সে বিশ্বাস করে না। ‘আজ নগদ কাল বাকি, বাকির নাম ফাঁকি।’ বাঙালি ব্যবসায়ীদের দোকানে দোকানে টাঙানো থাকতো এসব কথা। অথচ চোখের সামনেই দেখা যায় ইউরোপ ও আমেরিকায় ঋণের কত কদর। এমনকি প্রাচীন বাঙালিদের কাছেও ঋণের কদর ছিল। চাণক্য বলে পরিচিত ভারতীয় দার্শনিক বলেছিলেন, ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ, যাবজ্জীবেৎ সূখং জীবেৎ।’ এটি এ অঞ্চলেরই কথা। বাঙালির বিবর্তনে দেখা যাচ্ছে, বাঙালি ধীরে ধীরে ‘অ্যান্টি-মানি’ ও ‘অ্যান্টি-ক্রেডিট’ হয়েছে, যার পূর্ণ বিকাশ ব্রিটিশ আমলে। আশার কথা, সেই চিন্তা-চেতনার সীমাবদ্ধতার বিপরীতে ইদানীং বাঙালিকে দেখা যাচ্ছে টাকার পূজারি হিসেবে। বাঙালি এখন টাকার মুখ দেখেছে। ঋণের কদরও তার কাছে অনেক বেশি। সে এখন ঋণখেলাপি হতেও ভালোবাসে।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গি নামক সমস্যা সারা বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও নানাভাবে আক্রান্ত করছে। বিশ্ব আতঙ্কিত হয়ে সন্ত্রাস দমনের উদ্দেশ্যে জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধ করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করে। আমরাও তার ব্যতিক্রম নই। গৃহীত হয়েছে মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইন। এটা বেশ কড়া একটা আইন। এর ধারা-উপধারা যদি প্রয়োগ হতো এবং মানুষ যদি এর ধারা-উপধারা সম্পর্কে অবহিত থাকতো তাহলে ‘কালো টাকা’ বলে কিছু থাকতো না। বস্তুত এ আইনে অবৈধভাবে অর্জিত সব আয়ই ‘কালো টাকা।’ আবার আয়কর আইনের আশ্রয় নিয়ে কথা বললে, ‘কালো টাকা’ হয় এমন টাকা যা সরকারের কাছে দেওয়া হিসাবে ঘোষিত হয়নি। অর্থাৎ ‘আনট্যাক্সড’ টাকা। কর-বহির্ভূত টাকা নানা ধরনের হতে পারে অবশ্যই। তবে ‘কালো টাকা’ বলতে সাধারণত ‘অঘোষিত টাকাকে’ই ধরা হয়। এ টাকার হিসাব নিতেই মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইন। খুবই ভালো আইন। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ হচ্ছে বিভিন্নভাবে। মনে হয় কেউ কেউ আতিশয্যবশত এমন কাজ করছেন যাতে টাকা রোজগার করা, টাকা রাখা, গচ্ছিত রাখা রীতিমতো একটা ভীতিপ্রদ কাজ হয়ে পড়েছে। এমনিতেই বর্তমানে ব্যাংক তেমন কোনো সুদ দেয় না। দিন দিন সুদের হার কমছে আমানতের ওপর। মূল্যস্ফীতির যে হার, তার চেয়েও কম হচ্ছে আমানতের সুদের হার। তার ওপর হিসাব খোলা, হিসাব অপারেশন, কেওয়াইসি, ট্রানজেকশন প্রোফাইল, বিদেশি নাগরিকত্বের ঘোষণা, ব্যাংকে ব্যাংকে হিসাব রাখার ঘোষণা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাংকে ব্যাংকে যে উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে এবং গ্রাহকদের যেভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে, তাতে মনেই হয় দেশে সঞ্চয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। বস্তুত আমাদের জাতীয় সঞ্চয় স্থবির আজ এক দশক ধরে। এখন অনেকেরই মনে হয়, টাকা না জমিয়ে সব খেয়ে ফেলা দরকার। ভোগ এটাই দরকার। ভবিষ্যতের চিন্তা করার দরকার নেই। ছেলেমেয়ের চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। আতঙ্কের এক পরিবেশে সারা দেশের গ্রাহকরা পড়তে যাচ্ছে। এরই ফাঁকে দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন এ সম্পর্কে নানা খবর ছাপা হচ্ছে। মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রকল্প, কানাডার বেগম পল্লী, দুবাইয়ের খবর থেকে শুরু করে প্রতিদিন এমন সব খবর পাওয়া যাচ্ছে, যাতে মনেই হচ্ছে টাকা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ‘খাও দাও ফুর্তি করো’, এতে না গিয়ে বিদেশে পাচার করাকেই শ্রেয় মনে করছে অনেকে। প্রশ্ন, যেসব দেশে টাকা পাচার হচ্ছে, সেখানে কি মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইন নেই? সিঙ্গাপুরে কি এ আইন নেই? আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় কি আইনটি নেই? যদি থাকে, তাহলে সারা বিশ্ব থেকে ওইসব দেশে টাকা যাচ্ছে কীভাবে? তাহলে কি এ আইনটি করাই হয়েছে গরিব দেশ থেকে ওইসব দেশে টাকা পাচারের জন্য? অথচ বলা হচ্ছে জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধের কথা। বাস্তবে কী দেখছি আমরা? এসব হিসাবে নেওয়া দরকার। জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে। অবৈধ টাকা রোধ করতে হবে। দুর্নীতির টাকা দমন করতে হবে। কিন্তু এসব করতে গিয়ে যদি পুরো ‘সিস্টেম’ কলাপ্স হওয়ার উপক্রম হয়, তাহলে তা হবে আত্মঘাতী ব্যাপার। কড়াকড়ি করতে গিয়ে, আইন বাস্তবায়নে অতিসক্রিয়তা দেখাতে গিয়ে যদি মানুষের সঞ্চয়ের অভ্যাস নষ্ট হয়, যদি মানুষ অতিরিক্ত ভোগে ব্যাপৃত হয়, যদি বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ টাকা পাচারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তো উন্নয়নের মূল কাজই ব্যাহত হবে। তা-ই নয় কি?

সবশেষে প্রশ্ন, আবার নিবন্ধের শুরুতে তোলা প্রশ্নই যৌথ হিসাব, পিতা-পুত্রের। ‘আইদার অর সারভাইভার’ নির্দেশনামাসংবলিত। একজনের মৃত্যুতে উত্তরাধিকার সার্টিফিকেট লাগবে কেন? কেন মৃত্যুতে হিসাব বন্ধ করা হবে? এর সঙ্গে জরুরি প্রশ্ন আরও একটি : ‘মনোনয়নের’ ব্যবস্থা আছে হিসাবে। এতে উত্তরাধিকার সার্টিফিকেট লাগার কোনো কারণ নেই। ব্যাংক কোম্পানি অ্যাক্টের সুস্পষ্ট বিধান এটি। তাহলে ব্যাংক কেন উত্তরাধিকার সার্টিফিকেট চাইবে, যেখানে অ্যাকাউন্টে পরিষ্কার ‘নমিনেশন’ দেওয়া আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বলব আরও সাবধানে আইন বাস্তবায়ন করতে। আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পরিপূর্ণ করতে গিয়ে এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যাতে টাকার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। টাকা ব্যাংকে আসুক, টাকা হিসাবের মধ্যে এলে ক্ষতি কী? টাকাকে ঝেঁটিয়ে ব্যাংক থেকে বিদায় করলে, ‘খাও দাও ফুর্তি কর’ উৎসাহিত করলে দেশের লাভ কী?

 

অর্থনীতি বিষয়ের কলামিস্ট

সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়