প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

টাকার মান অবমূল্যায়নের সুপারিশ সিপিডির

 

নিজস্ব প্রতিবেদক: টাকার অঙ্কে রফতানি আয়ের পরিমাণ বাড়াতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমানোর সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এক ডলারের বিপরীতে বর্তমানে টাকার যে বিনিময় হার রয়েছে, তা তিন-চার টাকা বাড়লে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন-ভাতাও বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করে সংস্থাটি। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম ও সঞ্চয়পত্রের সুদহার কামানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ তুলে ধরে এমন পরামর্শ দেয় সিপিডি। মূল উপস্থাপনা পেশ করেন সিপিডির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান।

এ সময় সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। টাকার মান কিছুটা কমালে রফতানি আয় টাকার অংকে বাড়বে। ফলে সেখান থেকে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমাতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সীমাও বেঁধে দিতে হবে। গেলো বছর ছিল অর্থনীতির জন্য সফলতম বছরের একটি। কিন্তু রেমিট্যান্স, রফতানি আয় ও কৃষিক্ষেত্রে তুলনামূলক কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যাংকিং খাত ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ পর্যুদস্ত করেছে। সরকারি বিনিয়োগের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দেশে এক কিলোমিটার রাস্তা করতে যা খরচ হয়, তা বিশ্বের অন্য কোথাও হয় না। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের গুণগত মানোন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন।

দেবপ্রিয় আরও বলেন, চলতি অর্থবছরে বাজেটে বড় ধরনের সংশোধনীর প্রয়োজন হবে। বাজেটে এমন কোনো অসম্ভব প্রাক্কলন করা উচিত নয়, যা অর্জিত হবে না। এ ধরনের প্রাক্কলন অর্জিত না হওয়ার ফলে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত হয়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত অর্থবছর সিপিডি বলেছিল ৪০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় কম হবে, প্রকৃত অবস্থা হলো ৩৮ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছিল।

মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত অর্থবছরে আর্থিক খাতে সবচেয়ে সমস্যাগ্রস্ত ছিল ব্যাংকিং খাত। এই খাতে বিপুল পরিমাণ অলস তারল্য জমা হওয়ার পাশাপাশি বেড়েছে কুঋণ, হয়েছে বড় বড় কেলেঙ্কারি। আগেরগুলোর বিচার হলে ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের কেলেঙ্কারি হতো না। এ অবস্থায় আগামী দিনও ব্যাংকিং খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। জ্বালানি তেলের দাম কমানো হলেও এর সুফল সেভাবে সাধারণ মানুষ পায়নি। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও শহরাঞ্চলে বাড়িভাড়া, জ্বালানি খরচ বেড়েছে আট থেকে ৯ শতাংশ। গত কয়েক বছরের তুলনায় বিদেশে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার এখন অনেকটা ভালো। ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানও বেড়েছে; কিন্তু সে অনুপাতে বাড়েনি রেমিট্যান্স। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অপব্যবহারের কারণে বেড়েছে হুন্ডি ব্যবসা।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ছে; কিন্তু কমছে রেমিট্যান্স। এর প্রধান কারণ টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে না এসে হুন্ডির মাধ্যমে আসছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের ৫০ শতাংশ টাকা দেশে আসছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে হুন্ডির মাধ্যমে। তিনি আরও বলেন, তেলের দাম বিশ্ববাজারে কমেছে। এর ফলেও রেমিট্যান্সে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কারণ সৌদি আরব থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রচুর বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান বেড়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫০ লাখ হতদরিদ্রকে ১০ টাকা দরে চাল দিয়েছে। কিন্তু জনপ্রতি ৯০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও পেয়েছে ৭৯ কেজি করে। অর্থাৎ প্রতি উপকারভোগী ১১ কেজি চাল কম পেয়েছেন। এ ধরনের কর্মসূচি পালনের পর বাজারে চালের দাম কমে আসবে বলে ধারণা করা হলেও সেটি হয়নি। এ সময় সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমরা মাঠ পর্যায়ে দেখেছি কাউকে ১০০ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে, আবার কাউকে ৭০ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ১০ টাকার চাল দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে চালুর প্রস্তাব করেছে সিপিডি।