নিজস্ব প্রতিবেদক : একমি পেস্টিসাইড লিমিটেডের শেয়ার নিয়েও তার বিপরীতে কোনো অর্থ প্রদান করেননি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মতিউর রহমান। ছাগলকাণ্ডে আলোচনায় আসা এই সাবেক কর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তে এমন তথ্য ওঠে এসেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মতিউর রহমান ছাড়াও একমি পেস্টিসাইডের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক, কোম্পানি সচিব, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)-সহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান একই ধরনের অনিয়মে জড়িত বলে তদন্তে ধরা পড়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি দুদকে পাঠানো হচ্ছে।
বিএসইসির ৯৭৩তম কমিশন সভায় গতকাল বুধবার এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্থার চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। পরে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।
বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, একমি পেস্টিসাইডের চেয়ারম্যান শান্তা সিনহা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা-উর-রহমান সিনহা, পরিচালক আহসান হাবিব সিনহা, পরিচালক কে এম হেলুয়ার, কোম্পানি সচিব সবুজ কুমার ঘোষ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা সেলিম রেজা ছাড়াও প্লেসমেন্ট হোল্ডার মো. আফজাল হোসেন, এসকে ট্রিমস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, মো. মতিউর রহমান, বিক্রমপুর পটেটো ফ্লেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, তফাজ্জল হোসেন ফরহাদ, জাভেদ এ মতিন, বেঙ্গল অ্যাসেটস হোল্ডিংস, চিটাগাং পেস্টিসাইডস অ্যান্ড ফিশারিজ, হেরিটেজ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট, এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট, আঞ্জ–মান আরা বেগম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেখ মোহাম্মদ সারোয়ার, তৌহিদা আক্তার, মো. রুহুল আজাদ ও রানু ইসলাম শেয়ার গ্রহণ করলেও তার বিপরীতে কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি।
বিএসইসির মুখপাত্র জানান, একমি পেস্টিসাইডের ইস্যু ম্যানেজার শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড প্রসপেক্টাসে অসত্য বা অসঙ্গত তথ্য জমা দিয়ে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন সনদ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তাছাড়া প্রি-আইপিও সময়ে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সঠিকভাবে না দেখানোর অভিযোগে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং-এর বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে আইপিও থেকে উত্তোলিত অর্থ ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য আর্থিক প্রতিবেদনে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত না করায় নিরীক্ষক শফিক বসাক অ্যান্ড কোং-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলে (এফআরসি) পাঠানো হবে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ম বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত আইপিওতে স্বচ্ছতা ও আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভরসা করে মূলধন বিনিয়োগ করেন। কিন্তু কোনো কোম্পানি যদি শেয়ারের বিপরীতে টাকা না নেয় বা প্রকৃত আর্থিক তথ্য গোপন করে, তাহলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ঘটনার পর থেকে পুঁজিবাজারে একমি পেস্টিসাইডের লেনদেনে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এবং অনেকেই শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তদন্ত ও দুদকের পদক্ষেপের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে কোম্পানির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম।
বিএসইসি ইতোমধ্যেই অনিয়ম প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কঠোর যাচাই-বাছাই, নিরীক্ষকদের ওপর বাড়তি নজরদারি এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া মাত্র দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ।
এক বিনিয়োগকারীর মতে, একমি পেস্টিসাইডের ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। মতিউর রহমানসহ যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বাজারে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে। বিনিয়োগকারীরাও আশাবাদী, এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি কমে আসবে।
গত বছর কোরবানির জন্য রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাদিক অ্যাগ্রো থেকে ইফাত নামের এক তরুণের ১৫ লাখ টাকা দামে ছাগল কেনার ফেসবুক পোস্ট ঘিরে মতিউর রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।
ছাগলকাণ্ডের আলোচনার মধ্যে মতিউর রহমানকে এনবিআর থেকে সরানো হয়। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি মতিউর রহমান এবং তার স্ত্রী নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লায়লা কানিজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post