নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : টানা পাঁচ দিনের কর্মবিরতি ও ধর্মঘট দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। আমদানি-রপ্তানি বন্ধ, কনটেইনার জট তৈরি এবং বহির্নোঙরে আটকে থাকা ১৪২টি জাহাজের দৈর্ঘ্যমান সংকট আসন্ন রমজানের পটভূমিতে অর্থনীতির জন্য বিষম চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শ্রমিক নেতাদের দাবি অনুযায়ী, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং কর্মকর্তাদের বদলির বিরুদ্ধে আন্দোলনের গতি দিনে দিনে তীব্রতর হচ্ছে, কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধানের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
দিনে আট ঘণ্টার কর্মবিরতি থেকে শুরু হয়ে এখন অনির্দিষ্টকালীন কর্মসূচিতে রূপ নিয়েছে আন্দোলন। ফলে বিভিন্ন জেটি ও ডিপোতে সাড়ে ৫২ হাজার কনটেইনার আটকে পড়েছে। যেখানে স্বাভাবিকভাবে ২৪ ঘণ্টা কন্টেইনার ওঠানামার ব্যস্ততা দেখা দিত, সেখানে এখন সুনসান নির্বাচনী নীরবতা। ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম তিন দিনে ১৩ হাজার ৩৯১টি কনটেইনার হ্যান্ডল হয়েছে, কিন্তু ফেব্রুয়ারির প্রথম তিন দিনে এই সংখ্যা নেমে এসেছে ১০ হাজার। ২৫১টিতে প্রায় তিন হাজার। ১৪০টি কম। এই হ্রাসের ফলে বন্দরের রাজস্ব হ্রাস পাচ্ছে এবং দৈনিক ক্ষতি শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
টানা কর্মবিরতিতে বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হওয়ায় অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্লেষকরা বলছে, প্রথম তিন দিনেই শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, যা এখন আরও বেড়েছে। কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৪০ শতাংশ কমে গেছে, শিপিং লাইনগুলোয় কয়েকশ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে ডেমারেজ, স্টোরেজ চার্জ ও বিলম্বিত ফ্রেইটের কারণে। বহির্নোঙরে আটকে থাকা ১৪২টি জাহাজের মধ্যে ১০টি কনটেইনার জাহাজ ও তিনটি অন্য জাহাজ জেটিতে আটকে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি প্রধান টার্মিনালে এখন নীরবতা বিরাজ করছে। সাধারণত ব্যস্ততায় কোলাহলময় থাকে এই জায়গাগুলো, কিন্তু এখন সেখানে স্তূপীকৃত কনটেইনারের পাহাড়। টানা পাঁচ দিন কোনো কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়নি, আমদানি-রপ্তানি থেমে আছে। সাড়ে ৫২ হাজার কনটেইনার জটের কারণে ডিপো ও জেটি অচল।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। পোশাক খাতসহ রপ্তানিশিল্প নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হলে জরিমানা, অতিরিক্ত খরচ এবং ক্রেতাদের অসন্তোষের সম্মুখীন হবে।
রমজান সন্নিকটে। আমদানিকারকরা বলছেন, এখনই কনটেইনার জট না ছাড়লে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এমনিতেই চড়া, তার ওপর বন্দরের এই অচল দশা আগুনে ঘি ঢালছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তবে রমজানে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে।
আন্দোলনের সূত্রপাত, এনসিটি টার্মিনালটি বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে লিজ দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা থেকে। শ্রমিক নেতারা এটিকে ‘লুটপাটের বন্দোবস্ত’ বলে অভিহিত করে বলছেন, এতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন জানান, ‘বন্দরের কিছু কর্মকর্তা এবং উপদেষ্টা সাখাওয়াত সাহেবসহ এক সিন্ডিকেট এই এনসিটি’কে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে তুলে দিতে চায়। আমরা সব শ্রমিক-কর্মচারী এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছি। ফরেন শিপের মুভমেন্ট আমরা বন্ধ করে দিয়েছি।’
শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক এসকে খোদা তেতনও একই রকম অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে নিজস্ব অপারেটর ও শ্রমিক দিয়ে এনসিটি চলছে। তাহলে তড়িঘড়ি করে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কেন দেওয়া হবে? এর কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
শ্রমিকনেতারা আরও জানান, কর্মকর্তাদের বদলি আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে দমননীতির কারণেই আন্দোলন টানা কর্মবিরতির রূপ নিয়েছে। সমস্যা সমাধানে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে।
অচলাবস্থা নিরসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সমঝোতার উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বন্দর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বন্দর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (বন্দর) আমিরুল ইসলাম জানান, ‘বন্দর এলাকার নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছি। এখানে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হতে দেওয়া হবে না।’
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post