টানেল নির্মাণ হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিট হবে: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম টানেল হচ্ছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে। এ টানেলের মাধ্যমে চট্টগ্রামের গোটা অঞ্চল সমৃদ্ধশালী হবে। জিডিপিতে আরও অনেক অর্জন যোগ হবে। প্রবৃদ্ধিকে ডাবল ডিজিটে নিয়ে যাব। আরেকটি কাজ করে দিচ্ছি লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। চট্টগ্রামে বিশাল আকারে অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। শহরে যানজট কমানোর জন্য বাইপাস করে দিচ্ছি। এসব কাজ হলে চট্টগ্রামে যোগাযোগ,
ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়ন হবে। এটি পোর্ট সিটি। ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু এ জায়গা থেকে হবে।
গতকাল দুপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের বোরিং কার্যক্রম এবং লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলার পাইলিং প্রকল্পের ফলক উšে§াচন উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই পদ্মা সেতু সম্পর্কে জানেন। আমাদের যোগাযোগমন্ত্রী পদ্মা সেতুটা আমার নামে করতে চেয়েছিলেন, আমি সেটা নাকচ করে দিয়েছি। তার কারণ হলো এ সেতুর নির্মাণ নিয়ে আমরা ভিজিবিলিটি স্টাডি করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলাম ২০০১ সালে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি এই সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। তারা অ্যালাইনমেন্ট দিয়ে বলে যে এটা এখানে হবে না, এটা অন্য জায়গায় হবে।
২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর আমি সেতুটা নির্মাণের উদ্যোগ নিই। তখন সবাই খুব উৎসাহ দেখায়। বিশ্বব্যাংক, আইডিবিসহ প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠান আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেখিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। এত উৎসাহ দিয়ে মাঝামাঝি সময়ে এসে তারা একটি অভিযোগ আনল, এখানে দুর্নীতি হয়েছে। তখনও কোনো টাকা ছাড় হয়নি, কিছু নাই, দুর্নীতিটা হলো কোথায়? যখন এ প্রশ্ন করা হলো, তখন উত্তর দিতে পারে না। আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, সেটা প্রমাণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আপনারা শুনলে একটু অবাক হবেন, সাদা কাগজে একটা চিরকুট। এখান থেকে অমুক পাবে এত পারসেন্ট, অমুক এত পারসেন্ট পাবে, এভাবে নানা অপপ্রচার শুরু হয়। তাদের কতগুলো নির্বাহী কর্মকর্তা বাংলাদেশে আসত, তারা একটা অফিসে বসে বসে অপপ্রচার চালাত। আমি নাকি বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্ত লোক, আমার নামে বলত আমার পুরো পরিবার নাকি দুর্নীতিতে জড়িত। পদ্মা সেতুর টাকা নাকি আমরা লুটে খেয়েছি। তারা টাকাটা দিল কোথায় যে, লুটে খেল?
আমি এখানে থেমে যাইনি। আমি একটি চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম, তোমাদের এটা প্রমাণ করতে হবে। তোমাদের টাকা নেব না, যদি পারি নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করব। আমাদের পক্ষ থেকে মসিউর রহমানকে বললাম, চিঠি লেখেন। দুর্নীতির প্রমাণ দিতে হবে। বারবার চিঠি লেখার পরও তারা উত্তর দিতে পারে নাই।
পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্রে দেশের দুই পত্রিকা সম্পাদক ও এক নোবেল বিজয়ীর সম্পৃক্তা আছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মানুষরাই আমাদের বদনাম করে। দেশের দুইটা পত্রিকার এডিটর আছেন। সঙ্গে আপনাদের চট্টগ্রামের সন্তান আছে সুদের ব্যবসা করে। জনগণের টাকা খেয়ে সুদখোর আর এডিটর মিলে তারা আমাদের বিরুদ্ধে সমানে অপপ্রচার করে। এ জন্য পদ্মা সেতুকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। আপনারা জানেন কানাডার কোর্টে মামলা হয়। সেই মামলায় এখানে কোনো দুর্নীতি হয়েছে এমন প্রমাণ বিশ্বব্যাংক দেখাতে পারে নাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকের ধারণা ছিল বিশ্বব্যাংক ছাড়া পদ্মা সেতু করা সম্ভব না। এরকম একটা ধারণা নিয়ে তারা চলত। আর আমার ধারণা ছিল, আমরা পারব। আমাদের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও অনেক কথা হয়েছে এটা নিয়ে। তারা বলত ওকে অ্যারেস্ট করো আমরা টাকা দেব, তমুককে অ্যারেস্ট করো আমরা টাকা দেব। আমি বললাম না, এভাবে হবে না।
পদ্মা সেতু নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা নিয়ে যে কত ঝগড়া করতে হয়েছে, আর কত যে মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে সেটা আপনারা বুঝবেন না। যাই হোক আল্লাহর রহমতে আমি মনে করি এটা অবশ্যই আল্লাহর রহমত। সে কারণেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করতে পেরেছি। আজকে পদ্মা সেতু দৃশ্যমান। এই সেতু নিয়ে যখন এত কিছু হয়ে গেছে, এটা পদ্মা নামেই থাকবে। এটার সঙ্গে আর কোনো নাম যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন নাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক সময় যখন আমরা বাইরে যেতাম, শুনতাম বাংলাদেশ মানে দুর্ভিক্ষের দেশ। বাংলাদেশ মানে ঘূর্ণিঝড়ের দেশ, জলোচ্ছ্বাসের দেশ। বাংলাদেশ মানেই একটা নেগেটিভ কথা। সেটা খুব কষ্ট লাগত। সেই দেশকে এমনভাবে গড়ে তুলব, যেন সারা বিশ্ব বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে এটাই আমার চাওয়া। আমি কোনো নাম চাই না, কোনো ধন-সম্পদও চাই না, কিচ্ছু চাই না। বাংলাদেশের জনগণ মাথা উঁচু করে বিশ্বে চলবে, এটাই আমার চাওয়া। সে কারণেই সবসময় চেষ্টা করি নতুন কিছু করার।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ নামে শতবর্ষের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জš§শতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। মুজিব বর্ষ ঘোষণা করেছি। ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষ। আমাদের প্রজš§ উন্নত, সমৃদ্ধশালী দেশে তা উদযাপন করবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়কের চিন্তাভাবনা চলছে। কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের কাজ শেষ করার পেছনে শেখ হাসিনার অবদান রয়েছে। সড়কটি না হলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে দুর্দশায় পড়তাম। কক্সবাজার দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে বিনোদনের ব্যবস্থা করা হবে। আগামী ঈদের আগে তিনটি চার লেনের সেতু দৃশ্যমান হবে। ভবিষ্যতে চট্টগ্রামে মেট্রোরেল করার চিন্তাভাবনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
সুধী সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী স ম রেজাউল করিম, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে সচিব সাজ্জাদুল হাসান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আমিনুল ইসলাম, বিপ্লব বড়–য়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বাংলাদেশের প্রথম সড়ক সুড়ঙ্গপথ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’-এর খননকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। টানেল নির্মাণে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে চীন। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর এ টানেলের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট। এ টানেল আনোয়ারা উপজেলাকে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে যুক্ত করবে। ১০ কিলোমিটার সড়ক করা গেলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার চার লেন সড়কের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে।
এছাড়া বন্দরনগরীর প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ১৬ কিলোমিটার।

সর্বশেষ..