প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

টিএসসির প্রজ্ঞাপন ও আমাদের নিরাপত্তা দর্শন

নাজিউল ইসলাম শোভন: বায়োলজিক্যাল ক্লক বলে একটা ব্যাপার আছে। প্রাণিজগৎ এর প্রতিটা প্রাণিই নিজস্ব একটা রুটিন মেইন্টেইন করে। পেচা বা বাদুর যেমন রাতের বেলা ঘুরে বেড়ায়। মানুষ বা ভেড়া তেমনি দিনের বেলা বিচরণ করে। আবার আরমাডিলো দিনের ২২ ঘন্টা ঘুমায়! একেক প্রাণির একেক রকম অভ্যাস এর পিছে কিছু কারণ আছে। পেচা সূযের্র আলো সহ্য করতে পারে না আবার বাদুর নিজের জন্য ঝঞ্ঝাটবিহীন আকাশ খোজে যে জন্য তার রাতে ঘোরাটাই স্বস্তিদায়ক। মানুষেরও ‘নটা পাচটা অফিস আউয়ার’ এর পিছনে ঐ বায়োলজিক্যাল ক্লকটাই দায়ী। প্রশ্ন হচ্ছে সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা পাচটা কেন? কেন রাত নয়টা থেকে ভোর পাচটা নয়। খুব সহজ উত্তর, আলো। সূর্যমামা সকাল সকাল আমাদের বাইরে নিয়ে যায়, আবার রাতে আমাদের ঘরে ঢোকার পথ দেখিয়ে নিজে ঘুমুতে যায়। মানুষের কাজের জন্য আলোর প্রয়োজনীয়তা অনেক। একইসাথে যেহেতু মানুষ এর বিশ্রাম এর প্রয়োজন আছে তাই রাতের সময়টা ঘুমানোর। এইজন্যেই ছোটবেলায় কবিতা শেখানো হয়, ‘সকাল সকাল ঘুমায় যারা, সকাল সকাল ওঠে যারা, জ্ঞানী গুণী হয় তারা।’ সমস্যা হচ্ছে সকাল সকাল না উঠলেও আসলে জ্ঞানীগুণী হওয়া যায়। ইন ফ্যাক্ট অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষ এর রাতের বেলা সাধনার কথা আমরা জানতে পারি। বিদ্যাসাগরের ল্যাম্পপোস্ট এর আলোয় পড়ার গল্পও আমাদের অজানা নয়। আসলে জ্ঞানীগুণী হওয়ার জন্য সাধনাটাই মুখ্য। সাধনার সময়টা না।

ঘটনা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে কিছুদিন আগে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে যে রাত ৮ টার পরে টিএসসিতে কোন মেয়ে অবস্থান করতে পারবে না। এতে করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে আলোচনা-সমালোচনা আর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এ। যেখানে একদল প্রগতিশীলতা, নারীবাদের দোহাই দিয়ে এই প্রজ্ঞাপন ধুয়ে দিচ্ছে। আরেকদল নিরাপত্তার খাতিরে ব্যাপারটিকে যৌক্তিক হিসেবে দেখাতে চাচ্ছে। এবং তৃতীয় আরেকটি দল বেশ রসিয়ে গালি দিচ্ছে প্রথম পক্ষকে।

ঘটনাতে যে বিষয়গুলো লক্ষণীয়। ১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসিতে ছাত্রছাত্রীদের অথবা অন্য কাউকে(!) নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। ২. রাত ৮টার পরে প্রশাসন ছাত্রীদের হলমুখো করে ফেলতে চায়। ইন ফ্যাক্ট ঢাবির ছাত্রী হলগুলোতে রাত ৯.৩০ এর পর মেয়েদের ঢোকার সুযোগ নেই। ৩. সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে এই বিষয়গুলোতে ঢাবির ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় অংশের সম্মতি আছে। ৪. রাত এর সময়টাকে সমাজ একটা নেতিবাচক অনিরাপদ সময় হিসেবে বিবেচনা করে।

এই প্রতিটা বিষয় অনেকগুলো কারণে প্রচন্ড হতাশাজনক। প্রথমত প্রামাণ্য বিষয় প্রজ্ঞাপন এর ডিসিশনটা ভুল। কেননা, আলোর জন্য দিনকেন্দ্রিক হয়ে তৈরি হওয়া বায়োলজিকাল ক্লক কে আমরা এখন যে কোন সময় চ্যালেঞ্জ করতে পারি। কেননা আমাদের এখন ইলেকট্রিসিটি আছে। আমরা চাইলে রাতকেও এখন আলোকিত করে রাখতে পারি। একইসাথে এটাও মাথায় রাখা উচিৎ পিক আওয়ার এ আমাদের প্রচুর কাজের সময় নষ্ট হচ্ছে ট্রাফিক জ্যাম ইত্যাদির কারণে। যদি আমাদের কাজের সময়কে দুইভাগে ভাগ করে নেয়া যায় তাহলে আমাদের ওয়ার্কিং আওয়ার এর অপচয় কমে যাবে সাথে সাথে প্রোডাক্টিভ সময় বাড়বে। ঢাকার যে সিচুয়েশন তাতে করে হয়তো ১০-১৫ বছর পরে অনেক উৎপাদনযোগ্য সেক্টরেও রাতের শিফট চালু হয়ে যেতে পারে। এই বন্টনটা শুরু করা উচিৎ কোন না কোন প্রগতিশীল বা প্রগতিকামী প্রতিষ্ঠান এর। এমন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক উল্টোমুখি আচরণ সত্যি হতাশাজনক।

দ্বিতীয়ত রাতের সময়টা খারাপ। ঐ সময়টাতে চুরি ছিনতাই হবে এরকম একটা মাইন্ড সেটআপ ম্যাস পিপল এর আছে। ভাবটা এমন যে সারাদিন এর সময়টা সাধারণ চাকরিজীবী মানুষের আর রাতের সময়টা চোর-ডাকাতের। অথচ পশ্চিমে উন্নত দেশগুলোতে রাতের বেলা অপরাধের রেট অনেক কম। কারণ সেখানে রাতের বেলাও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টাটা অনেক বেশি। তার একটা বেসিক কারণ হল পশ্চিমে রাতের বেলার সময়টা ক্রিমিনালদের দিয়ে দেয়া হয়নি। প্রজ্ঞাপনটা সেই কাজই করে। যার পরোক্ষ ভুমিকায় রাতে ক্যাম্পাসের এরিয়াতে মাদক সেবন অত্যন্ত বেড়ে যায়। একইসাথে আরেকটা বার্তা এখানে প্রচারিত হয় যে রাত এর সময়টা খারাপ। ফলে রাতে বের হওয়া ছাত্রদের খারাপ কাজ করার প্রবণতা বাড়বে। বিষয়টা কিছুটা ফুটবল মাঠে বা মাঠের পাশে দিয়ে হাটার সময় চলমান খেলার দিকে আগ্রহী হয়ে ওঠার মতো।

-তৃতীয়ত প্রজ্ঞাপনটা টিএসসির ভাবমূতির্র জন্য খারাপ। রাত ৮টার পরে মেয়েদের টিএসসিতে থাকতে না দেয়ার কি কারণ থাকতে পারে সেটা যে কেউ ভাববে। এবং যেহেতু নিষেধাজ্ঞা আছে তাতে করে মানুষের নেতিবাচক জাজমেন্ট আসাটা স্বাভাবিক। যেটা ধীরে ধীরে টিএসসির দিকে চলে যাবে। অনেক মানুষ ভাবতে শুরু করবে টিএসসি জায়গাটায় খারাপ।

এছাড়া নিরাপত্তা দিতে না পারার গ্লানি ঢাবির প্রক্টরিয়াল বডিকে নিতে হবে। জেন্ডার ইকুয়ালিটির প্রশ্নে এখানে কোন উত্তর ঢাবি প্রশাসন দিতে পারবে বলে মনে হয় না। সবথেকে হতাশাজনক ব্যাপার হল ফেসবুকে ঢাবি ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় অংশের রেস্পন্স। রাতের বেলা টিএসসি থেকে কেউ রেইপ হতে চাই কিনা এধরনের প্রশ্ন প্রমাণ করে ভিক্টিম ব্লেইমিং এর চর্চা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড এও বিদ্যমান। প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এহেন আচরণ শংকা তৈরি করে দেশের সকল প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীর মনে, শংকা তৈরি করে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

লেখক: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।