মত-বিশ্লেষণ

টিকটকের ভয়াবহতা হুমকিতে উঠতি বয়সীরা

‘এই মনে করেন ভাল্লাগে, খুশিতে ঠ্যালায়, ঘুরতে’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন অথচ এই বাক্যটি শুনেননি এমন লোক বোধহয় খোঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক নির্বাচনে ভোট দিতে আসা এক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করেন কেন ভোট দিতে এলেন? উত্তরে সে বলেছিল এই মনে করেন ভাল্লাগে, খুশিতে ঠ্যালায়, ঘুরতে।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের রিপোর্টের এই অংশকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে পুনরায় নির্মাণ করে চীনা মিউজিক্যাল ডাবিং অ্যাপ টিকটকে আপলোড করেন এদেশেরই দুই তরুণী। শখের বশে বানানো ভিডিওটি আপলোড করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায়। টিকটিকে ভাইরাল হওয়া এটাই বাংলাদেশের প্রথম কোনো ভিডিও। এরকম হাজারো উদাহরণ আছে এদেশে আসা চায়নিজ অ্যাপটিকে ঘিরে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন টিকটক নামটা বেশ জনপ্রিয়। এটি এমন একটি অ্যাপ, যার দ্বারা খুব কম দিনেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা যায়। এমনকি স্বল্পবিস্তর পরিচিতি হয়ে গেলে টাকা রোজগারের সহজ মাধ্যমও এটি। কিন্তু এ মজার অ্যাপই ভয়ংকর ঘটনা ডেকে আনে টিকটক ব্যবহারকারীদের কাছে। বর্তমানে অপব্যবহার হওয়া ছোট ভিডিও তৈরির এই অ্যাপ তরুণ-তরুণীদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

টিকটক। আক্ষরিক অর্থে যেটিকে ‘গলা কম্পন’ কিংবা ছোট ভিডিও তৈরির প্ল্যাটফর্ম বলা হয়। অল্প বয়সী তরুণ তরুণীর পছন্দের একটি বিনোদনমূলক অ্যাপ। বর্তমানে যেটি এশিয়ার নেতৃস্থানীয় ছোট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বড় সংগীত ভিডিও সম্প্রদায় হিসেবে নিজের জায়গাটি পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  এ বছরের  জুনের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন ভারতের মানুষ গড়ে ৩৮ মিনিট টিকটকে সময় কাটান। সময়ের কিছুটা তারতম্য হলেও বাংলাদেশের অবস্থা মোটামুটি একই ধরনের। আমাদের প্রতিদিনের বড় একটা অংশ নিয়ে নিচ্ছে এই টিকটক।

বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে এলেও বর্তমানে এটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত কোনো ভিডিও বা অডিও এর কিছু অংশ ব্যঙ্গভাবে বক্তব্য বা গানের তালে অভিনয়ের মাধ্যমে কারও সামনে উপস্থাপন করাই হচ্ছে টিকটক। ডাবিং করে তৈরি করা টিকটকের ভিডিওগুলো ১৫ সেকেন্ডের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। অল্প সময় হলেও দর্শকদের এটি ব্যাপকভাবে বিনোদিত করতে সক্ষম হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই  জনপ্রিয় কোনো ব্যক্তি বা ভাইরাল হওয়া ভিডিও, অডিও’র কিছু অংশ কেটে টিকটক ভিডিও তৈরি করা হয়। পুরো বিষয় আপলোড না করে শুধু ব্যঙ্গাত্মক ও আকর্ষণীয় জায়গাগুলো শুনানোর বা দেখানোর ফলে দেশের জনপ্রিয় ব্যক্তিদের সম্পর্কে মানুষের ভেতর ভুল ধারণার জš§ হচ্ছে। যার ফলে  মারাত্মকভাবে তাদের সম্মান হানি ঘটছে। যেটির প্রভাবে সামাজিকভাবেও তাদের অনেক বিরূপ মন্তব্যের শিকার হতে দেখা যায়। প্রতিটা বিষয়েরই ভালো ও খারাপ দিক আছে। সমস্যা হচ্ছে ভালো দিকগুলো আমরা নিচ্ছি না। মাথাটা কেটে না ফেলে মাথাব্যথা কীভাবে ঠিক করা যায় সে প্রক্রিয়ায় যাওয়া উচিত। নিয়ম মেনে চলে টিকটকে মজা করে হাসিখুশি থাকলে তো কোনো সমস্যা নেই।

বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে চললেও বর্তমানে অ্যাপটি খুবই বাজেভাবে ব্যবহার হচ্ছে। যেভাবে ভিডিওগুলো দেয়া হচ্ছে দেখে লজ্জা লাগে। উঠতি বয়সীরা আপত্তিকর ভিডিও দিচ্ছে। অপু, হƒদয়সহ অসংখ্য কিশোর-তরুণ বিপথগামী তৈরি হচ্ছে। তাদের বেপরোয়া আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, এদেশের সচেতন সমাজ। তারপরও কিছুতেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, টিকটকের এই আগ্রাসন। এ অবস্থায় অনেকেই অ্যাপটি বন্ধ করার জন্য বলেছেন। সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার আশায় দেশের উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা অ্যাপটির মাধ্যমে বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন। সামাজিক আচরণ কিংবা শৃঙ্খলা ভুলে অশালীনতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ছেন। সঙ্গে জনসমাগমের জায়গা, আবাসিক এলাকা কিংবা রাস্তার মধ্যে এগুলোর শুটিং করার ফলে মানুষকে ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া বিষয়টি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেকেই  জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এর শুটিং করে থাকেন। সুরক্ষা যন্ত্রপাতি কিংবা অভিজ্ঞতা না থাকার দরুন প্রায়ই যেটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়ে  দিচ্ছি। গত বছর টিকটিকের শুটিং করতে ব্রিজ থেকে লাফ দিতে গিয়ে সিলেটে এক যুবক মারা যান। এছাড়া অভিনয়ের নামে অনেক অশালীনতা এর ভেতরে ডুকে যাচ্ছে। যেগুলো দেখে অনেকেই এগুলোতে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছেন। ফলে তাদের সামাজিক আদব কায়দা কিংবা ইতিবাচক মানসিকতাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের যার অনাকাক্সিক্ষত প্রভাব পড়ছে। যে কারণে অভিভাবকরা এসব তরুণ প্রজন্মের বিষয়ে খুবই উদ্বিগ্ন হচ্ছেন।

যদিও ১৩ বছরের বেশি বয়সীদেরই এই অ্যাপ ব্যবহার করার কথা, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে এর থেকে কম বয়সীরাও টিকটক ব্যবহার করছে। যে ভিডিও অন্যান্য দেশে স্বাভাবিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশে তা অস্বাভাবিক। অথচ এসব বিষয়ে কেন জানি আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজš§ বুঝেও না বুঝার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছেন। ফলে হুমকির মুখে আছেন আমাদের আগামীর দেশ গড়ার কারিগররা। তাই দেশের তরুণ প্রজšে§র সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য অ্যাপটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। বিভিন্ন সময়ে টিকটক লাইকির মতো অ্যাপগুলো বন্ধ করে দেয়ার কথা বললেও কার্যত সেটি হচ্ছে না। যদিও বা সেটি করা সম্ভব না হয় তবে এটিকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভেতরে আনতে হবে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা একরকম নয়। কারও মানহানি হয় এমন কিছু করা যাবে না কিংবা আপত্তিকর কোনো ভিডিও আপ করা যাবে না। যেটা অমান্য করলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে এরকম কঠোরভাবে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সুস্থ চিন্তা করতে দরকার সুস্থ বিনোদন, কিন্তু আমরা ছুটে চলছি এক অসুস্থ বিনোদন নিয়ে। সস্তা হাসি-ঠাট্টা আর খিস্তিতে ভরা এমন বিনোদন আমাদের সুস্থ মানসিকতাকে রীতিমতো পণ্ড করে ফেলছে। অশালীনতার আবহে অঙ্গভঙ্গি বিকৃত করে এগিয়ে যাচ্ছি এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার দিকে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা কতটা ভয়ংকর হতে পারে সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আগেই সময়ের প্রয়োজনে সরকারের উচিত এখনই এর লাগাম টেনে ধরা।

আশরাফ আহমেদ

শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ

এমসি কলেজ, সিলেট

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..