মত-বিশ্লেষণ

টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আবশ্যক

বিশ্বব্যাপী উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সম্পদ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিদেশি বিনিয়োগের বড় ভূমিকা রয়েছে। ভারী ও হালকা উভয় ধরনের সম্পদ জড়ো করার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পদ্ধতি হিসাবে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকে বিবেচনা করা হয়, যা প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য অত্যাবশ্যক।
বিগত দু’বছরের মতো ২০১৮ সালেও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ার একটা বড় কারণ ২০১৮ সালের প্রথম দুই কোয়ার্টারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক এন্টাপ্রাইজগুলোর পুঞ্জীভূত বিদেশি আয়ের বড় একটি অংশ দেশে ফিরিয়ে আনা।
বিগত ৩০ বছরে উন্নয়নশীল দেশের আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিনিয়োগের ধরন ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়ে বাণিজ্য ও গ্লোবাল ভ্যালু চেইনের মতো অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশই এখন ক্রমেই কৃত্রিম পণ্য ও সেবা উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে। এগুলো বহুজাতিক এন্টারপ্রাইজগুলোর সমন্বিত আন্তর্জাতিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০৩০ সালের এজেন্ডা অর্জনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উন্নয়নশীল দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। উৎপাদন ক্ষমতা উন্নীতকরণ ও বহুমুখীকরণ এবং যোগাযোগকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এনার্জি এবং পরিবহন অবকাঠামো এখনও অগ্রাধিকার খাত। বিভিন্ন দেশ, বিশেষত স্বল্পোন্নত দেশগুলো এখনও অনেকাংশে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
এটা অনুমান করা হয়, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য গোটা বিশ্বের চার দশমিক ছয় ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে সাত দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। টঘঈঞঅউ-এর হিসাব অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ টেকসই উন্নয়ন খাতের বার্ষিক বিনিয়োগ ব্যবধান দুই দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং অনেক দেশকেই অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ দ্বিগুণ করতে হবে।
ঊঝঈঅচ-এর হিসাব অনুযায়ী এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে বার্ষিক অতিরিক্ত এক দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, গড়ে জিডিপির পাঁচ শতাংশ অর্থায়নের প্রয়োজন হবে। এ অঞ্চলের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন, কেননা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে এ দেশগুলোর জিডিপির ১৬ শতাংশ অর্থায়নের প্রয়োজন হবে। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, এ লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় প্রচেষ্টার সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতাও বাড়াতে হবে।
টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে নজিরবিহীন সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশ্ব অর্থনৈতিক কাঠামোরও সংস্কার প্রয়োজন, যেমন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
যাহোক, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে পর্যাপ্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও সরকারি-বেসরকারি উভয় খাত থেকেই সমন্বিত টেকসই অর্থায়ন বাড়ছে, কিন্তু টেকসই উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিনিয়োগ এখনও অপ্রতুল। ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা এবং সংরক্ষিত বাণিজ্য নীতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি বাড়ছে।
এটা সুপারিশ করা হয়, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে শক্তিশালী ও বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যেমনÑকর ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ঙউঅ, বাণিজ্যিক ব্যাংকিং, মূলধন বাজার, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রকল্প, জলবায়ুর অর্থায়ন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সাপ্লাইচেইন অর্থায়ন, রেমিট্যান্স, ঋরহঞবপয ও ঝঞও অর্থায়ন প্রভৃতি নতুন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশগুলোকে এগোতে হবে।
বিশ্বব্যাপী সমন্বিত ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বৃদ্ধির জন্য স্বল্প মেয়াদে বিনিয়োগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের জন্য মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে, যাতে কেউ পিছিয়ে না থাকে, বিশেষত স্বল্প আয়ের শ্রেণিভুক্তরা।

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসিবি) ত্রৈমাসিক (এপ্রিল-জুন)
বুলেটিনের সম্পাদকীয়

সর্বশেষ..