টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলায় করণীয়

মো. আল-মামুন: যে উন্নয়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়ন চাহিদার কোনো ধরনের ক্ষতি না করে বর্তমান উন্নয়ন চাহিদা পূরণ করতে পারে, সে ধরনের উন্নয়নকে টেকসই উন্নয়ন বলে। জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৮৭ সালে পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে টেকসই উন্নয়নের দুটি মূল ধারণার কথা বলা হয়েছেÑদরিদ্র শ্রেণির অত্যাবশকীয় প্রয়োজন মেটানো এবং পরিবেশ সুরক্ষায় যৌক্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার। বর্তমানে টেকসই উন্নয়ন বলতে  সামাজিক সম্পৃক্তকরণ এবং পরিবেশসম্মত অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বোঝায়। টেকসই উন্নয়ন হলো ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত একগুচ্ছ লক্ষ্যমাত্রা। পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে ক্ষমতা ও বৈষম্যহীন উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে ‘রূপান্তরিত আমাদের পৃথিবী: ২০৩০ সালের জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)’ শিরোনামে প্রস্তাবনা গৃহীত হয়েছে। জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ২০১৬ সালের ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী বিশ্ব সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব লক্ষ্যমাত্রা অনুমোদিত হয়েছে। এসব লক্ষ্য সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে (এমডিজি) প্রতিস্থাপন করে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্বজুড়ে উন্নয়নের লক্ষ্যে গ্রহণ করেছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। বাংলাদেশসহ ১৯৩টি দেশ ১৫ বছর মেয়াদি ১৭টি টেকসই উন্নয়ন অর্জনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু টেকসই বিশ্ব নয়, বরং সমৃদ্ধি, সমতা ও সুবিচারের দিক থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এসডিজি বৈশ্বিক উন্নয়নের একটি নতুন এজেন্ডা। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ থেকে ২০০০ সালে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেয়া হয়। ২০১৫ সালে শেষ হওয়া এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের সফলতা বেশ উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে এমডিজি অর্জনের রোল মডেল। বাংলাদেশ এমডিজির যেসব খাতে সফল হয়েছে সেগুলো হলোÑদারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও লিঙ্গভিত্তিক সমতা। এই সফলতা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন এসডিজির সফল বাস্তবায়ন। কেননা ২০১৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের উদ্দেশ্য  হলোÑদারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্তি, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, মানসম্মত শিক্ষা, লিঙ্গসমতা, বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন, টেকসই জ্বালানি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প উদ্ভাবন ও উন্নয়ন অবকাঠামো, বৈষম্য হ্রাসকরণ, টেকসই শহর, সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার, ভূমির সুরক্ষা, শান্তি ও ন্যায়বিচার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাসহ সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে। ২০২১ সালের এসডিজি সূচকে বিশ্বের ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। চার বছর আগে ২০১৭ সালের সূচকে ১৫৭টি দেশের মধ্যে ১২০তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। এমডিজির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন যেমন আছে, তেমনি বৈশ্বিক অংশীদারত্বের স্থিতিশীলতা আনার কর্মসূচিও আছে। পরিবর্তনশীল বিশ্বের সমতা ও বৈষম্যহীন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন করতে হবে। পৃথিবীর সব দেশ এ লক্ষ্য অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এসডিজির লক্ষ্যগুলো অর্জনে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সম্পদের অসম বণ্টন, বৈষম্য ও দারিদ্র্য। আমরা একদিকে যখন দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলছি, অন্যদিকে বিশ্বে তখন সম্পদের বৈষম্য বেড়েই চলছে। ধনী-গরিবের ক্রমবর্ধমান ব্যবধান দারিদ্র্যকে আরও প্রকট করে তুলেছে। বিশ্বে সম্পদের বৈষম্য যত বাড়বে ধনী ও গরিবের বিভক্তি তত প্রকট হবে। আর বিভক্তি যত বাড়বে, বিদ্বেষ-বিভেদও তত বাড়তে থাকবে। বর্তমান পৃথিবীব্যাপী যে উন্নয়ন ঘটছে তা ভারসাম্যহীন। এই উন্নয়ন হচ্ছে দেশে-দেশে ও মানুষে-মানুষে বিভেদ সৃষ্টিকারী এবং বিভেদ বর্ধনকারী। এই প্রকট ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও বিভক্তি টেকসই উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, তবে লক্ষণীয় দিক হলো আয় ও ভোগবৈষম্য। গত কয়েক বছরে এই বৈষম্য কিছুটা কমেছে, তথাপি বিদ্যমান বৈষম্য প্রকট। আমাদের সম্পদের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে। সমাজে একশ্রেণির মানুষ ভূমি দখল, নদী দখল, বন দখল এমনকি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত করে অপরিমিত সম্পদের মালিক হচ্ছে। এর ফলে ভারসাম্যহীন সমাজ গড়ে উঠছে। ধনী-গরিবের ক্রমবর্ধমান ব্যবধানের ফলে দারিদ্র্য আরও প্রকট হচ্ছে। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হলো পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়। একশ্রেণির মানুষ অবৈধভাবে নদী দখলের ফলে জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে এবং নদীপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণ নাগরিক জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনিয়ন্ত্রিত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাব উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। পাবলিক ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা টেকসই উন্নয়নকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার অভাব সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ব্যক্তিপর্যায় থেকে সামষ্টিক পর্যায় সব ক্ষেত্রে বৈষম্য, সমন্বয়হীনতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হলে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, সেগুলো মোকাবিলায় বেশ কিছু করণীয় কয়েছে। যেমন সব ক্ষেত্রে বৈষম্য সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে আয়, ভোগ, জেন্ডার, অঞ্চল ও সম্পদবৈষম্য যথাসম্ভব কমিয়ে এনে সব ক্ষেত্রে দরিদ্রতার অবসান ঘটাতে হবে। এ লক্ষ্যে যথাযথ কৌশল ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সরকার ও অন্যান্য পর্যায়ে অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে সম্পদ আহরণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করে বিশ্লেষণপূর্বক টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচিতে দ্রুত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা ও তার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে প্রয়োজনানুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সাধারণ মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও সম্পদের ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। এতে তারা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সম্পদ সংগ্রহের পাশাপাশি সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে। নীতিকাঠামোগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থ-সামাজিক পরিবেশ সমৃদ্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে মনিটরিং ও মেনটরিংয়ের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সব মহলের সম্মিলিত অঙ্গীকার ও প্রচেষ্টায় সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি। পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা রোধ করতে হবে। বিদেশে সম্পদ পাচার বন্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে গ্রামীণ অকৃষি খাতকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিতে হবে। সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং ভৌগোলিকভাবে পিছিয়ে পড়া দুর্গম অঞ্চল বিশেষ বিবেচনায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অতিদারিদ্র্য ও দারিদ্র্যের হার কমাতে প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। নীতিকাঠামো বিন্যাস এমনভাবে করতে হবে, যাতে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি ন্যায্যভাবে সুবণ্টিত হয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন অগ্রাধিকার দিতে হবে। এসব খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা ও তদারকি বাড়াতে হবে। সবার সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মানোন্নয়ন ও জাগরণ ঘটাতে হবে। জ্বালানি খাতকে বর্তমান বাজেটে অগ্রাধিকার দিলেও তা বাস্তবায়নে কঠোর তদারকি জোরদার করতে হবে। গ্যাসের ক্ষেত্রে প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে স্থলভাগ ও সমুদ্র অনুসন্ধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার রোধ করতে হবে। যা কিছু ভালো তা বিবেচনা করার আগে তার সঙ্গে বিপদাপন্ন ঝুঁকি কতটুকু, সে দিকটা বিবেচনায় রেখে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তাহলে অনেকাংশেই ঝুঁকি মোকাবিলা করা সহজ হবে।

টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সরকারের একার পক্ষে, কিংবা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে প্রত্যেকেরই এগিয়ে আসতে হবে। সবার সচেতনতা রাষ্ট্রকে উন্নয়নের আরও এক ধাপ সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। টেকসই উন্নয়নের প্রধান ক্ষেত্র হলো আমাদের সমাজ, অর্থনৈতিক বিবেচনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। এগুলোকে মৌলিক বিবেচ্য বিষয়ও বলা হয়ে থাকে। মূলত এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে সব ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন আশা করা যায়। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সহযোগিতা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্রণীতব্য উন্নয়ন পরিকল্পনা ও তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে এসডিজি বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশ অবশ্যই সফল হবে।

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ..