মত-বিশ্লেষণ

টেকসই উন্নয়নে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানের গুরুত্ব

. কে আব্দুল মোমেন: একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে দেশের কর্মোক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য যথাযথ কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বব্যাপী গৃহীত হয়েছে ‘বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা-২০৩০’ বা ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা’। এর মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-৮-এর লক্ষ্য হলো সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও শোভন কর্মসুযোগ সৃষ্টি এবং স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন। বিশ্বের অপরাপর দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এ বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-৮ এমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় কর্মরত ও বেকার ব্যক্তিদের গড় প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করার নিশ্চয়তা প্রদান করে। এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হলে বর্ধিত বহুমুখিতা এবং অব্যাহত প্রযুক্তিগত উন্নতি ও নবধারার মাধ্যমে আরও বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে এবং শ্রম নিবিড় উৎপাদন খাত তৈরির পথ সুগম হবে। সব বয়সী নারী, পুরুষ ও শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক খাতে আরও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং উন্নত কর্ম পরিবেশ তৈরি হবে। এর ফলে বেকারত্বের হার, মজুরি ফারাক (ওয়েজ গ্যাপ) এবং শোভন কাজের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নবান্ধব সরকার সবার জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শোভন কাজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।

দেশে বিদ্যমান সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দারিদ্র্য বিমোচন করতে গিয়ে সর্বদাই প্রবৃদ্ধির প্রশ্নটি সামনে এসে পড়ে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল ভিত্তি প্রবৃদ্ধির হার ত্বরান্বিতকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ চিত্তাকর্ষক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা নি¤œ আয়ের দেশ থেকে নি¤œমধ্য-আয়ের দেশে রূপান্তরে ভূমিকা রেখেছে এবং ২০১৮ সালের মার্চে প্রথম বার্ষিক বিবেচনায় স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে মাথাপিছু জিডিপির প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার প্রত্যক্ষ করা যায়। মোট প্রকৃত জিডিপির উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি (সাত দশমিক ২৮ শতাংশ) এবং সফল জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা নীতির কারণে ভিত্তি বছর ২০১৫ সালের পাঁচ দশমিক ১৪ শতাংশের তুলনায় মাথাপিছু জিডিপির প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েছে পাঁচ দশমিক ৯৬ শতাংশে। এই সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে বার্ষিক এক দশমিক ৩৭ শতাংশ হারে (২০১৬)। একইসঙ্গে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের টিএফআর (টোটাল ফার্টালিটি রেট বা মোট প্রজনন হার) কমেছে নারীপ্রতি দুই দশমিক এক। বিগত বছরগুলোয় মাথাপিছু প্রকৃত জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে। ২০০১-২০১০ সময়কালে যা ছিল চার দশমিক তিন শতাংশ, ২০১১-২০১৩ সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ শতাংশে। মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত হওয়ার ফলে বর্তমানে মার্কিন ডলারের হিসাবে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং ২০১০ সালে মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৭৫৭ মার্কিন ডলারের ওপরে। ২০১৯ সালে এসে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৯০৯ ডলার। এসডিজি’র সময়কালের মধ্যে প্রবৃদ্ধির এই বর্ধিত হার থেকে আশা করা যায়; সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধি অর্জন বাংলাদেশের নাগালের মধ্যে রয়েছে।

ন্যায্য ও সমতাপূর্ণ মজুরির ভিত্তিতে টেকসই এবং শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ কেমন তা জানা খুবই জরুরি। প্রতি কর্মীজনে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সূচকের মাধ্যমে এটি মূল্যায়ন করা হয়। এর মাধ্যমে শ্রম উৎপাদনশীলতা অর্থাৎ প্রতি একক শ্রম বৃদ্ধি করলে কী পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধি পায় তা নির্ধারণ করা যায়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে শ্রম উৎপাদনশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। উৎপাদনশীল পূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরি ও সবার জন্য শোভন কাজের সুযোগ সৃষ্টিতেও এটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। প্রতি কর্মীজনে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২০১৫ সালের চার দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৬ সালে দাঁড়িয়েছে চার দশমিক ৯৯ শতাংশ। আশার কথা, এই সূচকের ক্ষেত্রে ২০২০ সালের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য ২০১৭ সালের মধ্যেই অর্জিত হয়ে গেছে। ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের মধ্যে কর্মে নিযুক্ত অথবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬০ দশমিক আট মিলিয়ন (মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৫ দশমিক আট শতাংশ), যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দুই দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। মোট কর্মে নিযুক্ত মানুষের মধ্যে প্রায় ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ নারী এবং এদের মধ্যে আবার ১৫-২৯ বছর বয়সী ২৯ দশমিক পাঁচ শতাংশ এবং ৩০-৬৪ বছর বয়সী ৬৬ দশমিক পাঁচ শতাংশ।

বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তিতে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। বলা হয়ে থাকে, এটা আমাদের অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যসূচক একটা বিষয়। এই বিপুল পরিমাণ অনানুষ্ঠানিক শ্রম বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়নের পক্ষে একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। কারণ এসব অনানুষ্ঠানিক কাজের অধিকাংশই অনিয়মিত, অস্বীকৃত এবং অপেক্ষাকৃত কম উৎপাদনশীল। এসব কাজের সামাজিক, আইনি ও শ্রম সুবিধা সাধারণত কম। তারপরও এই অনানুষ্ঠানিক কাজ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক কাজের সুযোগ পায় না অথবা বিভিন্ন কারণে প্রাতিষ্ঠানিক কাজ থেকে ছিটকে পড়ে, এমন বিপুল পরিমাণ মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয় এসব অনানুষ্ঠানিক কাজে। সাম্প্রতিক ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, দেশে মোট কর্মসংস্থানে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান হলো প্রায় ৮৫ দশমিক এক শতাংশ; যার মধ্যে ৮২ দশমিক এক শতাংশ পুরুষের ও ৯১ দশমিক আট শতাংশ নারীর। শিল্প ও সেবা খাত মিলিয়ে আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে অকৃষি খাতে কর্মসংস্থান মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৫৯ দশমিক চার শতাংশ। অকৃষি খাতে অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির হার ২০১৫ সালের চেয়ে ২০১৬ সালে এসে সামান্য পরিমাণে বেড়েছেÑ ২০১৫ সালের ৭৭ দশমিক পাঁচ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালে ৭৮ শতাংশ।

অর্থনীতির কৃতিত্ব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, যদি কেউ কাজে নিয়োজিত না থাকে এবং সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজতে থাকে, তাকে বেকার বলে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেকারত্ব পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটেছে। যেমন ২০১০ সালে বেকারত্বের হার ছিল চার দশমিক ছয় শতাংশ, ২০১৭ সালে যা একটু কমে চার দশমিক দুই শতাংশে নেমে এসেছে। এ দেশে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। নারী বেকারত্বের হার পুরুষ বেকারত্বের হারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। আশার কথা হলো, ২০১৩ সাল থেকে নারীদের বেকারত্বের হার ক্রমহ্রাসমান। পুরুষদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ২০১৩ সালের তিন শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৬ সালে তিন দশমিক এক শতাংশে পৌঁছায়। সব বয়সী মানুষের তুলনায় ১৫-২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি; ১৫-২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর বেকারত্ব ২০১৫-১৬ সালে ছিল ২০ দশমিক ছয় শতাংশ, ২০১৭ সালে যা অনেকটা কমে ১২ দশমিক তিন শতাংশে নেমে আসে।

বাংলাদেশে বেকারত্বের হার সুদীর্ঘ সময় ধরে চার শতাংশের কাছাকাছি কিন্তু এ বিষয়টি নীতিসংক্রান্ত কোনো উদ্বেগের বিষয় নয়, ২০২০ সালের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ১৫-২৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দিয়ে নারীর বেকারত্ব দূরীকরণ ও শোভন কাজের সুযোগ নিশ্চত করতে সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

দেশের কর্মসংস্থানকে টেকসই ও ফলপ্রসূ করার জন্য শিশুশ্রম নিরোধ করা জরুরি। শিশুর বয়স ও কাজের ধরনভেদে শিশুদের জন্য উপযোগী কর্মঘণ্টার চেয়ে বেশি পরিমাণে কাজ করাকে শিশুশ্রম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। যে কোনো ধরনের শিশুশ্রমই ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচ্য এবং যা দূর করা অবশ্য প্রয়োজন। এরই মধ্যে সরকার শিশুশ্রমকে নিরুৎসাহিত করতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজসহ সব ধরনের কাজ থেকে শিশুদের রক্ষার উদ্দেশ্যে সরকার ২০১০ সালে জাতীয় শিশুশ্রমনীতি প্রণয়ন করেছে। শিশুশ্রম থেকে সরে আসতে ২০১২-১৬ সময়ের মধ্যে দেশে জাতীয় শিশুশ্রম নীতি বাস্তবায়ন করা হয়। বিভিন্ন খাতে শিশুশ্রমকে নিরুৎসাহিত করতে শিশু সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, শিশু অধিকার রক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রাথমিক শিক্ষায় বৃত্তি প্রদান প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৯৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা শিশুশ্রম বন্ধ করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে সহায়তা করে আসছে। এর ফলে প্রায় ৭৫ হাজার শিশু উপকৃত হয়েছে। শিশুশ্রম জরিপ-২০১৩ বাংলাদেশে পরিচালিত সর্বশেষ জরিপ। জাতিসংঘ কনভেনশনের ওপর ভিত্তি করে এখানে শিশুশ্রমকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা কর্মরত শিশু, শিশুশ্রম এবং বিপজ্জনক-ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু। এই জরিপ অনুযায়ী, ৩৯ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী কর্মরত শিশুর সংখ্যা প্রায় আট দশমিক সাত শতাংশ (তিন দশমিক ৪৫ মিলিয়ন), চার দশমিক তিন শতাংশ (এক দশমিক সাত মিলিয়ন) হলো শিশু শ্রম এবং তিন দশমিক দুই শতাংশ (এক দশমিক ২৮ মিলিয়ন) শিশু জড়িত আছে ঝুঁকিপূর্ণ-বিপজ্জনক কাজে। সরকার শিশুদের সব ধরনের অধিকার নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি শিশুশ্রম নিরোধ ও সবার জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে।

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অবস্থান মূল্যায়ন করা হয়, যা শোভন কাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাম্প্রতিক তথ্য থেকে দেখা যায়, পেশাগত কারণে কর্মক্ষেত্রে আহত হওয়ার ঘটনা অনেকটাই কমেছে বাংলাদেশে। ২০১৫ সালে কর্মক্ষেত্রে মারাত্মক আহতের সংখ্যা ছিল ৩৮২, যা ২০১৬ সালে কমে ৭৫-এ নেমে এসেছে।

সবার জন্য শোভন কাজ ও টেকসই কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী অধিবাসীদের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যতা বা প্রবেশাধিকার সবার জন্য বিশেষ করে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থ সংকটে ভুগছে, তাদের জন্য ব্যাংকিং সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি করে। ২০১৬ সালে প্রতি এক লাখ বয়স্ক জনের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে আট দশমিক ৪৪ শতাংশ। ২০১৫ সালে যা ছিল আট দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং ২০১০ সালে ছিল সাত দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্তি সব মানুষের বিশেষ করে দরিদ্রদের সম্পদ লাভ ও তার সর্বোত্তম ব্যবহার এবং চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি করে; যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্তি বাড়লে পরিবার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবা যেমন ঋণ গ্রহণ, অর্থ সঞ্চয় ও জমা, হিসাব পরিচালনা, বিল পরিশোধ, ভোগ ও বিনিয়োগ প্রভৃতির সুযোগ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্তির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-৮-এর লক্ষ্য হলো সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই কর্মসংস্থান ও শোভন কাজের নিশ্চয়তা বিধান করা। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালো হলেও এখনও রয়ে গেছে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনের পথ সুগম করতে হলে নি¤েœাক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রবৃদ্ধি উন্নয়ন এবং অর্থনীতির বহুমুখিতা অর্জন: দেশে শ্রমশক্তির বর্ধিত চাহিদা পূরণে প্রতি বছর অন্তত আট শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা প্রয়োজন। যেহেতু প্রবৃদ্ধির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হলো ম্যানুফ্যাকচারিং খাত, তাই আগামী ১৫ বছরে বার্ষিক ১২-১৫ শতাংশ হারে এই খাতের প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির উৎপাদন কাঠামোকে বহুমুখী করে তুলতে হবে। বাংলাদেশে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান বিশেষ করে,

শ্রমনিবিড় বস্ত্র ও পোশাকশিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সফল হয়েছে। এই ধরনের আরও বিভিন্ন শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে বহুমুখিতা অর্জন করা জরুরি। শেখ হাসিনার সরকার এই লক্ষ্য পূরণে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রম বাজারের মধ্যে সংযোগ শক্তিশালী করা: শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রম বাজারের মধ্যকার সংযোগ কয়েকটি উপায়ে জোরদার করা যায়। প্রথমত, প্রকারভেদ ও গুণগত মান বিচারে শ্রম বাজারের চাহিদা পূরণের জন্য শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত করে তুলতে হবে। শ্রম বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং নিয়োগকারীদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মতান্ত্রিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। এরই মধ্যে সরকারের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ফলাফল দৃশ্যমান হয়েছে। সরকার কাজ করছে আরও বৃহৎ লক্ষ্য সামনে রেখে।

নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: শ্রমশক্তিতে নারীদের সংশ্লিষ্টতার হার বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিভিন্ন রকম বাধার সম্মুখীন হয়েছে। বাল্যবিবাহ ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকার আইনি কাঠামো গড়ে তুলেছে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও কঠোরতা প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে শ্রম শক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। নারীদের কাজকে আরও এগিয়ে নিতে সরকার নারীবান্ধব নীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ চালু করেছে এরই মধ্যে। নারী শিক্ষার অগ্রগতি, জš§হার হ্রাসকরণ, সরকারি চাকরিতে নারী কোটার ব্যবস্থা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি এর মধ্যে অন্যতম।

বর্তমান শ্রমশক্তির দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ প্রদান: নতুন প্রজšে§র শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার প্রধান উপকারভোগী। কিন্তু বর্তমান কর্মজীবীদের একটি বৃহৎ অংশই দশকের পর দশক ধরে অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এসব শ্রমজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে সাময়িক নয় বরং জীবনব্যাপী একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।

সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা: দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ধীরগতিতে বাড়লেও এই খাত থেকে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ এখনও কম। এফডিআই’র মাধ্যমে শুধু যে সরাসরি আর্থিক বিনিয়োগ আসছে, তা নয়। এর মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনাও আসছে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে যার একটি স্পিল ওভার ইফেক্ট রয়েছে। বাংলাদেশকে প্রবৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আরও বেশি পরিমাণে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..