প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ট্যানারি শিল্পনগরী শুধু মালিকদের জন্য!  

 

নাজমুল হুসাইন: আসতাহাব মিয়া দীর্ঘ তের বছর ধরে অস্থায়ীভাবে কাজ করছেন বিভিন্ন ট্যানারিতে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পরিবারের জন্য এখনও বাসা ভাড়া করতে পারেনি সাভারে। ফলে কাজের জন্য প্রতিদিন হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্পনগরীতে যাতায়াত করছেন। এতে তার যাওয়া-আসা বাবদ খরচ হচ্ছে ১৩০ টাকা। আর একবেলা খাবারে খরচ হয় কমপক্ষে ৬০ টাকা। সেই হিসাবে মাসে তার এখন অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা।

আক্ষেপ করে আসতাহাব মিয়া বলেন, ‘বেতন পাওয়ার পর পরিবারের জন্য থাকে দেড় হাজার টাকা। সংসার আর চলে না। কিন্তু কাজ তো ছাড়তে পারি না। এ শিল্পনগরীতে অনেক কিছু হলো, কিন্তু আমাদের মতো অসহায় শ্রমিকদের কোনোই ব্যবস্থা হয়নি। কোনো থাকার জায়গা নেই, খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, এমনকি চিকিৎসার অভাবে ঝুঁকিতে কাজ করতে হচ্ছে।’

সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি শ্রমিক আসতাহাব মিয়ার দুঃখের কথা শুনতে আরও কয়েক শ্রমিক এগিয়ে আসেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তারা জানান, কয়েক দিন আগে মেশিন চালু করতে পাইপ লাইনে মুখ লাগিয়ে তেল টানছিল এক শ্রমিক। এতে আকস্মিকভাবে তার পেটে জ্বালানি তেল চলে যায়। সেই শ্রমিকের জীবন নিয়ে টানাটানি। শিল্পনগরীতে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। আশেপাশেও নেই। শেষমেশ তাকে ঢাকা মেডিক্যালে নিতে হয়।

তারা আরও জানান, এখানে খাবারেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। শিল্পনগরীর বাইরে যেসব রেস্তোরাঁ রয়েছে তারা এ সুযোগে গলাকাটা ব্যবসা শুরু করেছে। এমনকি আশেপাশের বস্তি বাড়িতে ভাড়া বেড়েছে কয়েকগুণ।

জানা গেছে, আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগে ট্যানারিগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই বিপর্যয় নেমে এসেছে ট্যানারির অর্ধলাখ শ্রমিকের। এ খাতে ৩০ হাজার শ্রমিক প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। কিন্তু সাভারে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ট্যানারি এখনও চালু না হওয়ায়  প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। আর যেসব শ্রমিক কাজ করছেন তাদের অবস্থা খুবই করুণ।

 

ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন বলছে, সাভারে শ্রমিকদের জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেই। এতে কিছু শ্রমিক নিজ খরচে সাভারে আবাসন ব্যবস্থা করলেও এখন অধিকাংশ হাজারীবাগ ও আশেপাশের এলাকায় থেকে কাজে আসে। বিভিন্ন কোম্পানিতে তারা কাজ করছেন, তাদের পরিবহন কোম্পানি ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও তা করা হয় না। এতে শ্রমিকদের চাকরি রক্ষায় নিজ খরচে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে পারিশ্রমিকের পুরোটাই খরচ হয়ে যাচ্ছে।

 

জানতে চাইলে ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘হাজারীবাগের ৬০ থেকে ৭০ হাজার একর জমিতে যে কারখানাগুলো ছিল, তাদের জন্য সাভারে ২০০ একর জমির ব্যবস্থা করা হলো। শ্রমিকদের আবাসনের বিষয়টি সেখানে নেই। হাসপাতাল, খেলার মাঠ, আবাসন ব্যবস্থা নেই। তাহলে কী করে এটা আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব শিল্পনগরী হয়?’

 

শ্রমিক নেতা আক্তার হোসেন বলেন, ‘শুধু মালিকদের কথা বিবেচনায় এ শিল্পনগরী। মালিকরাও জায়গা পেয়ে, সরকারের ঋণ পেয়ে আমাদের ভুলে গেছে।’

 

নবাব মিয়া নামের এক শ্রমিক বলেন, ‘এখনও প্রতিটি ট্যানারি শ্রমিক ছাঁটাই করছে। ছাঁটাই করলে অ্যাসোসিয়েশনের নিয়ম অনুযায়ী ন্যায্য পাওনাও দেওয়া হয় না। আমরা সবধরনের বিপদে আছি। ট্যানারি শ্রমিকদের পরিবারে দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ মানববেতর জীবন যাপন করছে।’

 

আবুল কালাম আজাদ নামের আরেক শ্রমিক বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির দায় বিসিক কিংবা মালিকপক্ষ যারই হোক না কেন, সংকটে শ্রমিকরা। আমাদের না খেয়ে মরার উপক্রম হয়েছে। দিন শেষে সবকিছুর শ্রমিকরাই ভুক্তভোগী। মালিকরাও তাদের মূল অস্ত্র শ্রমিকদের দিকে তাক করে রাখছে।’

 

 

শ্রমিক নেতারা জানান, হাজারীবাগের বন্ধ হওয়া ট্যানারির ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিক তাদের চাকরি নিয়ে এখনও অনিশ্চিত। অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার পর এখন আর চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এদিকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ট্যানারি স্বল্প পরিমাণে প্রাথমিক কাজ (ওয়েট ব্লু) চলমান রাখলেও গ্যাসের অভাবে অন্যান্য কার্যক্রম (ক্রাশ্ড ও ফিনিশিং) চালাতে পারছে না। সেগুলো ট্যানারির মালিকপক্ষও শ্রমিকদের ফের কাজে নেওয়ার বিষয়ে নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। অল্প কিছু লোক দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।