নিজস্ব প্রতিবেদক : নানামুখী সংকটের মুখে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও অস্থির আচরণ আবারও বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের একগুঁয়ে নীতি, বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকি, মুদ্রানীতি নিয়ে চাপ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অপ্রত্যাশিত অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ডলার, পুঁজিবাজার, জ্বালানি বাজার এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সোনার দামে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাধারণত বৈশ্বিক অস্থিরতা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে সোনার মতো নিরাপদ বিনিয়োগে ঝোঁকেন। ট্রাম্পের বক্তব্য ও নীতিগত হুমকিতে ঠিক সেটাই ঘটছে। অপরদিকে মার্কিন ডলারের মান কমে যাওয়ার প্রবণতাও স্পষ্ট হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সম্ভাব্য পুনর্নির্বাচন ও তার আগ্রাসী অর্থনৈতিক নীতি, বিশেষ করে ফেডারেল রিজার্ভের ওপর সুদের হার কমানোর চাপ ডলারের ওপর আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। ডলার দুর্বল হলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য তা সাময়িক স্বস্তি আনলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
এদিকে ট্রাম্প তার আগের মেয়াদে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে নাড়া দিয়েছিলেন। এবারও তিনি ক্ষমতায় এসে উচ্চ শুল্কারোপ, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই এখন বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য যদি আবার সংকুচিত হয়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে উন্নয়নশীল ও রপ্তানিনির্ভর দেশগুলো। বাংলাদেশের মতো দেশ, যারা তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য মার্কিন বাজারের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল, তারা এই অস্থিরতার প্রভাব এড়াতে পারবে না।
বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে ‘কৃত্রিম সংকট’ হিসেবে দেখছেন। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতির মৌলিক সূচক উৎপাদন, ভোক্তা চাহিদা কিংবা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা-এই মুহূর্তে ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায় নেই। কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতিগত হঠকারিতা এবং অপ্রত্যাশিত বক্তব্য বাজারে ভয় সৃষ্টি করছে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই ভয়ের মাত্রা আরও বেশি, কারণ তিনি প্রায়ই টুইট বা বক্তব্যের মাধ্যমে বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেন। একটি মন্তব্যেই পুঁজিবাজার পড়ে যেতে পারে, আবার একটি হুমকিতে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের আচরণ দীর্ঘ মেয়াদে বৈশ্বিক আস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ সরাসরি মার্কিন অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত না হলেও পরোক্ষ প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। ডলার দুর্বল হলে রপ্তানি আয়ে সাময়িক সুবিধা মিলতে পারে, তবে বৈশ্বিক মন্দা শুরু হলে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়লে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও তার প্রভাব পড়ে, যা সাধারণ ভোক্তার জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ডলারের অস্থিরতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে ওঠে।
দেশের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা। ট্রাম্পের নীতিগত অনিশ্চয়তা সেই আস্থাকে দুর্বল করছে। বড় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে স্বল্পমেয়াদি লাভের দিকে ঝুঁকছেন, যা টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই পরিস্থিতিতে সতর্ক অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ জরুরি। রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক আচরণ ও অর্থনৈতিক একগুঁয়েমি যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, পুরো বিশ্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে, তা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। সোনার দাম বৃদ্ধি, ডলারের দুর্বলতা এবং বাজারের অস্থিরতা এই সংকটের দৃশ্যমান প্রতিফলন। যদিও এটি এখনো পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক মন্দায় রূপ নেয়নি, তবে বিশ্লেষকদের মতে এটি একটি কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট সংকট, যা সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে এড়ানো সম্ভব।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশও এড়াতে পারবে না। ডলার বাজারের অস্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে আমাদের আমদানি ব্যয় বাড়ছে, যা উৎপাদন খরচে চাপ সৃষ্টি করছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো-বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার এখনও শক্তিশালী এবং রপ্তানি খাত ধীরে হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখে। এই সময়ে নীতিগত স্থিরতা ও ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বেশি জরুরি।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন পরস্পরনির্ভরশীল, তখন একটি দেশের নেতার অস্থির সিদ্ধান্ত পুরো পৃথিবীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য তাই বৈশ্বিক রাজনীতির এই পরিবর্তনগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
এ বিষয়ে কথা বললে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বেশ শক্ত অবস্থানে। তবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে। এটা সাময়িক। এ সমস্যা সমাধানে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যক্তি খাত অনেক বেশি দক্ষ ও অভিজ্ঞ। তারা এটি খুব সুন্দরভাবে মোকাবিলা করবে।’
সিরামিক্স খাতের একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশও এড়াতে পারবে না। ডলার বাজারের অস্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে আমাদের আমদানি ব্যয় বাড়ছে, যা উৎপাদন খরচে চাপ সৃষ্টি করছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার এখনো শক্তিশালী এবং রপ্তানি খাত ধীরে হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখে। এই সময়ে নীতিগত স্থিরতা ও ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বেশি জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি সংবেদনশীল সময় পার করছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা দুর্বল হয়েছে, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে। তবে সরকার যদি মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতে পারে এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দেয়, তাহলে এই সংকটকে সুযোগে রূপ দেওয়া সম্ভব। আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি এখনও নড়বড়ে নয়, কিন্তু সতর্ক না হলে ঝুঁকি বাড়বে।’
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post