দিনের খবর সারা বাংলা

ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর আদৌ চালু হবে কি?

শামসুল আলম, ঠাকুরগাঁও: উত্তরের অবহেলিত সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলোর একটি ঠাকুরগাঁও। দেশ স্বাধীনের পর থেকে এ অঞ্চলে তেমন কোনো বড় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। এর একমাত্র কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। এ কারণে রাজধানীর কোনো শিল্পোদ্যোক্তা এই দুটি জেলায় কোনো ভারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আগ্রহ দেখায়নি।

এককালে ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার জনপদ ছিল ঠাকুরগাঁও। হারিয়ে গেছে সেই ঐতিহ্য। যেমন ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রায় আড়াইশ’ একর জমির ওপর নির্মিত হয় ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরটি। এটি চালু হয় ১৯৬৬ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ১৯৭৭-৮১ সাল পর্যন্ত ঢাকা থেকে সরাসরি ফ্লাইট যাতায়াত করেছে, এরপর বিমান চলাচল বন্দ হয়ে যায়।

বিমানবন্দরটির রানওয়ে দৈর্ঘ্য ছয় হাজার ফুট, প্রস্থ ৬০০ ফুট। বিমানবন্দরটিতে একটি টার্মিনাল ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। প্রায় আড়াইশ’ একর জমির মধ্যে বর্তমানে ১৫০ একর জমিতে সরকারিভাবে অথবা লিজ দিয়ে চাষাবাদ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকার পর চালুর লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে বিমানবন্দরটি সংস্কার করা হয়। পরে সেটি আর চালু হয়নি। তৎকালীন আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিমানের লোকসান হয়েছিল, যা হয়ত স্বাভাবিক ছিল। তাই বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

তবে সময় গড়িয়েছে, অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বন্দরটি চালু হওয়া এখন সময়ের দাবি। সৈয়দপুর বিমানবন্দরের প্রায় ৮০ ভাগ যাত্রী ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরের। ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর থেকে ১০ থেকে ১৫ মিনিটে ভারতের বাগডোগরা বিমানবন্দরে অবতরণ করা সম্ভব। ট্রানজিট ফ্লাইটে আশেপাশের কয়েকটি দেশে যাওয়া সম্ভব। অথচ একটি সময়োপযোগী আন্তরিক সিদ্ধান্তের জন্য বঞ্চিত হচ্ছি তিন জেলার মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে অর্থনীতি।

২০১৬ বিমানবন্দরটি চালু করার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সে সময় বর্তমান সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী ছিলেন রাশেদ খান মেনন। এখানে এসে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের বিমানবন্দরের  অবকাঠামো পরিদর্শন করেন। পরে সেখানে তিনি বিমানবন্দর চালু করার বিষয়ে নানা পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন। রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘ব্রিটিশ আমলে আড়াইশ’ একর জমির ওপর নির্মিত এ বিমানবন্দরে বিমান চলাচলের সব ধরনের অবকাঠামো রয়েছে। এটি চালু করতে তেমন কোনো খরচ হবে না। এটি চালু করার জন্য যা দরকার, আমরা তিন মাসের মধ্যে সে কাজ শুরু করব।’

পরে সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করার অনুমতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পঞ্চগড় স্থলবন্দর চালু হলে এ এলাকায় বিমান লাভবান হবে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর আগমনে বিমানবন্দর চালুর স্বপ্ন দেখে ঠাকুরগাঁওবাসী। কিন্তু তা এখনও অধরা।

ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু হলে ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন চালুর কারণে এ এলাকার মানুষের মাঝে উন্নয়নের সঞ্চার ঘটবে বলে বিশিষ্টজনরা মনে করেন।

বিশিষ্টজনরা জানান, ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর সিদ্ধান্ত বারবার হয়েছে কিন্তু পরে আলোর মুখ দেখেনি। বিমানবন্দরটি চালু হলে শুধু ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষই সুবিধা ভোগ করবে না বরং আশেপাশের কয়েকটি জেলায় কয়েক লাখ মানুষ এর সুবিধা ভোগ করতে পারবে। জেলাটি বাণিজ্যিক জেলায় পরিণত হলে বেকারত্বও দূর হবে।

ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় থেকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের বিমানের টিকিট বুকিং দেয়ার জন্য রয়েছে মোট পাঁচটি বুকিং অফিস। প্রতিদিন এ অফিসগুলোয় গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি টিকিট বুকিং হয় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য। এ অবস্থায় ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু হলে পঞ্চগড়, দিনাজপুরসহ ঠাকুরগাঁওয়ের লোকজন সহজে এ বিমানবন্দর দিয়ে বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করতে পারবেন।

ঠাকুরগাঁও শরীফ বিমান এয়ারলাইননের স্বত্বাধিকারী সাকের উল্লাহ জানান, ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকা যাওয়ার বিমানের টিকিট অনেক বিক্রি হয়। সে পরিমাণ সেবা দিতে আমরা পারছি না। তাই বেশিরভাগ মানুষ টিকিট না পেয়ে ফিরে যায়। ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর চালু হলে বিমান খাত লাভজনক হবে ও মানুষ কম সময়ে দ্রুত বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছাতে পারবে। অন্যদিকে বিমানবন্দরটি চালু হলে ভারতের অনেক ব্যবসায়ী এর সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

ঠাকুরগাঁও চেম্বার অব কর্মাসের সভাপতি হাবিবুল ইসলাম বাবলু জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় ঢাকার ব্যবসায়ীদের এ অঞ্চলে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে আগ্রহ নেই। যদি শিবগঞ্জ বিমানবন্দর পুনরায় চালু হয়। তাহলে এই এলাকায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। ফলে মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। কার্গো বিমান চালু হলে অন্য জেলা থেকে মালামাল পরিবহন করা যাবে এবং এ এলাকার মালামাল সহজে ও কম খরচে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো যাবে।

ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পরিষদ চেয়ারম্যান মুহম্মদ সাদেক কুরাইশী বলেন, সৈয়দপুর বিমানবন্দর কাছাকাছি হওয়ার কারণে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরটি এখনও চালু করা হয়নি। তবে বিমানবন্দরটি চালু করা জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..