প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ডজনখানেক কোম্পানিতে হাজার কোটি টাকার ‘কারসাজি’

নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্বাক ছিল কেন?

সাইফুজ্জামান সুমন: গত দুই বছরে পুঁজিবাজারে অনেক বড় ঘটনা ঘটেছে। পুঁজিবাজারকে নিয়ে রীতিমতো জুয়া খেলায় লিপ্ত হয়েছে একটি গোষ্ঠী। স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণফোন ও বিএটিবিসির শেয়ারের দর না বাড়লেও ফেস ভ্যালুর নিচের শেয়ার এক-দুই মাসের ব্যবধানে ৩৩ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অনেক জাঙ্ক শেয়ার বেশি দামে বিক্রি হয়েছে জুয়াড়িদের কারসাজিতে। আর তাদের আইনের আওতায় না এনে বরং প্রাতিষ্ঠানিক মদত দিয়ে জুয়ায় উৎসাহিত করা হয়েছে। জামাই আদর করে তাদের বিভিন্ন রোডশোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বিএসইসি বিষয়টি আমলে নিয়ে কিছু উদ্যোগ নিলেও একে স্রেফ আইওয়াশ বলে মনে করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তারা মনে করেন, বিএসইসির কাছে সব তথ্য রয়েছে। সব জেনেও তারা নীরব ছিল। ফলে এক ডজন কোম্পানিতে হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি হয়েছে। এতে লাখো বিনিয়োগকারী পুঁজি হারালেও লাভবান হয়েছে হাতে গোনা এক দুষ্টু চক্র।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত দুই বছরে এক ডজনের বেশি কোম্পানিতে শেয়ার কারসাজি হয়। এর মধ্যে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, জেনেক্স, ফরচুন শুজ, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, আইপিডিসি, সাফকো স্পিনিং, ওয়ান ব্যাংক, এডিএন টেলিকম ও হামিদ ফেব্রিকস অন্যতম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোম্পানির সঙ্গে মিলেমিশে কারসাজি করেছে জুয়াড়ি সিন্ডিকেট। আর এ সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন সমবায় ক্যাডারের কর্মকর্তা আবুল খায়ের হিরু। হিরুর পাশাপাশি জাকির, সাইফুল, মিজান ও মোস্তফাসহ কয়েকজন জুয়াড়ি বাজারে থাকলেও তাদের তেমন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন হিরু।

এদিকে হিরু এক ডজনের বেশি কোম্পানির শেয়ার কারসাজিতে জড়িত থাকলেও দুটি কোম্পানির বিষয়ে অভিযোগ দিয়ে তাকে দায়মুক্তির চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসইসি ও ডিএসই। বিনিয়োগকারীদের দাবি সিডিবিএলের তথ্য নিয়ে বিএসইসি ও ডিএসই এক বছর আগে কঠোর ব্যবস্থা নিলে লাখো বিনিয়োগকারী পথে বসতেন না। পাশাপাশি বাজার তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারত। কিন্তু বিএসইসি ও ডিএসইসি সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে জুয়াড়িদের মাধ্যমে সূচক বাড়িয়ে বাহবা নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে বিএসইসির মতো একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাহানি করেছে সংশ্লিষ্টরা।

বস্ত্র খাতের কোম্পানি সাফকো স্পিনিংয়ের শেয়ার নিয়ে কারসাজির ঘটনা ঘটিয়েছেন এ সময়ের পুঁজিবাজারের আলোচিত বিনিয়োগকারী আবুল খায়ের হিরু। দেশের প্রধান পুজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তদন্তে কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে হিরুসহ ছয়জনের জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে কারসাজির ঘটনার অধিকতর তদন্তের জন্য এখন দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

১১ মে বিএসইসির পরিচালক আবুল হাসান স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ডিএসইর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারের আলোচিত বিনিয়োগকারী আবুল খায়ের হিরু, তার শ্যালক কাজী ফরিদ হাসান ও সজীব হোসেন কোম্পানিটির ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার বাজার থেকে কিনে নেন। সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার কিনতে হলে স্টক এক্সচেঞ্জ, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কোম্পানিকে জানাতে হয়। কিন্তু সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করে এ তিন বিনিয়োগকারী তার কিছুই করেননি।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, সাফকো স্পিনিংয়ের শেয়ার নিয়ে বড় ধরনের কারসাজি হয় গত বছর এপ্রিল থেকে আগস্টের মধ্যে। ওই কয়েক মাসের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। ডিএসইতে গত বছর ১৩ এপ্রিল কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল মাত্র ৯ টাকা ৬০ পয়সা। ওই বছর ৮ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ টাকা ২০ পয়সায়। এ কয়েক মাসের মধ্যেই এসব বিনিয়োগকারী তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নেন। ডিএসইতে থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০২০ সালের জুলাই-ডিসেম্বর (অর্ধবার্ষিক) প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ছিল ঋণাত্মক। কিন্তু ২০২১ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) সেই আয় ইতিবাচক হয়ে যায়। আর এ সময় কোম্পানিটির শেয়ার কারসাজির সঙ্গে যুক্ত হয় উল্লিখিত বিনিয়োগকারীরা। ধারণা করা হচ্ছে, কোম্পানির উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মিলে এ কারসাজির ঘটনা ঘটানো হয়।

দাম বাড়াতে যাতে কারসাজিকারীদের সুবিধা হয়, সেজন্য ইপিএস বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এমনকি ২০১৯-২০ সালের জন্য কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ না দিলেও ২০২১ সালের জুনে সমাপ্ত আর্থিক বছরের জন্য পাঁচ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। ইপিএস বৃদ্ধি ও লভ্যাংশ ঘোষণা কোম্পানিটির দাম বাড়াতে সহায়তা করে।

ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজিতে নাম জড়িয়েছে বহুল আলোচিত বিনিয়োগকারী আবুল খায়ের হিরুর। ডিএসই তার তদন্তে ডেল্টা লাইফের শেয়ার কারসাজিতে অন্য যাদের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে, তারা হচ্ছেন আবুল খায়ের হিরুর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান, তার বাবা আবুল কালাম মাতব্বর, বোন কনিকা আফরোজ, ভাই সাজেদ মাতব্বর ও মোহাম্মদ বাশার এবং শ্যালক কাজী ফুয়াদ হাসান।

গত বছর মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে ডেল্টা লাইফের শেয়ারের দাম বাড়ে ১৯০ শতাংশ। শেয়ারটির দাম ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩২ টাকায় উন্নীত হয়। আর ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২৬ অক্টোবরের মধ্যে শেয়ারটির দাম ১৩৪ টাকা থেকে ২৩২ টাকায় তোলা হয়। এটি করা হয় অ্যাকটিভ লেনদেনের মাধ্যমে। এই অ্যাকটিভ ট্রেডে যুক্ত ছিলেন আবুল খায়ের হিরু ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্য।

ডিএসই তার তদন্তে ডেল্টা লাইফের শেয়ার কারসাজিতে অন্য যাদের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে, তারা হচ্ছেন আবুল খায়ের হিরুর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান, তার বাবা আবুল কালাম মাতব্বর, বোন কনিকা আফরোজ, ভাই সাজেদ মাতব্বর ও মোহাম্মদ বাশার এবং শ্যালক কাজী ফুয়াদ হাসান।

উল্লেখ্য, গত বছর মে মাসে ফরচুন শুজ লিমিটেডের শেয়ারদর ছিল ২২ টাকা ৪০ পয়সা। সেই শেয়ার মাত্র পাঁচ মাসে অর্থাৎ অক্টোবরে এসে শেয়ারদর ১১৭ টাকায় ওঠে, অর্থাৎ শেয়ারটির দর ৪২২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এরপর বাজার কিছুটা পতনের ছোঁয়ায় দর কিছুটা কমে। চলতি বছর মার্চে কোম্পানিটির শেয়ারদর দাঁড়ায় ১৪২ টাকা ৮০ পয়সায়। অর্থাৎ কোম্পানিটির এক বছরে শেয়ারদর বেড়েছে ৫৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। দর বাড়ার পেছনে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। গত মে মাসে শাইনপুকুর সিরামিকসের শেয়ারদর ছিল ২৬ টাকা, ছয় মাস পর অর্থাৎ অক্টোবরে শেয়ারদর দাঁড়ায় ৪২ টাকা ৫০ পয়সায়। অর্থাৎ কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপর আবার পতনের ধাক্কায় চলতি বছর এপ্রিলে শেয়ারদর দাঁড়ায় ২৫ টাকায়। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য জাদুতে এক মাসের ব্যাবধানে ২৫ টাকার শেয়ার হয়ে যায় ৪৬ দশমিক ৯০ পয়সা। এক মাসে দর বেড়েছে ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

গত বছর মে মাসে এডিএন টেলিকমের শেয়ারদর ছিল ৪২ টাকা। সেপ্টেম্বরে শেয়ারদর দাঁড়ায় ৮১ টাকা ৬০ পয়সায় অর্থাৎ কোম্পানিটির দর বৃদ্ধি পায় ৯৪ দশমিক ২ শতাংশ। গত বছর মে মাসে হামিদ ফেব্রিকসের শেয়ারদর ছিল ৪২ টাকা ৯০ পয়সা, ছয় মাসের ব্যবধানে সে শেয়ারদর বেড়ে হয় ৬৫ টাকা ৬০ পয়সা। ছয় মাসের দরবৃদ্ধি ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারদর গত বছর মে মাসে ছিল ১৭০ টাকা, অক্টোবরে এসে দর হয় ২৫১ টাকা। কোম্পানিটির দর বৃদ্ধি পায় ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ। একইভাবে গত বছর মে মাসে ৬৪ টাকা লেনদেন হওয়া জেনেক্স ইনফোসিস নভেম্বরে এসে দাঁড়ায় ১৭৬ টাকায়। কোম্পানিটির দর বৃদ্ধি পায় ১৭৫ শতাংশ। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কারসাজির মাধ্যমে এসব কোম্পানির শেয়ারদরে উল্লম্ফন হয়েছে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, যেসব কোম্পানির দর চার-পাঁচগুণ বাড়ে, সেই কোম্পানিগুলো দিয়ে কখনও ভালো কিছু আশা করা যায় না। রক্তক্ষরণের মধ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীরা দিন পার করছেন। আর কিছুসংখ্যক লোক ফায়দা লুটে নিয়ে যাচ্ছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে বাজার আরও খারাপ হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা না নিতে পারে, তাহলে কমিশনকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।

সাবেক ব্যাংকার ও বিনিয়োগকারী গোলাম মোস্তফা বলেন, গত দুই বছর ডিএসসি ও বিএসইর কর্মকাণ্ড নিরপেক্ষ ছিল না। হিরু যেসব কোম্পানি নিয়ে খেলেছে সেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বিএসইসি। অথচ যেসব কোম্পানির সঙ্গে সখ্য ছিল না, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাছাড়া বিএসইসির চেয়ারম্যানের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকার পরিবর্তে পৃষ্ঠপোষকতাই প্রতীয়মান হয়েছে। সবমিলে ক্ষতি কিন্তু বিনিয়োগকারীদের হয়েছে।

ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসেসিয়েশনের সভাপতি রিচার্ড ডি রোজারিও শেয়ার বিজকে বলেন, যদি কেউ অন্যায়ভাবে বাজার কারসাজি করে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। সে যতই শক্তিশালী হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখা উচিত।