Print Date & Time : 27 September 2021 Monday 9:07 am

ডাকসেবা থেকে বঞ্চিত চাঁদপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ

প্রকাশ: June 23, 2021 সময়- 04:39 pm

বেলায়েত সুমন, চাঁদপুর: ‘রূপকল্প ২০২১ বাস্তবে রূপায়ন’ এর লক্ষ্যে ডাক সেবা উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ডাক নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে সংগতি বিধান, দেশের সব ডাকঘরের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে ডাক বিভাগ পোস্ট ই-সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। একই সঙ্গে গ্রাহক-উপযোগী পণ্য ও সেবাদান, স্বল্প-সুবিধাযুক্ত এলাকাগুলোতে ডাকসেবার বিস্তার, উন্নয়ন, দারিদ্র্য নিরসন এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে শহর ও গ্রামের অসংগতি দূরীকরণে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

ডাকসেবার নানা অসংগতি দূর করার লক্ষ্য থাকলেও উদ্যোক্তাদের অনিয়মের কারণে নয়-ছয় করেই চলছে চাঁদপুরের বেশিরভাগ পোস্ট ই-সেন্টারগুলো। নামমাত্র চলছে ই-সেন্টারের সেবা কার্যক্রম। ডাক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা আর অনিয়মের কারণে ই-সেন্টারের আশানুরূপ কোনো সুফল পাচ্ছে না প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।

ই-সেন্টারগুলোর নামে সরকারের বরাদ্দ করা বিনামূল্যের সরঞ্জাম বাইরের বাজারে বিক্রি, বরাদ্দের চেয়ে কম সরঞ্জাম দেয়া, সেন্টার উদ্যোক্তার কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। উদ্যোক্তাদের অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতায় কাক্সিক্ষত রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। ফলে প্রকল্পের আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) কর্মসূচির আওতায় পোস্ট ই-সেবা কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় হাজীগঞ্জ, কচুয়া ও শাহরাস্তি উপজেলার কয়েকটি শাখা পোস্ট অফিসকে পোস্ট ই-সেন্টারে রূপান্তর করা হয়। কর্মসূচির আওতায় সংশ্লিষ্ট পোস্টমাস্টার নিজে উদ্যোক্তা হবেন অথবা নতুন উদ্যোক্তা নির্বাচন করবেন।

নতুন উদ্যোক্তা পোস্ট অফিসের পাশে সুবিধাজনক স্থানে একটি পোস্ট ই-সেন্টার প্রতিষ্ঠা করবেন। এখানে সরকারিভাবে তিনটি ল্যাপটপ, একটি প্রিন্টার, একটি স্ক্যানার কাম ফটোকপিয়ার, ইন্টারনেট সংযোগের জন্য মডেম, বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সৌর প্যানেলসহ প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকার সরঞ্জাম বিনা খরচে দেয়া হবে। আর উদ্যোক্তা এলাকার জনগণকে কম খরচে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, কম্পোজ, স্ক্যানিং, ফটোকপি, ছবি সম্পাদনা, ই-মেইল, ব্রাউজিং, ভিডিও কনফারেন্স, প্রিন্টিং, ছবি তোলা, অনলাইনে কেনাবেচা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন ও রেজাল্ট দেখা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে সেবার আবেদনসহ নানা সেবা দেবেন। মাস শেষে সেন্টারের আয়ের ৮০ শতাংশ অর্থ উদ্যোক্তা নেবেন। ১০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট পোস্টমাস্টার ও বাকিটুকু সরকারি খাতে জমা হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের নানা অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতায় মুখ থুবড়ে পড়েছে জেলার এই কার্যক্রম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লা আঞ্চলিক অফিসের আওতায় হাজীগঞ্জে ৪০টি, শাহরাস্তিতে ১৯টি, কচুয়ায় ২১টি ও কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলায় পাঁচটি সেন্টারে সরঞ্জাম দেয়া হয়েছে। এজন্য কোনো কোনো উদ্যোক্তার কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তবে বেশিরভাগ সেন্টার তিনটির স্থলে দেয়া হয়েছে একটি করে।

অনুসন্ধানকালে আরও জানা যায়, হাজীগঞ্জের বাকিলা ইউনিয়নের উচ্চঙা গ্রামের হান্নান মুন্সীর ছেলে মহিউদ্দিন মুন্সীর নামে হাজীগঞ্জ ডাক উপবিভাগের তালিকায় শ্রীপুর ডিজিটাল পোস্ট ই-সেন্টার ও বাকিলা ডিজিটাল পোস্ট ই-সেন্টার ক্রমিক অনুসারে ৪৩ ও ২৬ নম্বরে লিপিবদ্ধ করা আছে। বাস্তবেও মহিউদ্দিন মুন্সী দুটি পোস্ট ই-সেন্টারের সরঞ্জাম দিয়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, টাকা দিয়ে এসব যন্ত্রাংশ কিনে ব্যবসা শুরু করি। পোস্ট ই-সেন্টারের ভালোমন্দ আমার জানার বিষয় না। আমি যা করছি তা ডাকবিভাগের সব লোক জানে।

হাজীগঞ্জের ৮নং পূর্ব হাটিলা গ্রামের আরিফুল ইসলাম ধড্ডা ডিজিটাল পোস্ট বিও’র উদ্যোক্তা। তবে তিনি সেন্টারের সরঞ্জাম রেখেছেন শাহরাস্তির দোয়াভাংগার জাহাঙ্গীর হোটেল গলির একটি বন্ধ দোকানে। প্রায় ছয় মাস ধরে বন্ধ দোকানটি।

ওদিকে শাহরাস্তির শুয়াপাড়া গ্রামের নূরুল আমিনের ছেলে মাহফুজুর রহমান কালিয়াপাড়া ডিজিটাল পোস্ট ই-সেন্টারের উদ্যোক্তা। তিনি কালিয়াপাড়া বিও’র দায়িত্বে কালিয়াপাড়ায় থাকার কথা থাকলেও তিনি রয়েছেন শাহরাস্তির দোয়াভাংগায়।

একই উপজেলার ৫নং সদর ইউনিয়নের সুহিলপুর বিও’র উদ্যোক্তা সুলতান জানান, পোস্ট ই-সেন্টারের সরঞ্জাম দেয়ার সময় আমি ৪০ হাজার টাকা দিই। পরে সরঞ্জামগুলো নিয়ে যায় পোস্ট ই-সেন্টারের অফিসার। এখন এসব সরঞ্জাম বা পোস্ট ই-সেন্টারের শাখা সুহিলপুরে নেই। সেন্টারের যন্ত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পোস্ট অফিস পরিদর্শক।

এছাড়া পোস্ট ই-সেন্টারের সরঞ্জার দিয়ে কালিয়াপাড়ায় মাহফুজুর রহমান খুলে বসেছেন ইয়ুথ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। একইভাবে বিভিন্ন সেন্টারের সরঞ্জাম দিয়ে শাহরাস্তির দোয়াভাংগায় কয়েকজন উদ্যোক্তা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সেন্টার চালু করেছেন।

চাঁদপুরের পোস্ট অফিস পরিদর্শক কাঞ্চন সাহা বলেন, একজন উদ্যোক্তা এক বা একাধিক পোস্ট ই-সেন্টার নিতে পারবেন।

হাজীগঞ্জ পোস্ট অফিস উপপরিদর্শক ফারুক খান শেয়ার বিজকে বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি। এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।

হাজীগঞ্জের পোস্টমাস্টার জেনারেল কামাল হোসেন বলেন, ‘পোস্ট ই-সেন্টারের পণ্য, নিয়োগ, বেতনসহ সব কার্যক্রম মূলত পোস্ট অফিস পরিদর্শক দেখেন। এখানে আমার কোনো হাত নেই। কাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, কতগুলো পণ্য দেয়া হয়েছে, কোনো টাকা নেয়া হয়েছে কি না, তা উনি ভালো বলতে পারবেন। পোস্ট ই-সেন্টারের কোথায় কীভাবে কি হচ্ছে, এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। সব জানেন পরিদর্শক কাঞ্চন সাহা। আমি শুধু রশিদের মাধ্যমে বিভিন্ন চলমান সেন্টারের টাকা নেই।’

ডাক বিভাগের কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল মো. মনজুরুল আলমকে এ বিষয়ে অবগত করার পর মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।