দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যা

ডা. মোহসীনা তাহসীন: ডায়াবেটিস একটি অনিরাময়যোগ্য রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বিশ্বব্যাপী মানুষের মৃত্যু ও শারীরিক অক্ষমতার একটি প্রধান কারণ হলো ডায়াবেটিস। নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে সবারই ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিয়ন্ত্রিত না হলে নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত এ রোগটি মানুষের কর্মক্ষমতা হরণের পাশাপাশি চোখ, হƒদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও ত্বকসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারে। এসব সাধারণ সমস্যার পাশাপাশি ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীরা ভোগেন আরও কিছু জটিলতায়।

 ডায়াবেটিস রোগের পরিণতি ও নিয়ন্ত্রণে যে কঠোর নিয়মকানুন পালন করতে হয়, তাতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছে শুনলে সাধারণ মানুষের ভয় পেয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক প্রথম অবস্থায়, যেমনটি হয়েছিল ৪২ বছরের সামিয়ার ক্ষেত্রে। রক্তের রিপোর্ট দেখে ডাক্তার যখন জানালেন, সামিয়ার রক্তে অতিরিক্ত শর্করা ধরা পড়েছে, আঁতকে উঠেন তিনি। ১২ ও সাত বছরের দুটি সন্তান রয়েছে তার। দুজনের গর্ভকালেই সামিয়ার ধরা পড়েছিল গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। ডাক্তারি মতে সন্তান জন্ম দানের পর ডায়াবেটিস সেরে গেলেও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আক্রান্তদের পরবর্তী সময়ে এ রোগটি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এছাড়া, সামিয়ার বাবারও ডায়াবেটিস রয়েছে। সুতরাং তার ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা অন্যদের চেয়ে বেশি ছিল, যা শেষ পর্যন্ত হয়েই গেল।

রক্তে যখন গ্লুকোজের পরিমাণ প্রতিনিয়ত একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি থাকে, সে অবস্থাকে ডায়াবেটিস বলা হয়। খাবার  গ্রহণের পর তা গ্লুকোজে পরিণত হয়ে মানুষের দেহ কোষে গিয়ে শক্তি তৈরি করে। আর গ্লুকোজ দেহ কোষে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে ইনসুলিন নামক একটি হরমোন। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর অগ্নাশয় কম ইনসুলিন তৈরি করে বিধায় রক্তের গ্লুকোজ পূর্ণভাবে দেহ কোষে পৌঁছতে পারে না। প্রধানত মানুষের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস, অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম, পারিবারিক ইতিহাস, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড পিপাসা বোধ করা, ঘন ঘন ক্ষুধা অনুভব করা, সব সময় দুর্বল অনুভব করা, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, ওজন কমে যাওয়া, ক্ষত সহজে না সারা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তিন ধরনের ডায়াবেটিসের মধ্যে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে অগ্নাশয়ের কোষগুলো মরে যাওয়ায় কোনো ইনসুলিন তৈরি হতে পারে না। এটি সাধারণত শিশু এবং প্রাপ্তবয়ষ্কদের হলেও যে কোনো বয়সেই এটি হতে পারে। চিকিৎসার জন্য ইনসুলিনের প্রয়োজন হয়। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে শরীরে যথেষ্ট পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি হয় না অথবা ইনসুলিনের কার্যকারিতা থাকে না। ৪০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তিদের, বিশেষ করে অতিরিক্ত ওজনের ও কম শারীরিক পরিশ্রমকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। শেষের ধরনটি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, যা দুই থেকে পাঁচ শতাংশ গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেসব নারীর ডায়াবেটিস থাকা সত্ত্বেও আগে ধরা পড়েনি, মাতৃকালীন অবস্থায় তা ধরা পড়ে।

গর্ভধারণের চিন্তা করার প্রথম থেকেই নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে মা ও শিশু উভয়েই নানা রকম ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসের কারণে গর্ভবতী মায়েদের হƒদরোগ ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দেখার ফলে মাতৃমৃত্যুর হার বেড়ে যায়। মায়ের পাশাপাশি গর্ভস্থ শিশুও এ অবস্থায় ঝুঁকির মধ্যে থাকে। ডায়াবেটিস আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের যে কোনো সময় বাচ্চা প্রসব হয়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিসের কারণে মায়ের পেটে বাচ্চার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। একই কারণে কোনো কোনো বাচ্চার ওজন অস্বাভাবিক রকম বেশি অথবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা হƒদপিণ্ড ঠিকমতো না হওয়া গঠিত ঠোঁট কাটা, উপরের তালু কাটাসহ বিবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব শিশু পরবর্তী সময়ে দৈহিক স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও বিভিন্ন রকম স্নায়ুরোগে ভোগে।      

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে গর্ভবতী মায়ের প্রচণ্ড ক্ষুধা পেলেও তিনি ইচ্ছে মতো যে কোনো খাবার বেশি পরিমাণে খেতে পারেন না। তাকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শক্রমে খাদ্য তালিকা অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করতে হয়। এ অবস্থায় গর্ভবতী মাকে প্রতিদিন মোট খাদ্যের ৪০-৪৫ শতাংশ শর্করা, ১৮-২০ শতাংশ আমিষ এবং চর্বি জাতীয় খাদ্য ৩০ শতাংশের কম খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তার সব খাবারকে ছয় ভাগে ভাগ করে প্রতিদিন ছয় বেলায় খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রচুর ফল ও শাকসবজি অবশ্যই গর্ভবতী মাকে ডায়াবেটিস আক্রান্ত অবস্থায় খেতে বলেন বিশেষজ্ঞরা। গর্ভধারণকারী নারীদের ডায়াবেটিস চিকিৎসা করতে গিয়ে কখনও গর্ভবতী মাকে মুখে খাওয়ার ওষুধ দেওয়া ঠিক নয়, তার জন্য একটাই ওষুধ  আর তা হলো ইনসুলিন।

হরমোন ও শর্করার মধ্যকার যে সম্পর্ক, তা নারী শরীরে মাসের বিশেষ সময়ে পরিবর্তিত হয়। এ পরিবর্তন ও শরীরে এর প্রভাব একটা নির্দিষ্ট বয়স পরে ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীদের জন্য আরও স্বাস্থ্যগত জটিলতা তৈরি করে। মাসিকের আগে পরে নারীর শরীরে হরমোনের পরিমাণে পরিবর্তনের কারণে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমতে বা বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে শরীরের রক্তে মাসিক চক্রের সময়ে শর্করার উঠানামার একটি তালিকা তৈরি করা ভালো, যাতে এ তালিকায় খুব বেশি পরিবর্তন ধরা পড়লে চিকিৎসকের সহায়তায় শর্করা নির্ধারিত মাত্রায় রাখার ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীরা মেনোপজ ও তার পরবর্তী সময় ডায়াবেটিসবিহীন নারীদের তুলনায় বেশি সমস্যায় ভোগেন। তাই এ সময়গুলোতে নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি একজন নারীকে অধিক সতর্ক ও যতœবান থাকতে হবে। মেজাজ পরিবর্তন, ক্লান্তি, হটফ্লাশ বা হঠাৎ জ্বর জ্বর ভাব, ঘাম, চেহারা লাল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো মেনোপজ ও ডায়াবেটিসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। তাই যদি মেনোপজের লক্ষণগুলোকে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলাফল হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তা বাড়ানোর জন্য বেশি পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করা হয়, তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে অর্থাৎ রক্তে শর্করার মাত্রা খুব দ্রুত বেড়ে ডায়াবেটিসজনিত অন্যান্য জটিলতা প্রকট করে তুলতে পারে।

রাতের বেলায় ডায়াবেটিক আক্রান্তদের রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। আবার অন্যদিকে মেনোপজজনিত হটফ্লাশ ও রাতে ঘামের কারণেও নারীদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এ দুটি একসঙ্গে ঘটলে রক্তে শর্করার পরিমাণ খুব দ্রুত উঠা-নামার মাধ্যমে ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

এ সব অসুবিধা দূর করার জন্য নারীদের হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি দেওয়া হয়, যা অস্থিক্ষয় ও প্রজননতন্ত্রের প্রদাহের আশঙ্কা কমিয়ে হটফ্লাশের প্রবণতা হ্রাস করে। কিন্তু পাশাপাশি এ ধরনের চিকিৎসা স্তন ও জরায়ুর ক্যানসার এবং হƒদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই যদি হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নিতেই হয়, তবে তা যতটুকু সম্ভব কম পরিমাণে নিতে হবে এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর চেকআপ করা অত্যাবশ্যক এক্ষেত্রে। 

ডায়াবেটিস ও হƒদরোগের মধ্যে রয়েছে একটি নিবিড় সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টনারশিপ ফর জেন্ডার স্পেসিফিক মেডিসিনের পরিচালক ম্যারিয়েন লেগাটো বলেন ডায়াবেটিসমুক্ত নারীদের চেয়ে ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীদের হƒদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ছয়গুণ বেশি।

আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন গত ৭৫ বছর ধরে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ, এর চিকিৎসা এবং ডায়াবেটিস আক্রান্তদের সেবায় কাজ করে যাচ্ছে। তাদের মতে, ডায়াবেটিসের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে রোগীকে নিজেই রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় ম্যানেজার হতে হবে। এজন্য রোগীর সচেতনতা ও সতর্কতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এ লক্ষ্যে তাকে বিভিন্ন রকমের ডায়াবেটিস, চিকিৎসা পদ্ধতি, খাবারের ধরন ও পরিমাপ এবং জীবনযাপনের নিয়মাবলি সম্পর্কে জানতে হবে। ডায়াবেটিস হলে ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য ডাক্তার যেমন ডেন্টিস্ট, পায়ের ডাক্তার, মানসিক ডাক্তার ও সমাজসেবা কর্মী, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের পরামর্শ নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবারে সেবা প্রদানকারী ব্যক্তিসহ অন্যান্য সদস্য, অফিস সহকর্মীসহ যাদের সঙ্গে সব সময় চলাফেরা করা হয়, তাদেরও ডায়াবেটিস আক্রান্তে ব্যক্তি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।

খাবার নির্বাচন, ওজন নিয়ন্ত্রণ, কর্মময় ও গতিশীল জীবনযাপন, প্রয়োজনে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে সুস্থ থাকতে হবে। পুরো ব্যাপারটি কষ্টদায়ক ও যথেষ্ট পরিশ্রমের হলেও সুস্থ ও দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকার লক্ষ্যে ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিকে সচেতন থাকতেই হবে। নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন একদিকে যেমন দেবে অধিক শক্তি,  তেমনি অন্যান্য রোগ বালাই হতেও এতে সহজে মুক্তি মিলবে এবং এতে কম ক্লান্তি, কম পিপাসা, ত্বক বা ব্লাডারের কম প্রদাহ হবে। এর সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পাবে হƒদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি, চোখের সমস্যা, স্নায়ুর ক্ষয়, কিডনির সমস্যা, দাঁত ও মাড়ির সমস্যা। সদা প্রফুল্ল জীবনযাপন করা যাবে। মনে রাখতে হবে নারীদের বিষণœতা ডায়াবেটিসের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।  

ডায়াবেটিস প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় উপায় হাঁটা। শুধু ডায়াবেটিসই নয়, বরং উচ্চ রক্তচাপ ও হƒদরোগের ঝুঁকি কমাতে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট করে হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখা উচিত। সেক্ষেত্রে কোন গতিতে কতক্ষণ হাঁটতে হবে, তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে। নিয়মিত হাঁটার পাশাপাশি ঘরের বিভিন্ন কাজকর্ম, বাগান করা, ধারে কাছে হেঁটে যাতায়াত করা, বাড়িতে-অফিসে লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার প্রভৃতি অভ্যাস ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সংসারে সবার জন্য নারীরা সারাদিন কাজ করেন, সবার খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম, পড়াশোনা, চিকিৎসাসেবার দিকে খেয়াল রাখেন। কিন্তু তাদের নিজেদের যতœ নেওয়ার বেলায় খেয়াল রাখেন না। তাই নিজের প্রয়োজনে মা, মেয়ে, বোন, নানি, দাদি যেই হোন না কেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিজের উদ্যোগে নিজের যতেœর  নিতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..