প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ডিএনডি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন: বিলম্বে বাস্তবায়নে ব্যয় বাড়ছে দ্বিগুণেরও বেশি

 

সোহেল রহমান: পাঁচ বছর বিলম্বে উদ্যোগ নেওয়ার কারণে ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় বাড়ছে দ্বিগুণেরও বেশি। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িতব্য এ প্রকল্পটি গত বছর ৯ আগস্ট একনেক সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং সে মোতাবেক ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রস্তাবটি একনেক অনুবিভাগে পাঠানো হয়। তখন এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না থাকায় প্রস্তাবটি তখন একনেক অনুবিভাগ থেকে ফেরত পাঠানো হয়।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

কমিশন সূত্রে জানা যায়, ডিএনডি এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ডিডিসি-সেজিস-আরআরআই’কে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ২০১০ সালের এপ্রিলে প্রতিবেদন জমা দেয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বর্তমান রেট শিডিউল বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত ডিপিপিতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি প্রকল্পের যে সারসংক্ষেপ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে, এতে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৫৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন ২০২০ সাল পর্যন্ত।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফর আহমেদ খান স্বাক্ষরিত ওই প্রস্তাবের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৬২-৬৮ সাল সময়ে তৎকালীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ‘ডিএনডি এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়। তখন ওই প্রকল্পের আওতায় চারটি পানির পাম্পসহ একটি পাম্পস্টেশন নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ৩১ দশমিক ২৫ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ৫৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার সেচ খাল, ৪৫ দশমিক ৯০ কিলোমিটার নিষ্কাশন খাল ও ২১৬টি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্প এলাকাটি ঢাকা শহরের সন্নিকটে হওয়ায় স্বাধীনতার পর এখানে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন গড়ে ওঠে। ডিএনডি এলাকায় ভূমি ব্যবহারে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেয়। কৃষি জমিগুলো বাসভবন, শিল্প প্লট কিংবা রাস্তায় রূপান্তরিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ খাল, ড্রেন ইত্যাদি স্থানীয় জনগণের নিক্ষিপ্ত বর্জ্যে অচল হয়ে যায়। পাশাপাশি বন্যার কারণে বিদ্যমান পাম্পগুলো বন্যার পানি ও গৃহস্থালির অতিরিক্ত বর্জ্য পানি নিষ্কাশনে অসমর্থ হয়ে পড়ে। এছাড়া অবৈধ দখলের কারণে নিষ্কাশন খালগুলোর ধারণক্ষমতাও কমে যায়। এ অবস্থায় ২০০৫ সালে জাইকার সমীক্ষা প্রতিবেদন ‘এফএপি-৮এ’র আলোকে ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ে ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কাজ বাস্তবায়িত হয়। তখন এতে ব্যয় হয়েছিল ১২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

সূত্র জানায়, প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনকালে ভবিষ্যতে প্রকল্প এলাকায় নদী ড্রেজিং, নিচু এলাকায় উঁচু করে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করা ও পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার বিভাগকে সম্পৃক্ত করারও নির্দেশ দেন তিনি।

প্রকল্পের কাজটি ‘রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে’র কথা উল্লেখ করে এটি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য গত ১৯ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রস্তাব পাঠিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অথবা সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। আগামী ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় ‘অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র বৈঠকে অনুমোদনের জন্য এটি উপস্থাপন করা হতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ডিএনডি এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবেশগত মান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রকল্প এলাকার জনগণের স্বাভাবিক জীবনমান নিশ্চিত হবে বলে সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের সারসংক্ষেপে যেসব পূর্তকাজের উল্লেখ করা হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছেÑদুটি পাম্প স্টেশন নির্মাণ, ফতুল্লা, পাগলা ও শ্যামপুরে তিনটি পাম্পিং প্লান্ট স্থাপন, ছোট-বড় ৯৩টি ব্রিজ/কালভার্ট নির্মাণ, ৫২টি ব্রিজ/কালভার্ট পুনর্নির্মাণ; দুটি ক্রস ড্রেন নির্মাণ, ৯৩ দশমিক ৯৮ কিলোমিটার খাল পুনর্খনন ও খালের পাড় উন্নয়ন ইত্যাদি।