মত-বিশ্লেষণ

ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ জরুরি

ফুয়াদ হাসান: জীবনের চাহিদা বা কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনে আমাদের অর্থশাস্ত্রের খুঁটিনাটি জানতে হয়। সময়ের পরিক্রমায় পৃথিবীর সবই পরিবর্তিত হচ্ছে। পিছিয়ে নেই অর্থশাস্ত্রও। ছোট পরিসরে চালু হওয়া অর্থবিদ্যার ধ্যান-ধারণা আজ আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু কিংবদন্তি ব্যক্তির নাম, যারা অর্থনীতিকে দিয়েছেন আধুনিক প্রাণ। কিছুকাল আগেও অর্থনীতিবিদ বলতে তেমন কেউ ছিলেন না, তখন অর্থনীতি শাস্ত্রটা ছিল নৈতিক দর্শনের একটি শাখা মাত্র। এখন অর্থনীতি বলতে আমরা যা বুঝি, তা তখন ছিল পলিটিক্যাল ইকোনমি। মার্কেন্টাইল, ফিজিওক্রাট, উদারপন্থি, সমাজতন্ত্র, ধনতন্ত্র, পুঁজিবাদ, মিশ্র বা খোলা বাজার সবই এই শাস্ত্রকে করেছে পরিপক্ব। এ সবকিছুকে ছাপিয়ে আজ আমাদের আধুনিক অর্থশাস্ত্রে যোগ হয়েছে তথ্য ও প্রযুক্তি, যা গাণিতিক বিশ্লেষণ ও হাজারো মতবাদের নীরস পাঠকে করেছে উপভোগ্য ও পাঠ্য। বর্তমান পৃথিবীতে তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার সর্বত্র। প্রযুক্তি আধুনিক জনজীবনকে করেছে আনন্দময়।

বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৪৬৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৪২৮ কোটি মানুষ মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ করে। সক্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী ৪১৪ কোটি মানুষের মধ্যে ৪০৮ কোটি মানুষ মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া সেবা গ্রহণ করে। বিশ্বব্যাপী আধুনিক অর্থনীতিকে জনপ্রিয় ও গ্রহণীয় করতে আইসিটি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সুইডেন প্রায় ৩৭ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র ৩৫ শতাংশ, জাপান ৩৪ শতাংশ, অস্ট্রিয়া ৩০ শতাংশ, জার্মানি ২৯ শতাংশসহ আরও কিছু দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় সুবিধার ভাগী হবে। শুধু তা-ই নয়, কমার্স, ই-ব্যাংকিংসহ সব মিডিয়ায় দ্রুত উন্নতি করছে অধুনিক অর্থনীতি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড জানায়, ২০১৮ সালে বিশ্বের ১৪০ কোটির বেশি মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করেছে, যা বিশ্বের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। এ কেনাকাটা আগের বছরের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি অনলাইন কেনাকাটা করেছে চীনের মানুষ, যে সংখ্যা ৬১ কোটি। বিদেশি পণ্য কিনেছে বা আন্তঃসীমান্ত কেনাকাটা করছে বিশ্বের ৩৩ কোটি মানুষ, যা ২০১৮ সালের কেনাকাটার ২৩ শতাংশ।

বিশ্বে আধুনিক অর্থনীতির জয়ের শোভাযাত্রায় পিছিয়ে নেই দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশও। ডিজিটাল অর্থনীতি বিকাশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ২০১০ সালে সারা দেশে একযোগে সাড়ে চার হাজার ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার চালু করা হয়। এসব কেন্দ্র থেকে প্রতিবছর চার কোটি ৬৯ লাখ ২০ হাজার (প্রতি মাসে ৩৯ লাখ ২০ হাজার) সাধারণ মানুষ তথ্যপ্রযুক্তি সেবা নিচ্ছে। প্রতি মাসে এসব কেন্দ্রের উদ্যোক্তারা চার কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন। (সূত্র: ইউআইএসসি সেনসাস, ২০১৩)। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, কোনো দেশে যদি ১০ শতাংশ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তৈরি হয়, তবে সেই দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি এক দশমিক তিন শতাংশ বাড়ে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে পাঁচ কোটি সাত লাখ সাত হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল। এর মাধ্যমে সাত লাখ মানুষের ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছিল। এদিকে ২০০৮ সালে মাত্র ২৪ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করত এবং ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মসংস্থান ছিল নগণ্য। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬ কোটি মোবাইল সংযোগ রয়েছে, যা ২০১৫ সালে ছিল ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৬৯ হাজার। বাংলাদেশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৯৭ শতাংশ মোবাইলে ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ করে। করোনা মহামারি চলাকালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

ধনীর অর্থের নিরাপদ আশ্রয় বা সেবাগ্রহণকারীর শেষ ঠিকানা, যা-ই বলুন না কেন, একটি দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকের গুরুত্ব কিন্তু কম নয়। দেশের অর্থপ্রবাহের মাঝে সমতা বা পুঁজি গড়তে বরাবরই ব্যাংক প্রশংসার দাবিদার। আধুনিক অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় কিঞ্চিৎ পিছিয়ে নেই ব্যাংক খাত। দেশের ১০ হাজার ১০৯ শাখার মধ্যে আট হাজার ৮৯৯ ব্যাংক শাখাই অনলাইনের আওতায়। এর মধ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর শতভাগ শাখা অনলাইনে। সরকারি ব্যাংকগুলোর ৯৯ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ৯৭ শতাংশ ও বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকগুলোর ২৫ শতাংশ শাখা অনলাইনের আওতায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ৯৫ শতাংশ শাখা অনলাইন সেবা চালু করেছে। ই-ব্যাংকিং সেবায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে গ্রাহক ছিল ২০ লাখ ৪০ হাজার। চলতি বছরের জুলাই শেষে মোবাইল বা অনলাইন ব্যাংক খাতে নিবন্ধিত গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়ায় ৯ কোটি ২৫ লাখ ৭৩ হাজার, যা জুনে ছিল আট কোটি ৮৭ লাখ ৯৭ হাজার। বাংলাদেশ এরই মাঝে সাত থেকে ১০ হাজার ফ্রিল্যান্সার সফটওয়্যার ডেভেলপার কর্তৃক প্রায় ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। বাংলাদেশের প্রায় ৪০০টি সফটওয়্যার ফার্ম ও আইসিটি কোম্পানি তাদের উৎপাদিত সফটওয়্যার ও আইসিটি সার্ভিসেস যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের ৬০টি দেশে রপ্তানি করছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সদস্য কোম্পানি রয়েছে এক হাজার ৩০০টি। এর মধ্যে ৬০টি কোম্পানিতে শেয়ার ও কোম্পানির বোর্ডে রয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। দেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে অন্যতম একটি খাত বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং বা বিপিও। খাতটিতে কাজ করছেন অন্তত ৩৫ হাজার তরুণ-তরুণী। বর্তমানে বাংলাদেশে আইটি খাতে আয় ১০০ কোটি ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এ আয় ৫০০ ডলারে দাঁড়াবে। বাংলাদেশে অর্থনীতির অগ্রগতির পাশাপাশি দ্রুত গতিতে বাড়ছে বেকারত্বের হার, করোনা মহামারির ফলে যা আরও বেগবান হয়েছে। বাংলাদেশের অন্তত ৬০ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছর। এত বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষের কর্মের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছে দেশযন্ত্র।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, কভিড-১৯ সংকটের কারণে বাংলাদেশে প্রতি চার যুবকের মধ্যে একজন কর্মহীন বা বেকার রয়েছে (২৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ)। বেকারত্ব হারের বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের মধ্যে বাংলাদেশ তৃতীয়। সরকারি চাকরিতে শূন্য পদের সংখ্যা তিন লাখ ৮৭ হাজার ৩৩৮। করোনার কারণে ছয় মাস ধরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সব ধরনের নিয়োগ স্থগিত থাকায় এ সংখ্যা চার লাখ ছাড়িয়েছে। এসব পদে নিয়োগ পেতে অপেক্ষায় আছে ২০ লাখের বেশি শিক্ষিত বেকার। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ডিগ্রি আছে, এমন বেকারের সংখ্যা চার লাখ। এদিকে ই-কমার্স ব্যবহারকারীদের সিংহভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছর। সুতরাং এ খাতে শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ গড়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি হওয়ায় এ খাতে আগ্রহী হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এক্ষেত্রে নারীরাই এগিয়েÑঘরে বসেই তারা পরিচালনা করছেন তাদের ব্যবসায়িক যাবতীয় কাজ। ই-ক্যাব বলছে, এখন দেশে প্রায় ২০ হাজার ফেসবুক পেজে কেনাকাটা চলছে। এর মধ্যে ১২ হাজার পেজ চালাচ্ছেন নারীরা। এদিকে ২০২১ সালের মধ্যে আইসিটি পেশাজীবীর সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করা, আইসিটি খাতে পাঁচ বিলিয়ন ডলার আয় এবং জিডিপিতে এ খাতের অবদান পাঁচ শতাংশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে আইসিটি বিভাগ। তাছাড়া আউটসোর্সিং, ফিল্যানসিং, ডিজিটাল মার্কেটিং-সহ হাজারো কাজের সুযোগ গড়ে উঠেছে ই-বাজারে। আধুনিক অর্থনীতির অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত করতে এ খাতে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে হবে। জালিয়াতি, প্রতারণা ও হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনা আমাদের ই-জগতের নিত্যদিনের সঙ্গী। সম্প্রতি এস্তোনিয়াভিত্তিক ই-গভর্ন্যান্স অ্যাকাডেমি ফাউন্ডেশনের করা জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সূচকে আট ধাপ উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। ১৬০টি দেশের সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল উন্নয়ন পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি করা সূচকে ৭৩ থেকে ৬৫তম স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এই সূচকে ৪৪ দশমিক ১৬ স্কোর নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। কৃষি, শিল্প, সেবা, বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে এগিয়ে চলছে আধুনিক অর্থনীতি। আজ কৃষিতে আধুনিকতা এত ওপরে যে অ্যাপসের মাধ্যামে কৃষকদের নানামুখী সমস্যার সমাধান দেয়া হচ্ছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন নতুন কলাকৌশল ও জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। শিল্পে রোবোট্রিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে।

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..