প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ডিডিটি পাউডার নিষ্ক্রিয়ে ব্যয় হবে ৩৫৫ কোটি টাকা

*       চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় ওষুধাগারে পড়ে আছে এক হাজার টন ডিডিটি পাউডার

*       এফএও তত্ত্বাবধানে অপসারণ আর নিষ্ক্রিয় করা হবে ফ্রান্সে

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের (সিএমএসডি) গোডাউনে ৩৭ বছর আগে আমদানি করা ৫০০ টন ডাইক্লোরো ডাফেনাইল ট্রাইক্লোরে ইথেন বা রাসায়নিক ডিডিটি পাউডার পড়ে আছে। এছাড়া আগের আরও ৫০০ টন সংগ্রহে আছে। এসব নিষিদ্ধ ডিডিটি পাউডার মানুষ ও পরিবেশের জর‌্য বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের এই এক হাজার টন ডিডিটি পাউডার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অরগানাইজেশন অব দ্য ইউনাইটেড নেশনসের (এফএও) তত্ত্বাবধানে অপসারণ করা হবে, যা বিশেষায়িত জাহাজে করে ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর চুল্লিতে নিষ্ক্রিয় করা হবে। আর এ কাজের জন্য ব্যয় হবে প্রায় ৩৫৫ কোটি টাকা।

জানা যায়, ম্যালেরিয়া নির্মূলে মশক নিধনের উদ্দেশ্যে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৫০০ টন ডিডিটি আমদানি করে। কিন্তু এর পর থেকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের (সিএমএসডি) গোডাউনে তা মজুত আছে। পরবর্তীকালে আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে ডিডিটি পাউডার সংগ্রহ করা হয়। এ গোডাউনে সবমিলিয়ে বর্তমানে মজুতের পরিমাণ প্রায় হাজার টন। এর মাঝে ১৯৯১ সালে ঘুর্ণিঝড়ে চট্টগ্রাম প্লাবিত হয়। ওই সময় অনেক রাসায়নিক দ্রব্য পানির সঙ্গে মিশে গেছে, যা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ডিডিটি শুঁটকিতে ও কৃষিকাজে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এজন্য বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বর্তমানে ডিডিটির উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। আর ৩৬ বছর পর এফএওর তত্ত্বাবধানে এই রাসায়নিক দ্রব্য অপসারণ করার জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এতে অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, এফএও এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি। সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে এফএও একটি কর্মশালা আয়োজন করেছিল। এ প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ৩৫৫ কোটি টাকা।

প্রকল্পে সংশ্লিষ্টরা বলেন, এসব ডিডিটি অপসারণে গ্রিসের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ করানো হচ্ছে। এসব পাউডার প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বিশেষ জাহাজে এসব রাসায়নিক দ্রব্য বহন করা হবে। রাসায়নিক দ্রব্য বহন বা কনটেইনার উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কর্মীদের বিশেষ পোশাক থাকবে। অপসারণের সময় নির্দিষ্ট এলাকা রেড জোন হিসেবে ঘোষণা করা হবে। মধ্য ডিসেম্বরে শুরু হলে এই ডিডিটি অপসারণে তিন-চার মাস সময় লাগবে।

অপসারণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে এফএও’র সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজর ও ডিটিটি অপসারণ প্রকল্পের পরিচালক সাসো মার্টিনভ বলেন, এই ডিডিটি অপসারণ করতে ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়া হবে। জলপথে বিশেষ জাহাজের মাধ্যমে এসব রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ে যাওয়া হবে। পথে ১২টি দেশের বন্দর হয়ে শেষ গন্তব্য ফ্রান্সে পৌঁছাবে ওই জাহাজ। সেখানকার একটি চুল্লিতে আন্তর্জাতিক আইন ও মান অনুসারে বিনষ্ট করা হবে। এ কাজে চার-পাঁচ মাস সময় লাগবে।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ২০০১ সালে স্টকহোম কনভেনশনে ডিডিটিসহ ক্ষতিকারক জৈব দূষণকারী কীটনাশক উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ বা সীমিতকরণ-সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তিতে ১৭১টি দেশ স্বাক্ষর করেছিল। বাংলাদেশও ২০০১ সালের ২৩ মে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল, যা কার্যকর করে ২০০৭ সালের ১২ মার্চ। কিন্তু চুক্তি কার্যকর করার প্রায় ১৪ বছর পরও ক্ষতিকর এই রাসায়নিক দ্রব্য অপসারণ করা হয়নি। তবে এফএওর তত্ত্বাবধানে এই রাসায়নিক দ্রব্য অপসারণ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মূলত ম্যালেরিয়া নির্মূলে মশক নিধনের জন্য ৩৬ বা ৩৭ বছর আগে এই ডিডিটি আমদানি করা হয়েছিল। এই রাসায়নিক দ্রব্যের অপসারণ কাজ শুরু হচ্ছে আগামী মধ্য ডিসেম্বরে। এত দিনে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আমরা চাই, যত দ্রুত সম্ভব এগুলো অপসারণ করা হোক। এক দিনও যদি দেরি হয়, তাতে আরও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এই ডিডিটি দ্রুত অপসারণ করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যা করণীয়, তা করতে একটুও বিলম্ব হবে না।