দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ডিলার নিয়োগে টিসিবির অযৌক্তিক আবেদন ফি

আয়নাল হোসেন: ভোজ্যতেল, ডাল, ছোলা, চিনি, পেঁয়াজ, খেজুরসহ নিত্যপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির জন্য সারা দেশ থেকে ডিলার নিয়োগ করতে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। তবে ডিলার নিয়োগে অযৌক্তিক আবেদন ফি ধার্য করেছে এ সংস্থাটি। এতে অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন না টিসিবির ডিলারশিপ পেতে।

টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের ৫৪ জেলার ১৯৯টি উপজেলায় মুদি ব্যবসায়ীদের ডিলার নিয়োগের জন্য গত ৯ সেপ্টেম্বর টিসিবির ওয়েবসাইটে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে ঠিক কতজন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করেনি টিসিবি। ভৌগোলিক ও যাতায়াত অবস্থা বিবেচনা করে ডিলারসংখ্যা নির্ধারণ করবে টিসিবি। ওই বিজ্ঞপ্তিতে আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে ডিলারশিপ দেওয়া হবে। ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর আবেদন করা যাবে।

এদিকে ডিলারশিপ আবেদন ফি অফেরতযোগ্য পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সঠিক প্রক্রিয়ায় আবেদন করার পরও টিসিবির কোটা পূরণ হয়ে গেলে অনেকেই ডিলারশিপ নিয়োগ পাবেন না। অর্থাৎ যেসব উপজেলায় একের অধিক আবেদনকারী থাকবেন, সেখানে একজনের বেশি ডিলার নিয়োগ পাবেন না। আবার যাদের আবেদনপত্র সঠিক থাকবে তারা আবেদন ফি আর ফেরত পাবেন না। অস্বাভাবিক এ আবেদন ফি ধার্য করায় অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৪টি জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সর্বমোট দুই হাজার ৫৮৮ ডিলার রয়েছেন টিসিবির। দেশের অনেক উপজেলায়ই ডিলার নেই। বর্তমানে ১৯৯টি উপজেলার জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছে। এসব আবেদন থেকে ২০০ থেকে ২২০ জনকে ডিলারশিপ দেওয়া হবে। ঢাকা বিভাগের ১১টি জেলার ৩৪টি উপজেলা, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার ৫২টি উপজেলা, খুলনা বিভাগের সাতটি জেলার ১৪টি উপজেলা, রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলার ৩২টি উপজেলা, রংপুর বিভাগের পাঁচটি জেলার ২১টি উপজেলা, বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার ১৯টি উপজেলা, সিলেট বিভাগের তিনটি জেলার ১৪টি উপজেলা ও ময়মনসিংহ বিভাগের তিনটি জেলার ১৩টি উপজেলার জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছে।

পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শেয়ার বিজকে বলেন, টিসিবি রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলারশিপ নিয়োগ দিয়ে আসছে। তবে আবেদন ফি পাঁচ হাজার টাকা ধার্য করাটা পুরোই অযৌক্তিক। একজন ব্যবসায়ীর কাগজপত্র তৈরি করতেই কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হবে। এরপর পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে আবেদন করবেন। কিন্তু ডিলারশিপ না পেলে তা ফেরত দেওয়া হবে না। বিষয়টি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। সেলার ও বায়ারের মধ্যে নিয়ম অনুযায়ী পণ্য বিক্রি করা হবে। টিসিবি এটির আবেদন ফি ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা ধার্য করতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

এদিকে ভোক্তার স্বার্থে কোনো আবেদন ফি ছাড়াই দরখাস্ত গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ূন কবীর ভুইয়া বলেন, সৎ উদ্দেশ্যে এবং ভোক্তার স্বার্থে ডিলারশিপ দেওয়া হলে আবেদনে কোনো ফি ধার্য করাই উচিত হবে না। তবে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা আবেদন ফি ধার্র্য করা যেতে পারে। এর বেশি ফি আদায় করা অযৌক্তিক হবে। ভেতরে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে তিনি মনে করছেন। তবে যারা মনোনীত হবেন তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ফি আদায় করা যেতে পারে।       

জানতে চাইলে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মুখপাত্র হুমাযূন কবীর বলেন, অব্যবসায়ীরা যাতে ডিলারশিপ না পান সেজন্য আবেদন ফি পাঁচ হাজার টাকা করা হয়েছে। বিগত সময়ে মাছ বিক্রেতা, পান বিক্রেতাও ডিলারশিপ পেয়েছেন। এটি যাতে না হয় সে বিবেচনায় আবেদন ফি বেশি ধার্য করা হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থায় ডিলারশিপ পেতে আন-অফিশিয়াল অনেক লেনদেন হয়। কিন্তু টিসিবির ক্ষেত্রে এমনটি নেই বলে জানান তিনি।

ডিলারশিপ নিয়োগে সংশোধিত গাইডলাইন-২০২০-এর ৯ নম্বর শর্তে বলা আছে, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের অনুকূলে আবেদন ফি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা (অফেরতযোগ্য) পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট। ফিসহ আবেদন কোনোক্রমেই ডিলারশিপ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বহন করে না। ১০ নম্বর শর্তে বলা আছে, লাইসেন্স ফি দুই বছরের জন্য ১০ হাজার টাকা (অফেরতযোগ্য)। আবেদন অনুমোদনের পর টিসিবির অনুকূলে পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দিতে হবে। ১১ নম্বর শর্তে বলা আছে, জামানত ৩০ হাজার টাকা (ফেরতযোগ্য)। ১২ নম্বর শর্তে বলা আছে, প্রতি দুই বছরের জন্য নবায়ন ফি ১০ হাজার টাকা এবং নবায়ন বিলম্ব ফি প্রতি বছরের জন্য এক হাজার টাকা।

শর্তে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রসহ আবেদন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তদন্তপূর্বক সুস্পষ্ট মতামতের ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ করা হয়। কাগজপত্রে যথাযথ প্রতীয়মান হলে টিসিবি কর্তৃপক্ষ বর্ণিত তদন্ত ছাড়াই জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ বিবেচনায় যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের জন্য ডিলার নিয়োগ করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তদন্তপূর্বক তদন্ত প্রতিবেদনে বিরূপ কোনো মন্তব্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ডিলারশিপ বাতিল করে জামানত বাজেয়াপ্ত করা হবে। জেলা, উপজেলা, নগর, মহানগর বা অন্য কোনো এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা, যাতায়াত ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক গুরুত্ব প্রভৃতি বিবেচনা করে টিসিবি কর্তৃপক্ষ ডিলারের সংখ্যা নিরূপণ করবে।  

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফর উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..