মত-বিশ্লেষণ

ডেঙ্গুতে আতঙ্ক নয়, রোগটি ভালো হয়

মু. জসীম উদ্দিন: কোরবানির পশুর পাশ দিয়ে ছয়-সাত বছরের বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে দৌড়াচ্ছে। তারা কোরবানির পশুকে ছুঁয়ে দেখতে চায়। লেজ ধরার চেষ্টা করে, আরও কত কি! কিছুতেই তাদের মন ভরে না। এদের মধ্যে ইলা-ইরা নামে দুই যমজ বোন রয়েছে। তাদের মা-বাবা বাচ্চাগুলোর আনন্দ করার এ দৃশ্য দেখছেন আর নিজের অজান্তেই তাদের চোখ দিয়ে বেয়ে পড়ছে পানি। এ কান্না আনন্দের।
ইলা-ইরা সপ্তাহ খানেক আগে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করায় স্কুল থেকে তাদের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাসায় আসার পর দুজনেরই প্রচণ্ড জ্বর আসে। পরদিন জ্বর না কমায় মা-বাবা তাদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান, ডাক্তার ডেঙ্গু পরীক্ষার (ঈইঈ, ঘঝও, ওগে, ওম)ে পরামর্শ দেন। পরদিন রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার দুজনেরই ডেঙ্গু হয়েছে বলে জানান। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ইলা-ইরার মা-বাবা। কান্নাজুড়ে দেন ইলা-ইরার মা-বাবা। আতঙ্কিত হওয়ার মতোই বিষয়, কারণ সেই সময় ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ সারা ঢাকায় এতটাই বেড়েছিল যে, হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করার জায়গা ছিল না; তাছাড়া প্রতিদিনই ডেঙ্গুজ্বরে মানুষ মারা যাচ্ছিল অনেক বেশি।
‘ডেঙ্গু’ নামটি আফ্রিকার সোয়াহিলি ভাষার প্রবাদ ‘ডিঙ্গা পেপো’ থেকে এসেছে বলে অনেকের ধারণা। এই শব্দের অর্থ ‘শয়তানের শক্তির কাছে আটকে যাওয়ার মতো ব্যথা’; নেদারল্যান্ডসের গবেষক ডিএ ব্লেইজিসের মতে, সোয়াহিলি ভাষার ‘ডিঙ্গা’ শব্দটি স্প্যানিশ শব্দ ‘ডেঙ্গু’ থেকে আসতে পারে, যার মানে হলো ‘সতর্ক থাকা’। ডেঙ্গু একটি প্রাচীন রোগ। এ রোগের প্রথম লক্ষণ পাওয়া গেছে চীনের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্রে। সেখান থেকে জানা যায় ৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে চীনে এ রোগ শনাক্ত হয়। বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রথম এ রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। এ দেশের চিকিৎসকদের কাছে অপরিচিত এ রোগের চিকিৎসা দিতে সে সময় হিমশিম অবস্থা হয়েছিল। সে বছর মৃত্যের সংখ্যাও প্রায় শত ছুঁয়েছিল। পরের বছরগুলোয় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও মৃতের সংখ্যা অনেক কমে যায়। ২০১৫ সালের দিকে বাংলাদেশে ডেঙ্গু আবার বাড়তে থাকে। সে বছর আক্রান্ত হয় দুই হাজার ৬৭৭ জন। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা অন্যান্য বারের তুলনায় অনেক বেশি, যা সব বারের রেকর্ডকে ছড়িয়ে গেছে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকার ১০০টি দেশের প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ ডেঙ্গু ঝুঁকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভাইরাসের বিবর্তন, অপরিকল্পিত ও অত্যাধিক জনসংখ্যার নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ও অস্বাস্থ্যকর বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনার কারণে ডেঙ্গুজ্বর বেড়েই চলেছে। কেবল বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার একাংশে এবার ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ প্রায় মহামারির পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডেঙ্গুর প্রচলিত ধরনের সঙ্গে শক সিনড্রোম দেখা দেওয়ায় ঝুঁকি ও মৃত্যুহারও বাড়ছে। ইতোমধ্যে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। এডিস মশার বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করেছে ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ সরকার। এডিস মশা নিধন ও লার্ভা ধ্বংসে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই সরকার ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ের সব পরীক্ষার ফি সর্বনি¤œ পর্যায়ে নির্ধারণ করে দিয়েছে। (ঘঝ১ ৫০০ টাকা (সর্বোচ্চ) ওমগ ও ওমে বা ওমগ/ওমঊ = ৫০০ টাকা (সর্বোচ্চ) এবং ঈইঈ (জই+ডইঈ+চষধঃবষবঃ ঐবসধঃড়পৎরঃ = ৪০০ টাকা (সর্বোচ্চ)। এসব পরীক্ষা দেশের সব সরকারি হাসপাতালে ফ্রি করারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরীক্ষার ফি-সংক্রান্ত এ সরকারি আদেশ দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বাস্তবায়ন করছে কি না, তা তদারকির জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর ১০টি মনিটরিং টিম গঠন করেছে। এছাড়া ডেঙ্গু রোগীদের সেবাদান নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যসেবা খাতের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঈদের ছুটি বাতিল করেছেন। এসবই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবং সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলোর অংশবিশেষ।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক এবং সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অভিযোগ গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুম এবং স্বাস্থ্য বাতায়নে ১৬২৬৩ নামে একটি সার্বক্ষণিক হটলাইন চালু করা হয়েছে। এছাড়া তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ তথ্য অধিদফতরে এ বিষয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে, সেখানে তথ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছেন। ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হƒদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সসহ যেখানে চষধঃবষবঃ ঝবঢ়ধৎধঃব করা সম্ভব সেসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হতে ডেঙ্গু রোগীদের বিনা মূল্যে চষধঃবষবঃ (প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, রক্তদানকারীর উপস্থিতি এবং ওহফরপধঃরড়হ থাকা সাপেক্ষে) সরবরাহ করার নির্দেশ প্রদান করেছে সরকার। এর পাশাপাশি মশা নিধনে ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও প্রদান করা হয়েছে।
ডেঙ্গু-সংক্রান্ত জনভোগান্তি নিরসন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম তদারকির জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক তার নিজ দফতরে ‘মিনিস্টার মনিটরিং সেল’ নামে একটি আলাদা মনিটরিং সেল গঠন করেছেন। এ মনিটরিং সেল ডেঙ্গু চিকিৎসা বিষয়ে সরকারি নির্দেশনার কোনো প্রকার লঙ্ঘন হলে তার অভিযোগ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ মনিটরিং সেলের নম্বর: ০১৩১৪৭৬৬০৬৯, ০১৩১৪৭৬৬০৭০, ০২-৪৭১২০৫৫৬, ০২-৪৭১২০৫৫৭ এবং ই-মেইল: সরহরংঃবৎসড়হরঃড়ৎরহমপবষষ মসধরষ.পড়স। এছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশব্যাপী ‘মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা সপ্তাহ’ পালন উপলক্ষে স্থানীয় সরকার বিভাগ নিয়ন্ত্রণ সেল গঠন করেছে। যার নম্বর-৯৫৭৩৬২৫, ৯৫১১৬০৩, ০১৭১১১৫২৩২৮, ০১৮৭৯১৩২১৭৩, ০১৭১৪৫৩৮৫৮৬ ই-মেইল : রমপপ১ ষমফ.মড়া.নফ। ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মোট রোগীর সংখ্যা ৫৪ হাজার ৭৯৭ জন। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন মোট ৪৮ হাজার ২৪ জন। মারা গেছেন ৪০ জন। বর্তমানে সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছয় হাজার ৭৩৩ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা তিন হাজার ৪১৯ জন এবং অন্যান্য বিভাগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা তিন হাজার ৩১৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি নতুন রোগীর সংখ্যা এক হাজার ৬১৫ জন।
হঠাৎ করেই এবার দেশে, বিশেষ করে ঢাকায় এভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়া এ বছর তাতে মৃত্যুর সংখ্যা দেখে অন্য সবার মতো ইলা-ইরার মা-বাবাও ভয় পেয়েছিলেন, কিন্তু পরে সঠিক চিকিৎসায় বাচ্চাগুলো ভালো হয়ে উঠলে তারা বুঝলেন যে, ডেঙ্গু হলেই মানুষ মারা যায় না। সঠিক চিকিৎসায় ডেঙ্গু রোগীও ভালো হয়। তাই তো কোরবানির পশুকে ঘিরে ইলা-ইরার আনন্দ দেখে তাদের চোখ ভিজে উঠেছিল।
বর্তমানে ডেঙ্গু একটি আতঙ্কের নাম হলেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগেই সাধারণত পাঁচ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয় যায়। তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, যাতে ডেঙ্গুজনিত কোনো মারাত্মক জটিলতা না হয়। এ জ্বর হলে সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে। যথেষ্ট পরিমাণ পানি, ডাবের পানি, লেবুর শরবত ও অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। রোগী খেতে না পারলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনে শিরা পথে স্যালাইন দিতে হবে। জ্বর কামানোর জন্য শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। এসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথার ওষুধ কোনোক্রমেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে। জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে।
মূলত এডিস মশাই ডেঙ্গু রোগের বাহক। এ মশার বিস্তার রোধ এবং এ মশা যেন কামড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করাই হচ্ছে ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধের মূলমন্ত্র। মনে রাখতে হবে, এডিস মশা বাড়ির মধ্যে বাস করে। স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এ মশা ডিম পাড়ে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী জায়গাগুলো সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশক নিধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে নির্মল বায়ু এবং নিরাপদ পানি এডিস মশা নিধনের পাশাপাশি মশাজনিত অন্যান্য সব রোগ হতে আমাদের নিরাপদ রাখবে।

পিআইডি প্রবন্ধ

ট্যাগ »

সর্বশেষ..